সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে মিললেও অন্যান্য আনুসঙ্গিক খরচের ভারে রীতিমতো নিঃস্ব হয়ে পড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুদের পরিবার। অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া, পথ্য, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর হাসপাতালে দীর্ঘদিন অবস্থান করতে গিয়ে প্রতিটি পরিবারকে গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে দেশের প্রায় ৮৯ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং প্রায় ৬১ শতাংশ পরিবার তাদের জমানো সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) যৌথ সাম্প্রতিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে এমন উদ্বেগের তথ্য।
দেশের ১২টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই হাজার ৭৪৬টি হামে আক্রান্ত পরিবারের ওপর এই সমীক্ষা চালানো হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক ব্যয় বাবদ প্রতিটি পরিবারের গড়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
তবে জটিল পরিস্থিতিতে এই খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
রংপুর থেকে আসা হাজেরা খাতুনের অভিজ্ঞতা এর একটি বাস্তব উদাহরণ। ১১ মাসের মেয়েকে নিয়ে তিনি রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
হাজেরা খাতুন জানান, সরকারি হাসপাতালের মূল চিকিৎসা ফ্রি হলেও অ্যাম্বুল্যান্সে করে ঢাকায় আসতেই তার খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকা।
প্রতিদিনের খাবার, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এ পর্যন্ত তার খরচ ৭০ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থ সংস্থানে শেষ পর্যন্ত আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ করতে হয়েছে তাকে।
সমীক্ষার তথ্যানুযায়ী, হামে আক্রান্ত রোগীদের ৭৫ শতাংশেরই বয়স ৪ বছরের নিচে। জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, যাদের গড় মানসায় ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। শিশুরা হাসপাতালে ভর্তি থাকায় উপার্জনক্ষম অভিভাবকরা কাজে যেতে পারছেন না, ফলে অনেকে আয় হারিয়েছেন, এমনকি চাকরি হারানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে।
জরিপভুক্ত সব পরিবারই জানিয়েছে, তাদের জরুরি আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ পরিবার ওষুধ, ৩৩ শতাংশ নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) ও ২২ শতাংশ খাদ্য সহায়তা সবচেয়ে জরুরি বলে উল্লেখ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য চিকিৎসা-সংক্রান্ত এই অতিরিক্ত ব্যয় অত্যন্ত বড় বোঝা। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারিভাবে একটি ‘জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল’ গঠন করা প্রয়োজন, যাতে জরুরি অবস্থায় দরিদ্র পরিবারগুলো দ্রুত আর্থিক সহায়তা পায়।’
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন এই পরিস্থিতিকে ‘চিকিৎসার কারণে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া’ বলে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক চিকিৎসা বিনা খরচে নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও জনস্বাস্থ্যের এই সংকটে তার কার্যকর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।’
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্য থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দুই হাজার ৪০০টি পরিবারকে শনাক্ত করে প্রতিটিকে ১০ হাজার টাকা করে জরুরি নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রেড ক্রিসেন্টের এক হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক মাঠে সচেতনতা ও টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা করছেন।
কেকে/এমএ