মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬,
২০ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ বন্ধ      বুধবার জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী      জ্বালানি সংকট নিরসনে তিন নির্দেশনা      আবারও পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় বাংলাদেশ      সরকারকের চাপে ফেলতে নানা মহলের তৎপরতা      হরমুজে ইরানকে জাহাজ থেকে ফি আদায় করতে দেবো না: ট্রাম্প      সমালোচনার মুখে পিছু হটল বিদ্যুৎ বিভাগ      
দেশজুড়ে
মিল্কভিটায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
মাদারগঞ্জে উপ-ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি-লুটপাটের অভিযোগ
মাদারগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ২:৩৬ পিএম
ছবি : ডা. মো. মঞ্জুরুল ও সাধন ঘোষ

ছবি : ডা. মো. মঞ্জুরুল ও সাধন ঘোষ

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন (মিল্কভিটা) ঘিরে অনিয়ম, সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি এবং ভেজাল দুধ সরবরাহের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে মিল্কভিটার উপ-ব্যবস্থাপক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. মো. মঞ্জুরুল হাসানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে এক খামারি চাঁদাবাজি, লুটপাট ও মারধরের লিখিত অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ ওই খামারির বিরুদ্ধে ভেজাল দুধ তৈরির উপকরণ রাখার অভিযোগে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। পাল্টাপাল্টি এসব অভিযোগের ঘটনায় পুরো বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় খামারি ও সমবায়-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মাদারগঞ্জ মিল্কভিটাকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তাদের দাবি, নিবন্ধিত সমবায়ের পাশাপাশি অনিবন্ধিত সমবায়ের মাধ্যমেও দুধ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত খামারিরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এবং কমিশনভিত্তিক অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

এদিকে কয়েকটি সমবায়ের সদস্যদের মাধ্যমে ভেজাল দুধ সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। একপর্যায়ে একটি খামার থেকে ভেজাল দুধ তৈরির উপকরণ উদ্ধার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সর্দারপাড়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি ও খামারি সাধন ঘোষের কাছ থেকে একটি অনিবন্ধিত সমবায়ের সদস্য আলি, সায়েম ও সায়েদ প্রায় চার মাস ধরে প্রতিদিন ৬০ লিটার এবং পরবর্তী দুই মাস প্রতিদিন ৩০ লিটার দুধ সংগ্রহ করতেন। পরে আবারও প্রতিদিন ৬০ লিটার দুধ সরবরাহের জন্য চাপ দেওয়া হয়। এতে রাজি না হওয়ায় তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সাধন ঘোষের অভিযোগ, গত ২৭ জুলাই ডা. মো. মঞ্জুরুল হাসান কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তার বাড়িতে যান। তার অনুপস্থিতিতে বসতবাড়িতে প্রবেশ করে কর্মচারী নয়ন চন্দ্র ঘোষকে মারধর করা হয়। পরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সাত লাখ টাকা নগদ, প্রায় ৭০ হাজার টাকার মালামাল এবং প্রায় ৩৫০ লিটার দুধ নিয়ে যাওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।

এ ঘটনায় ২৯ জুলাই তিনি মাদারগঞ্জ মডেল থানায় ডা. মো. মঞ্জুরুল হাসান, মিল্কভিটার সমবায় সংগঠক সুজাত আলী এবং সমবায়ী আলি, সায়েম ও সায়েদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্তরা। সমবায়ী আলি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। মিল্কভিটার উপ-ব্যবস্থাপক তাদের সাক্ষী হিসেবে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে ৩০০ থেকে ৪০০ লিটার সন্দেহভাজন ভেজাল দুধ, জেলি ও একটি মোটর পাওয়া যায়। পরে সেগুলো জব্দ করা হয় এবং দুধ অপসারণ (ড্রেনেজ) করা হয় বলে তার দাবি।

অনুসন্ধানে আলির কোনো নিজস্ব খামার বা গরুর সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, নিজস্ব গরু না থাকলেও খামারিদের অগ্রিম টাকা দিয়ে তাদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে মিল্কভিটায় সরবরাহ করেন।

অন্যদিকে অভিযোগ দায়েরের পরদিন মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ সাধন ঘোষের বিরুদ্ধে বাড়িতে ভেজাল দুধ তৈরির উপকরণ রাখার অভিযোগে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে।

মাদারগঞ্জ দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্রের উপ-ব্যবস্থাপক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. মো. মঞ্জুরুল হাসান বলেন, তিনি কয়েকজন সমবায়ীকে সঙ্গে নিয়ে সাধন ঘোষের খামার পরিদর্শনে যান। সেখানে ভেজাল দুধ তৈরির জেলি ও দুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে কোনো দুধ বা মোটর জব্দ করা হয়নি এবং দুধ নষ্টও করা হয়নি।

তিনি বলেন, নমুনাগুলো পরীক্ষার জন্য প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

চাঁদাবাজি ও লুটপাটের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।

অনিবন্ধিত সমবায়ের মাধ্যমে দুধ সংগ্রহের বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ১৭টি সমবায়ের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করা হচ্ছে। অনিবন্ধিত সমিতির মাধ্যমেও দুধ আসে। তবে গরু না থাকলে কোনো সমবায়ের দুধ সরবরাহ করার কথা নয়। অনুসন্ধানে একাধিক খামারির গরু না থাকার বিষয়টি জানানো হলে তিনি পরে বলেন, এসব সমিতি আগে থেকেই দুধ সরবরাহ করে আসছে।

মিল্কভিটার উপ-ব্যবস্থাপক হিসেবে অভিযান পরিচালনার এখতিয়ার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি। তিনি বলেন, তিনি ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা এবং মিল্কভিটা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত হলেও মাদারগঞ্জ দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্রের কার্যক্রম সরাসরি কেন্দ্রীয় কার্যালয় (ঢাকা) থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়।

বক্তব্যের বিভিন্ন পর্যায়ে ডা. মঞ্জুরুল হাসানের বক্তব্যে কিছু অসামঞ্জস্য দেখা যায়। প্রথমে তিনি কয়েকজন সমবায়ীকে সঙ্গে নিয়ে খামার পরিদর্শনের কথা বললেও পরে বলেন, সমবায়ীরাই নিজেরা সেখানে গিয়েছিলেন। এছাড়া ভেজাল দুধ ও দুধ তৈরির উপকরণ জব্দের দুই দিন পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে ওই খামারির বাড়িতে অভিযান পরিচালনার অনুরোধ জানানোর বিষয়টি তিনি প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করেন।

উপজেলা সমবায় অফিস সূত্রে জানা গেছে, মাদারগঞ্জ উপজেলায় বর্তমানে ১১টি নিবন্ধিত দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি রয়েছে।

মিল্কভিটা সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে মাদারগঞ্জ দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সময়ে ভেজাল দুধ সরবরাহের অভিযোগে কেন্দ্রটির কার্যক্রম কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নির্দেশে তিন থেকে চারবার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল।

বর্তমানে কেন্দ্রটিতে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করা হয়। দুধের চর্বির (ফ্যাট) পরিমাণের ভিত্তিতে প্রতি লিটারের মূল্য ৪০ থেকে ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি খামার থেকে সংগ্রহকেন্দ্রের দূরত্ব বিবেচনায় দুধ সরবরাহকারী খামারিদের পরিবহন ভাড়াও দেওয়া হয়।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে মাত্র সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার লিটার মিল্কভিটায় সরবরাহ করা হয়। বাকি দুধ স্থানীয় মিষ্টি, দই, ঘি ও অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি হয়।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আতিকুর রহমান বলেন, কোনো খামারির বাড়িতে ভেজাল দুধ তৈরির উপকরণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরকে অবহিত করা উচিত ছিল, যাতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

মাদারগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্নেহাশীষ রায় বলেন, সাধন ঘোষ মিল্কভিটার উপ-ব্যবস্থাপকসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও লুটপাটের অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগটি তদন্তাধীন। একই সঙ্গে মিল্কভিটার পক্ষ থেকেও সাধন ঘোষের বিরুদ্ধে ভেজাল দুধ তৈরির উপকরণ জব্দের ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সাধন ঘোষ থানায় অভিযোগ করলেও বর্তমানে তিনি আইনগত সহায়তা চাইছেন না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী বলেন, মিল্কভিটার উপ-ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে থানায় একটি অভিযোগ হয়েছে। তবে ভেজাল দুধ বা দুধ তৈরির উপকরণ জব্দের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনকে আগে থেকে অবহিত করা হয়নি।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  অভিযোগ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close