বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক বলেছেন, “প্রধান বিচারপতি যেন প্রধানমন্ত্রীর আজ্ঞাবহ বা চাটুকার কোনো ব্যক্তি না হন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে বিচারব্যবস্থাকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।”
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস উপজেলা শাখা আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মামুনুল হক বলেন, “রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)। সরকারি নিয়োগের মাধ্যমে দেশের প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিয়োগ ও পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি পান। কিন্তু দেশের অন্যতম বড় সমস্যা হলো, যে দল ক্ষমতায় আসে, তারা দলীয় নেতাকর্মী ও অনুসারীদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়। এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।”
তিনি বলেন, “বিগত সরকারের সময়ে জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ বাহিনীও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারেনি। পুলিশের মধ্যে দলীয় আনুগত্যের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, ভবিষ্যতে আমরা আর তা দেখতে চাই না। আগামী দিনে জাতীয়তাবাদী দল, যুবদল বা ছাত্রদলের পর কোনো ‘পুলিশ দল’ তৈরি হোক, সেটিও আমরা চাই না। পুলিশ ও প্রশাসনকে দেশের জনগণের জন্য নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদে পিএসসির মাধ্যমে এমনভাবে সরকারি নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে দলীয় বিবেচনায় কাউকে নিয়োগের সুযোগ না থাকে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, “নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেবে, সেটিও যেন কোনো রাজনৈতিক দলের আধিপত্যের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পর দেশে ওয়ান-ইলেভেনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে।”
বর্তমান সংবিধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিদ্যমান সংবিধান বহাল রেখে বাংলাদেশ পরিচালনা করতে থাকলে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আবারও স্বৈরতন্ত্র তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শেখ হাসিনা একদিনে ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠেননি; সংবিধানের বৈষম্যমূলক ও এককেন্দ্রিক ক্ষমতার কাঠামো তাকে ফ্যাসিবাদী হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল”।
মামুনুল হক বলেন, “একই ব্যবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে যে কোনো শাসকও স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারেন। তিনি বলেন, ‘আমরা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি ভালোবাসা রাখি। কিন্তু আমরা চাই না, তারেক জিয়াও যেন ভবিষ্যতে আরেক শেখ হাসিনায় পরিণত হওয়ার সুযোগ পান।”
জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করা হলে ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শাসনের পথ বন্ধ হবে। জুলাই সনদে রাষ্ট্রব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে রাষ্ট্রের অধিকাংশ ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত। প্রস্তাবিত সংস্কারের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রপতি ও বিচার বিভাগের মধ্যে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা বণ্টনের কথা বলা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে বিচার বিভাগ ও বিচার অঙ্গনের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব থাকায় প্রধান বিচারপতির স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। তাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।”
গণভোট প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে যেন কোনো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে এবং সংবিধান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় আমূল পরিবর্তন আনা যায়।”
তিনি বলেন, “২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৩৩টি রাজনৈতিক দল দীর্ঘ নয় মাস জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে যে সংস্কার প্রস্তাবের সনদ তৈরি করেছে, সেটিই ‘জুলাই সনদ’। সেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্যই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।”
সমাবেশে করিমগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি মুফতি মোহাম্মদ দ্বীন ইসলামের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ হাদী ও বায়তুল মাল সম্পাদক মাওলানা ফজলুর রহমান।
এ সময় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের স্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
কেকে/সাশ