পৃথিবীর শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধান বা রাষ্ট্রপতি পদটি সর্বোচ্চ মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রাচীন রাজতন্ত্রের অবসানের পর আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই পদের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা এবং কার্যপরিধি এক নয়। কোথাও তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, আবার কোথাও তিনি শুধুই আনুষ্ঠানিক প্রধান। বিশ্বজুড়ে এ পদের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক বৈচিত্র্য দেখা যায়। রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের এ বৈচিত্র্যময় পদ্ধতিগুলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং গবেষণাধর্মী বিষয় হিসেবে আজ সারা বিশ্বে পরিগণিত হচ্ছে।
বিশ্বে মূলত তিন ধরনের পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রথমত, প্রত্যক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি যেখানে জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে তাদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। দ্বিতীয়ত, পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি যেখানে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি বা সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি বেছে নেন। তৃতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশেষ ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতি রয়েছে। এ ছাড়া কিছু দেশে মিশ্র বা আধা-রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থাও বিদ্যমান।
মহাদেশভিত্তিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতির মধ্য এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মিশ্র এবং পরোক্ষ পদ্ধতির আধিপত্য দেখা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত, পাকিস্তান এবং নেপালে রাষ্ট্রপতি পরোক্ষভাবে সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। অন্যদিকে চীন এবং ভিয়েতনামের মতো সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে দলীয় জাতীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান মনোনীত হন। সিঙ্গাপুরে আবার সরাসরি জনগণের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা এবং ইরান প্রভৃতি দেশে আবার সরাসরি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। মধ্যপ্রাচ্যের লেবাননে ধর্মীয় সমীকরণের ভিত্তিতে সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। উত্তর কোরিয়া এবং লাওসের মতো দেশে সর্বোচ্চ আইনসভা কর্তৃক রাষ্ট্রপ্রধানের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়। এশিয়ার বিশাল ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই মূলত এ মহাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের নানামুখী পদ্ধতি ও রাজনৈতিক কাঠামোর পেছনে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
ইউরোপ মহাদেশের দেশগুলোতে প্রধানত সংসদীয় গণতন্ত্র এবং আধা-রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান। ফ্রান্স, পর্তুগাল, ফিনল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ড প্রভৃতি দেশে রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। অপরদিকে জার্মানি, ইতালি, গ্রিস এবং আলবেনিয়ার মতো দেশগুলোতে রাষ্ট্রপতি একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি বা আইনসভার পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। ইউরোপে এই দুই পদ্ধতিরই ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।
যুক্তরাজ্য, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, নরওয়ে এবং বেলজিয়ামে কোনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয় না। কারণ এ রাষ্ট্রগুলোতে এখনো ঐতিহ্যগত সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও রাজা বা রানির পদটি টিকে রয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মতো পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে শক্তিশালী রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা বিদ্যমান। সেখানে সরাসরি জনগণের ভোটে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন। ইউরোপের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক বিবর্তনই এ নির্বাচন পদ্ধতির বৈচিত্র্য নির্ধারণ করেছে।
আফ্রিকা মহাদেশের অধিকাংশ দেশেই সরাসরি জনগণের অংশগ্রহণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নাইজেরিয়া, কেনিয়া, ঘানা, মিসর, সেনেগাল এবং কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন করা হয়ে থাকে। এ দেশগুলোতে রাষ্ট্রপতি সাধারণত রাষ্ট্র ও সরকারের প্রধান হিসেবে ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতা ভোগ করেন। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশে পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ আলাদা ও পরোক্ষ প্রকৃতির।
দক্ষিণ আফ্রিকা এবং বোতসোয়ানা প্রভৃতি দেশে সাধারণ নির্বাচনের পর নবগঠিত সংসদের সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। লিবিয়া এবং সোমালিয়ার মতো রাজনৈতিকভাবে ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোতে বিশেষ উপজাতীয় বা অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান মনোনীত করা হয়। জিম্বাবুয়ে, আলজেরিয়া এবং তিউনিসিয়ায় রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার কারণে সরাসরি নির্বাচন বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়। আফ্রিকার ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও জাতিগত সমীকরণ তাদের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে।
উত্তর আমেরিকা মহাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এক অনন্য ও অত্যন্ত প্রভাববিস্তারী পদ্ধতি লক্ষ্য করা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভোটাররা সরাসরি রাষ্ট্রপতিকে ভোট দেন না, বরং তারা ইলেক্টোরাল কলেজ নামক একটি নির্বাচক মণ্ডলী গঠন করেন। এ নির্বাচকদের ভোটেই মূলত দেশটির রাষ্ট্রপতি এবং উপ-রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এটি বিশ্বের সবচেয়ে জটিল এবং আলোচিত পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে স্বীকৃত।
মেক্সিকো, কোস্টারিকা, গুয়াতেমালা, পানামা, হন্ডুরাস এবং এল সালভাদরের মতো মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে আবার সরাসরি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কানাডা, জামাইকা এবং বাহামাসের মতো দেশগুলো কমনওয়েলথভুক্ত হওয়ায় সেখানে কোনো রাষ্ট্রপতি পদ নেই। ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে গভর্নর জেনারেল সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করেন। উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক প্রভাব তাদের শাসনব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয়।
দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের প্রায় প্রতিটি দেশেই শক্তিশালী একক রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, চিলি, পেরু এবং ভেনিজুয়েলার মতো দেশগুলোতে সরাসরি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এ মহাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রথম পর্বে কোনো প্রার্থী এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে শীর্ষ দুই প্রার্থীকে নিয়ে দ্বিতীয় পর্বের রান-অফ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ইকুয়েডর, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে এবং সুরিনামেও একই ধরনের কঠোর সাংবিধানিক নিয়মে সরাসরি নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে রাষ্ট্রপতি একইসঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকারপ্রধান হিসেবে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেন। এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক সামরিক একনায়কতন্ত্রের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই আধুনিক যুগে এসে সরাসরি জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের ধারাটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ওশেনিয়া মহাদেশের দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং রাষ্ট্রপ্রধানের পদ নিয়ে বিচিত্র সাংবিধানিক কাঠামো রয়েছে। কিরিবাতি এবং ফিজি দ্বীপে আইনসভার সদস্যদের মনোনয়নের পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে বা সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, নাউরু এবং ভানুয়াতুর মতো ছোট ছোট দেশগুলোতে সাধারণত সংসদ সদস্যদের পরোক্ষ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান বেছে নেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, পাপুয়া নিউগিনি এবং সলোমন দ্বীপপুঞ্জে কোনো রাষ্ট্রপতি পদ নেই। এ রাষ্ট্রগুলো ব্রিটিশ রাজমুকুটকে তাদের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মান্য করে এবং গভর্নর জেনারেল সেই দায়িত্ব পালন করেন। সামোয়া এবং টুভালুর মতো দেশগুলোতে ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রধানদের সম্মানে বিশেষ সাংবিধানিক পদ তৈরি করা হয়েছে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদটি দেশের সর্বোচ্চ এবং অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একক আসন। বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের রাষ্ট্রপতি পরোক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। এ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে যে, জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
এ ছাড়া সংবিধানের ১১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই নির্বাচন পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে দেশের স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের ওপর।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ, উদ্দীপনা ও গভীর আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর শূন্য হওয়া এই পদে আগামী ২০ আগস্ট সংসদীয় কক্ষে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী মনোনীত করেছে। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে এ ভোটগ্রহণ হতে যাচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের এ সুদীর্ঘ ইতিকথা পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, প্রতিটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রয়োজনেই নির্বাচন পদ্ধতি নির্ধারণ করে। প্রত্যক্ষ ভোট যেমন জনগণের সরাসরি আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটায়, তেমনি পরোক্ষ পদ্ধতি সংসদীয় ব্যবস্থাকে সুসংহত করে। ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দেশীয় রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও এক নতুন কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। সর্বজনগ্রাহ্য ও গণতান্ত্রিক পন্থায় রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনই মূলত একটি আধুনিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় বহন করে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক
কেকে/এলএ