বিশ্ব অর্থনীতির সামনে এখন দুটি চ্যালেঞ্জ—একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ। দীর্ঘদিনের প্রচলিত ‘নাও তৈরি করো-ব্যবহার করো-ফেলে দাও’ বা রৈখিক অর্থনৈতিক মডেল এই সংকটকে গভীর করেছে। ফলে সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য হ্রাসকে প্রকৃতি সংরক্ষণের সঙ্গে একীভূত করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে ‘বৃত্তাকার অর্থনীতি’ গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক রূপান্তরের ধারণা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এই বৃত্তাকার অর্থনীতির সঙ্গে সমুদ্র, উপকূল, মৎস্য ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের টেকসই ব্যবহার যুক্ত হলে গড়ে ওঠে ‘বৃত্তাকার নীল অর্থনীতি’। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অথচ বিশাল সামুদ্রিক সম্পদসমৃদ্ধ দেশের জন্য এটি কেবল নতুন উন্নয়ন-দর্শন নয়; বরং ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কৌশলগত বিষয়।
১৭ সেপ্টেম্বর ভারতের গুজরাটের গান্ধীনগরে অনুষ্ঠিতব্য ‘বিশ্ব বৃত্তাকার অর্থনীতি ফোরাম ২০২৬’-এর (WCEF 2026) অ্যাক্সিলারেটর সেশন ‘বৃত্তাকার নীল অর্থনীতি: দক্ষিণ এশিয়ার অগ্রদূত হিসেবে বাংলাদেশ’ এই আলোচনাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে এসেছে। ১৫ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই ফোরাম যৌথভাবে আয়োজন করেছে ফিনিশ ইনোভেশন ফান্ড সিট্রা এবং ভারতের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড। বাংলাদেশের নীল অর্থনীতিকে বৃত্তাকার অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবে উপস্থাপন এই সেশনের মূল তাৎপর্য।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণের পর মৎস্য, সামুদ্রিক পরিবহন, বন্দর, জাহাজ নির্মাণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সামুদ্রিক জৈবপ্রযুক্তি—বিভিন্ন খাতে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন হলো: সমুদ্রকে কি শুধু সম্পদ আহরণের জায়গা হিসেবে দেখব, নাকি প্রাকৃতিক উৎপাদনক্ষমতা রক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করব? বৃত্তাকার নীল অর্থনীতি দ্বিতীয় পথটির কথাই বলে।
সুস্থ সামুদ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা ছাড়া টেকসই মৎস্য উৎপাদন সম্ভব নয়। ম্যানগ্রোভ, মোহনা, সামুদ্রিক ঘাসভূমি ও প্রবাল শুধু জীববৈচিত্র্যের জন্য নয়; এগুলো মাছের প্রজননক্ষেত্র, উপকূল সুরক্ষা, কার্বন ধারণ ও স্থানীয় জীবিকার ভিত্তি। ফলে সমুদ্র থেকে যত বেশি সম্পদ আহরণ, সেটিই সাফল্যের মানদণ্ড হতে পারে না। প্রশ্ন হতে হবে—প্রকৃতির পুনরুৎপাদনক্ষমতার সীমার মধ্যে কত বেশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য সৃষ্টি সম্ভব?
বাংলাদেশ দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতির দেশ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। উপকূলীয় জনগোষ্ঠী ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বহুমাত্রিক ঝুঁকির মুখে। একই সময়ে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তায় মৎস্য খাতের অবদান গুরুত্বপূর্ণ এবং বিপুল জনগোষ্ঠী সামুদ্রিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতায় নীল অর্থনীতির নীতি হতে হবে একই সঙ্গে উৎপাদনমুখী, সংরক্ষণমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
বৃত্তাকার অর্থনীতির মূল ধারণা—এক প্রক্রিয়ার বর্জ্য অন্য প্রক্রিয়ায় সম্পদে পরিণত হতে পারে। সামুদ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রয়োগের বিশাল সুযোগ রয়েছে। মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের বর্জ্য থেকে প্রোটিন, তেল, কোলাজেন ও জৈবসার তৈরি সম্ভব। সামুদ্রিক শৈবাল ও অন্যান্য জীবভর থেকে খাদ্য, পশুখাদ্য, প্রসাধনী ও শিল্পের কাঁচামাল তৈরি হতে পারে। এখানেই ‘সামুদ্রিক জৈব-মূল্য সংযোজন’ গুরুত্বপূর্ণ—সামুদ্রিক জৈবসম্পদকে কাঁচা পণ্য হিসেবে না বেচে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তর।
মৎস্যসম্পদ বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু মজুতের ওপর চাপ, অতিরিক্ত আহরণ, অবৈধ মাছ ধরা ও আবাসস্থলের অবক্ষয় সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের স্থায়িত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মৎস্য খাতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদনক্ষমতা রক্ষা জরুরি। এজন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক মৎস্যভান্ডার মূল্যায়ন, কার্যকর ব্যবস্থাপনা, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জেলেদের অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা। একই সঙ্গে টেকসই জলজ চাষে পরিবেশগত প্রভাব কমানো, রোগ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের স্থায়িত্ব মানদণ্ড পূরণ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববাজারে পরিবেশ ও জলবায়ু-সংক্রান্ত মানদণ্ড দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। মৎস্য ও সামুদ্রিক পণ্যের ক্ষেত্রে টেকসই উৎস সংগ্রহ, উৎস শনাক্তকরণ, পরিবেশবান্ধব সার্টিফিকেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে পরিবেশগত মান পূরণ করতে না পারলে অনেক পণ্যের বাজারে প্রবেশ কঠিন হতে পারে। তাই বৃত্তাকার নীল অর্থনীতি পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বাণিজ্য কৌশলও হতে পারে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র। এই খাত শিল্প, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখলেও পরিবেশ, শ্রমিক নিরাপত্তা ও বিপজ্জনক উপাদান ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন জড়িত। বৃত্তাকার অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ বৃত্তাকার শিল্প—পুরোনো জাহাজের ইস্পাত ও উপাদান পুনরুদ্ধার করে অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত না হলে মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। তাই নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও বিশ্বাসযোগ্য শিল্প গড়ে তোলা লক্ষ্য হওয়া উচিত।
নীল অর্থনীতির আলোচনায় বিনিয়োগ, রপ্তানি ও প্রযুক্তির পাশাপাশি উপকূলের মানুষ—জেলে, মাছচাষি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নারী ও যুবক—কেন্দ্রীয় অংশ। নতুন প্রকল্পের ফলে স্থানীয় মানুষের জীবিকা সংকুচিত হলে বা প্রবেশাধিকার কমে গেলে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক উপকূলীয় জীবিকা বৃত্তাকার নীল অর্থনীতির মৌলিক স্তম্ভ। নারীদের জন্য নতুন সুযোগ, যুবকদের জন্য সবুজ দক্ষতা, ক্ষুদ্র জেলে ও মাছচাষিদের জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ ও অন্যান্য নীল কার্বন বাস্তুতন্ত্র জলবায়ু প্রশমন ও উপকূল সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে এটি জলবায়ু অর্থায়নের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হতে পারে। তবে কার্বন ক্রেডিট ব্যবসায় পরিণত না করে প্রকৃত কার্বন ধারণের পরিমাণ নির্ভরযোগ্যভাবে পরিমাপ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
বৃত্তাকার নীল অর্থনীতিতে বিনিয়োগের বাধা কাটাতে মিশ্র অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি অর্থ, উন্নয়ন সহযোগী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি মূলধন এক কাঠামোয় আনলে ঝুঁকি ভাগ করা সম্ভব।
বঙ্গোপসাগর আন্তঃসীমান্ত সামুদ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা। বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের সামুদ্রিক সম্পদ, পরিবেশগত ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। সামুদ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, মৎস্য ব্যবস্থাপনা, গবেষণা, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও টেকসই নৌপরিবহনে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরবর্তী পর্যায়ে সমুদ্র গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তক্ষেত্র। কিন্তু এই সীমান্তক্ষেত্রের অর্থ শুধু বেশি মাছ ধরা বা জাহাজ ভাঙা নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ—প্রকৃতিকে অক্ষুণ্ন রেখে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি। বৃত্তাকার নীল অর্থনীতি অর্থনীতি ও পরিবেশকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে একই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কতটা মাছ ধরা বা কত বেশি রপ্তানি তার ওপর নয়; বরং নির্ভর করবে সমুদ্রের উৎপাদনশীলতা, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা কতটা দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত রাখা যায় তার ওপর। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে একই কাঠামোয় আনতে পারলে বঙ্গোপসাগর সম্পদের ভান্ডার নয়, বরং জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবনী ও প্রকৃতিবান্ধব অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠবে।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট
কেকে/ এমএস