জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের রেশ কাটতে না কাটতেই তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে। বাস ভাড়া বেড়েছে, সবজির দাম বেড়েছে, চাল-ডাল-তেল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দামেই তার আঁচ লেগেছে। এক লিটার জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে যে শুধু গাড়ির তেলের খরচ বাড়ে তা নয়—তার প্রভাব গিয়ে পড়ে কৃষকের সেচযন্ত্রে, ট্রাকচালকের ভাড়ায়, কারখানার উৎপাদন ব্যয়ে, শেষমেশ সাধারণ ভোক্তার হাতে থাকা সীমিত টাকার হিসেবে। এ শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া নতুন কিছু নয়, তবে প্রতিবারই তা সবচেয়ে নির্মমভাবে আঘাত করে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশ স্বল্প আয়ের মানুষদের।
আমরা লক্ষ করছি, সরকার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা হিসেবে ভর্তুকির চাপ কমানোর কথা বলছে। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে এ যুক্তি একেবারে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এ সমন্বয়ের বোঝা কার কাঁধে চাপানো হচ্ছে, আর তা বহনের সামর্থ্য তাদের কতটুকু আছে।
খোলাকাগজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যে রফিকুল ইসলাম মাসে ৪৫ হাজার টাকা বেতনে চারজনের সংসার চালান, কিংবা যে সেলিম হোসেন ৩০ হাজার টাকায় দুই সন্তানের পড়াশোনা ও সংসারের ব্যয় মেটান—তাদের আয় বাড়েনি, অথচ প্রতি মাসেই ব্যয়ের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। সঞ্চয় ভেঙে, প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে তারা কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। এ বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা নয়, বরং দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। এত গেল মধ্যবিত্তের কথা, এর বাইরে সারা দেশে স্বল্প আয়ের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে যাদের আয় ২০ হাজার টাকা বা তার নিচে। এ মানুষেরা কোথায় যাবে? তাদের জীবন ও জীবিকা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে আছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। কৃষি, শিল্প, নির্মাণ—সবখানেই উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষত পোশাকশিল্প, যেখানে ইতোমধ্যে গ্যাস সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপে রয়েছে, সেখানে বাড়তি জ্বালানি খরচ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করতে পারে। অর্থাৎ এ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু আজকের বাজারদরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও ছায়া ফেলতে পারে।
আমরা মনে করি, নিছক মূল্যবৃদ্ধি ঘোষণা করেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বাজারে তার প্রভাব যাতে অযৌক্তিকভাবে বেড়ে না যায়, সে জন্য কার্যকর ও দৃশ্যমান নজরদারি জরুরি। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, জ্বালানির দাম যতটুকু যৌক্তিকভাবে বাড়ার কথা, বাজারে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলা হয়—কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ বুঝে বাড়তি মুনাফা তুলে নেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উচিত নিয়মিত বাজার তদারকি, মূল্যতালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া—কেবল ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নেও। পাশাপাশি, নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তদের সুরক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন।
খোলাবাজারে ন্যায্যমূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রি, পরিবহন খাতে ভাড়ার সীমা কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং কৃষি উপকরণে ভর্তুকি অব্যাহত রাখার মতো পদক্ষেপ এ মুহূর্তে জরুরি হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের চাপ কমানো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যাতে দুর্বিষহ হয়ে না ওঠে, সে বিষয়েও রাষ্ট্রকে সমান মনোযোগী হতে হবে। একদিকে ভর্তুকি কমানোর যুক্তি, অন্যদিকে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি রোধ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা আশা করি, সরকার শুধু মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরেই ক্ষান্ত থাকবে না, বরং তার প্রভাব প্রশমনে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
কেকে/এআই