সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের (গবি) শিক্ষার্থীর বাসায় হামলাচেষ্টার ঘটনায় মুচলেকা দিয়েছেন সেই বাসায় অবস্থান করা দম্পতির স্বামী মোজাম্মেল হাওলাদার। এছাড়া এক দিনের মধ্যেই তিনি বাসা ত্যাগ করবেন এবং এ ঘটনায় কোনো অভিযোগ করবেন না বলেও লিখিত দিয়েছেন।
সোমবার (১৭ আগস্ট) এ ঘটনায় উপজেলার নলাম এলাকায় স্থানীয় এলাকাবাসী, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষের একটি বৈঠকে এ মীমাংসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর আগে, ওই ভুক্তভোগী গণমাধ্যমের কাছে জানান, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁর বাসায় হামলার চেষ্টা করেছেন। বাসাটিতে একটি কক্ষে তিনি ও তাঁর স্ত্রী এবং অপর কক্ষে আরও দুই নারী শিক্ষার্থী সাবলেট থাকতেন। তবে হামলাচেষ্টার সময় তাঁরা বাসায় ছিলেন না।
অন্যদিকে, মীমাংসার দায়িত্ব নেওয়া গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) ভিপি ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান সে সময় জানান, ওই শিক্ষার্থী বাসাটিতে লিভ-ইনে থাকতেন—এমন খবরে তাঁরা বাসায় যান। তবে হামলার ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেন তিনি।
ভুক্তভোগী মোজাম্মেল হাওলাদার গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস অনুষদের শিক্ষার্থী। তিনি ক্যাম্পাসে ফেসবুক আইডি ‘নীলাদ্র শুভ’ নামে ও জুলাই যোদ্ধা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন। তিনি অদম্য ২৪ নামে একটি সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত বলে জানা যায়। তিনি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার টিয়াখালী ইউনিয়নের কলাপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. ইউনুচ আলীর ছেলে। আর তাঁর স্ত্রী স্বজনী আক্তার রুমি ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার পাড়াগঞ্জ ইউনিয়নের পাড়াখোলা এলাকার বাসিন্দা।
এদিকে মঙ্গলবার এ ঘটনায় ভিন্ন বক্তব্য দেন ভুক্তভোগী মোজাম্মেল হাওলাদার। তাঁর ভাষ্য, সেখানে একটি ভুল বোঝাবুঝির ঘটনা ঘটে। আর স্ত্রীসহ তিন তরুণী এক বাসায় থাকার বিষয়টি নিয়ে তাঁকে কথিত বড় ভাইদের বিয়ের কাগজপত্র দেখাতে হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এসবের জেরে বিকেলের দিকে স্থানীয়ভাবে একটি সালিশি বৈঠক হয়। এরপর তিনি সবকিছু ভুল বোঝাবুঝি উল্লেখ করে এক দিনের মধ্যে বাসা ছাড়ার মুচলেকা দেন।
মুচলেকায় ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তি লিখেছেন, গত ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে তাঁর বাসায় কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। বিষয়টি ছিল মূলত তাঁর ক্যাম্পাসের কয়েকজন বড় ভাই একটি বিষয়ে খোঁজখবর নিতে তাঁর বাসায় এসেছিলেন। ওই সময় তিনি বাসায় উপস্থিত ছিলেন না। বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল বলেও মুচলেকায় উল্লেখ করেন তিনি।
এ ঘটনায় মূল ভুলটি তাঁরই ছিল বলেও মুচলেকায় উল্লেখ করা হয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে আসা বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন বড় ভাই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি সম্প্রতি বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন। তবে বাড়িওয়ালাকে না জানিয়ে তাঁর ফ্ল্যাটের দুটি কক্ষ দুই তরুণীকে সাবলেট ভাড়া দিয়েছিলেন। বিষয়টি সামাজিকভাবে দৃষ্টিকটু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি, বাড়িওয়ালা, এলাকাবাসী ও ছাত্র সংসদের উপস্থিতিতে বিষয়টির মীমাংসা করা হয়।
মুচলেকায় সমঝোতার বিষয় উল্লেখ করে ওই ভুক্তভোগী বলেন, ১৮ আগস্ট ২০২৬ থেকে তিনি বাসা পরিবর্তন করবেন এবং একই সঙ্গে বিষয়টির এখানেই নিষ্পত্তি হবে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে তিনি কোনো ধরনের অভিযোগ করবেন না।
তিনি বলেন, বিষয়টি একটি ভুল-বোঝাবুঝি ছিল। দুই দিন আগে তাঁদের বাসায় চুরি হয়। তখন থেকেই সবাই সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। এরপর তাঁর নামে কিছু অভিযোগ থাকায় ক্যাম্পাসের বড় ভাইয়েরা বিষয়টি যাচাই করার জন্য আসেন। তখন তিনি বাসায় ছিলেন না। তিনি ভেবেছিলেন, কে বা কারা এসেছেন। পরবর্তীতে ছাত্র সংসদের ভিপি আসেন এবং তাঁদের বিয়ের কাগজপত্র দেখতে চান। কোর্ট ম্যারেজের কাগজপত্র দেখানো হলেও তাঁরা এতে সন্তুষ্ট হননি। পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়, তিনি এই বাসায় থাকবেন না এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না মর্মে বিষয়টির মীমাংসা করা হয়।
বিয়ের দুই নথি, ভিন্ন তথ্য
এদিকে স্ত্রী পরিচয় দেওয়া নারীসহ প্রায় পাঁচ মাস ধরে বাসাটিতে অবস্থান করছিলেন ভুক্তভোগী মোজাম্মেল। গতকালের ঘটনার পর বিবাহ-সংক্রান্ত অন্তত দুটি নথি তিনি প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে কাবিনের একটি নথিতে বিবাহের তারিখ ২০২৫ সালের ৭ মার্চ। নথিটি নিজের ফেসবুকে প্রকাশ করেন তিনি। আর নোটারি বিবাহের নথিতে বিবাহের তারিখ ১৫ আগস্ট ২০২৬। নথি অনুযায়ী, মোজাম্মেলের স্ত্রী তাঁর চেয়ে এক বছর বয়সে বড়।
অসত্য তথ্যে বাসা নেন মোজাম্মেল, এলাকায় অসন্তোষ
মোজাম্মেল দম্পতির বিয়ে নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিষয়ে স্থানীয়দের ভাষ্যে জানা যায়, অসত্য তথ্য দিয়ে বাসাটিতে অবস্থান করছিলেন তিনি ও তাঁর স্ত্রী। এছাড়া লিভ-ইন নিয়ে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যও উঠে আসে স্থানীয়দের ভাষ্যে।
জামাল উদ্দিন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘এই বাসায় তিনটি মেয়ের সঙ্গে সে থাকত। একজনের পরিচয় দেয় তার ফুফাতো বোন এবং সেই পরিচয়েই এখানে থাকা শুরু করে। কিন্তু বাড়িওয়ালা এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না। এই বিষয়ে তদারকি করার জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী ওর কাছে আসে। কিন্তু এই বিষয়টিকে মিথ্যাভাবে প্রচার করে মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম খারাপ করার পাঁয়তারা করে। সে লিভ-ইনে থাকে, তার প্রমাণও আমাদের কাছে আছে। সে বলে বিয়ে করেছে, কিন্তু তার কোনো প্রমাণ তার কাছে নেই। আজকে সে একটি স্ট্যাম্প নিয়ে আসছে, যার কোনো ভিত্তি নেই। পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা হয়েছে।’
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘সে বলেছিল বিবাহিত এবং স্ত্রীসহ এই বাসায় থাকে। কিন্তু বিয়ের যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ সে দেখাতে পারেনি। এখানে সে মোট তিনটা মেয়ের সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে থাকত। গতকাল রাতে সে অভিযোগ করে, তার বাসায় হামলা করা হয়েছে। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি এসে সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করে দেখে, অভিযোগের বিষয়ে কোনো সত্যতা নেই; অর্থাৎ কোনো হামলা হয়নি। পরবর্তীতে মুচলেকার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হয়েছে।’
গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান বলেন, ‘নীলাদ্র শুভ জানায়, তার বাসায় হামলা হয়েছে। ঘটনাস্থলে এসে পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারি, হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি। সে আমাদের কাছে নিরাপত্তা চায় এবং আমরা তাকে আশ্বস্ত করি। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অভিযুক্তদের শনাক্ত করে তাদের সঙ্গে কথা বলি। তারা জানায়, নীলাদ্র শুভর বিরুদ্ধে তিনজন নারীর সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে থাকার অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসী বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিল এবং এ বিষয়ে জানার জন্যই অভিযুক্তরা বাসায় এসেছিল বলে জানায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি নিউজ পোর্টালে নিউজ প্রকাশিত হয়, যার মধ্যে পরিপূর্ণ সত্য তুলে ধরা হয়নি। প্রকাশিত সংবাদ একদমই ভুয়া। ভিডিও ফুটেজেও বিষয়টি প্রতীয়মান হয় যে তারা কেবল শুনতে এসেছিল, কোনো হামলা হয়নি। পরবর্তীতে বাড়িওয়ালা, এলাকাবাসী, অভিযোগকারী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরদের আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করা হয়েছে।’
প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য ড. মো. জামিনুর রহমান বলেন, ‘ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী প্রক্টরিয়াল বডিকে ফোন করে জানায়, তার বাসায় হামলা হয়েছে এবং তার নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। প্রক্টরিয়াল বডি থেকে অফিশিয়ালি সার্বিক বিষয়ে তথ্য-প্রমাণসহ জানানোর জন্য বলা হয়। পরবর্তীতে বিকেলে ভুক্তভোগী কল দিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার জন্য বলে। ঘটনাস্থলে বাড়িওয়ালা এবং এলাকাবাসী তাকে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন করে। আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পাই, বিষয়টি একটি ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছে। হামলার ঘটনা ঘটেনি এবং হামলার উদ্দেশ্যে কেউ বাসায় যায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তার ওপর অভিযোগ ছিল, বৈবাহিক পরিচয় ব্যতীত সে বাসা ভাড়া নিয়েছিল, যা বাড়িওয়ালা অবগত ছিলেন না। যেহেতু গ্রামের মধ্যে বাসা, সামাজিক কারণেই উক্ত বিষয়ে সমস্যার তৈরি হয়। ছাত্ররা সার্বিক বিষয়ে জানার জন্য তার কাছে এসেছিল। ভুক্তভোগী সার্বিক বিষয় স্বীকার করেছে এবং আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি ভুল-বোঝাবুঝি ও পরবর্তীতে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না মর্মে মুচলেকা দিয়েছে এবং বাসা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’
লিভ-ইনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি একটি সামাজিক বিষয়। সে আমাদের বিয়ের কাগজপত্র দেখিয়েছে এবং এটি আইনি বিষয়। সে মুচলেকা দিয়েছে, পরবর্তী সময়ে আর এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না মর্মে।’
এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কেকে/এমএস