কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন। গত ২৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শিক্ষার্থীবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও শৃঙ্খলার মানোন্নয়ন, শিক্ষা, গবেষণা, সমাবর্তন, রাজনীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
উপ-উপাচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানের পরিকল্পনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন খোলা কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খোলা কাগজের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি বি এম ফয়সাল।
খোলা কাগজ: আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?
উপ-উপাচার্য: ওয়ালাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।
খোলা কাগজ: শিক্ষক থেকে উপ-উপাচার্যের দায়িত্ব পাওয়ায় আপনার অনুভূতি কেমন?
উপ-উপাচার্য: আনন্দের পাশাপাশি দায়িত্ববোধ অনেক বেড়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে আমি একটি পরিবার হিসেবে দেখি। শিক্ষার্থীরা নিরাপদ থাকবে, তাদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত হবে এবং একাডেমিক কার্যক্রম নিয়মিত হবে—এটাই আমার মূল লক্ষ্য। পদটি সম্মানজনক, কিন্তু যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে না পারলে এটি আমার জন্য বড় দায় হয়ে দাঁড়াবে।
খোলা কাগজ: শিক্ষকতা পেশায় আসার কোন বিষয় আপনাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল?
উপ-উপাচার্য: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বুঝতে পারি, এখানে পড়াশোনার ধরন আলাদা। প্রথম সেমিস্টারে আমার সিজিপিএ ছিল ৩.৫০, আর প্রথম হওয়া শিক্ষার্থীর ছিল ৩.৭৫। তখন সিদ্ধান্ত নিই, আমাকে আরও ভালো করতে হবে। পরে বিভাগে প্রথম হয়ে ৩.৮৯ সিজিপিএ অর্জন করি। তখন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার লক্ষ্য স্থির করি। ঢাকা সিটি কলেজে মার্কেটিং বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দিই। এরপর পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বিবিএ প্রোগ্রাম চালুর সঙ্গে যুক্ত হই। পরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে বিভাগ উন্নয়নের দায়িত্ব পাই।
খোলা কাগজ: দায়িত্ব নেওয়ার পর আপনার প্রথম দিকের পদক্ষেপ কী ছিল?
উপ-উপাচার্য: দায়িত্ব নেওয়ার পর একাডেমিক শৃঙ্খলাকে গুরুত্ব দিয়েছি। ১৯টি বিভাগের ক্লাস রুটিন, একাডেমিক ক্যালেন্ডার, কারিকুলাম ও সিলেবাস ওয়েবসাইটে আপলোডের উদ্যোগ নিয়েছি। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো থেকে তথ্য নিয়ে আইসিটি সেলের মাধ্যমে এগুলো প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা এখন অনলাইনে এসব তথ্য দেখতে পারছে। পাশাপাশি পিএইচডি কার্যক্রমের একাডেমিক ক্যালেন্ডার ও শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়েও কাজ করছি।
খোলা কাগজ: কুবির অন্যতম সমস্যা সেশনজট ও ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা সমস্যা সমাধানে কি ধরনের পদক্ষেপ নিবেন?
উপ-উপাচার্য: বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। পরীক্ষার খাতা দেরিতে জমা দেওয়া শিক্ষকদের তালিকা নিয়েছি। ইতোমধ্যে কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছি এবং ভবিষ্যতে যেন খাতা সময়মতো জমা দেওয়া হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছি। কোন বিভাগ কোন সেমিস্টারে আছে, কোথায় কতটা পিছিয়ে আছে— তারও তথ্য সংগ্রহ করছি। বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে বসে একাডেমিক ক্যালেন্ডার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে চাই। প্রয়োজনে আমি সরাসরি বিভাগ পরিদর্শন করব।
খোলা কাগজ: ফলাফল অনলাইনে না পাওয়া শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ। এ বিষয়ে আপনার কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে?
উপ-উপাচার্য: রেজাল্ট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করার ব্যবস্থা করছি। পাশাপাশি ইআরপি চালুর বিষয়েও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এটি চালু হলে শিক্ষার্থীরা নিজের আইডির মাধ্যমে ফলাফল, সিজিপিএসহ একাডেমিক তথ্য দেখতে পারবে। ভবিষ্যতে শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
খোলা কাগজ: গবেষণায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে আপনার কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে?
উপ-উপাচার্য: গবেষণায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে চাই। শিক্ষকরা যেন গবেষণায় শিক্ষার্থীদের সহকারী হিসেবে যুক্ত করেন, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভাগভিত্তিক গবেষণা সেমিনার, উপস্থাপনা ও গোলটেবিল আলোচনার পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
খোলা কাগজ: বিদেশে পিএইচডি করতে যাওয়া শিক্ষকরা অনেকেই ফিরে আসতে চায় না। এ বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নিবেন?
উপ-উপাচার্য: এটি শুধু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা নয়; অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও আছে। যারা ছুটি শেষ করেও ফিরে আসছেন না, তাদের বিষয়ে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রথমে সতর্ক করা, পরে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া রয়েছে।
খোলা কাগজ: সমাবর্তন নিয়ে কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে?
উপ-উপাচার্য: সমাবর্তন শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। হুট করে এটি করা যায় না; যথাযথ প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া প্রয়োজন। তবে সমাবর্তন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আমি ইতিবাচক।
খোলা কাগজ: সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার সিদ্ধান্তের বিষয়ে আপনার অবস্থান কী? ভবিষ্যতে ছাত্র রাজনীতি চালুর সম্ভাবনা দেখছেন কি?
উপ-উপাচার্য: সিন্ডিকেটের যে সিদ্ধান্ত রয়েছে, সেটি এখনো বহাল আছে। তবে আমি মনে করি, শিক্ষার্থীদের সহাবস্থান নিশ্চিত থাকা ভালো। রাজনীতি করা তাদের সাংবিধানিক অধিকার। দল-মত নির্বিশেষে সবাই রাজনীতি করুক, তবে সেটি সুস্থ ধারার হতে হবে। কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে অন্য কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সহাবস্থান ঠিক থাকলে সমস্যা নেই; কিন্তু সংঘাত বা অস্থিরতা তৈরি হলে সিন্ডিকেট প্রয়োজনীয়।
খোলা কাগজ: আপনাকে ধন্যবাদ স্যার।
উপ-উপাচার্য: আপনাকেও ধন্যবাদ।
কেকে/সাশ