বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বর্তমানে একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। সীমান্তে প্রাণহানি, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং দুই দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পারস্পরিক উদ্বেগ- সব মিলিয়ে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে ভারতের আঞ্চলিক ভূমিকা ও প্রভাব নিয়ে জনপরিসরে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়েও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানা প্রশ্ন ও মতভেদ রয়েছে। এসব বিষয় ভারতের প্রতি জনমতের পরিবর্তনের পটভূমি তৈরি করেছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে ভারতের ভাবমূর্তি ২০২৪ সালের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। ২০২৪ সালে ভারতের প্রতি অনুকূল মত ছিল ৫৭ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে নেমে এসেছে ৪২ শতাংশে। একই জরিপে ৫১ শতাংশ বাংলাদেশি ভারতের প্রতি প্রতিকূল মত প্রকাশ করেছেন। তবে এই পরিবর্তনের কারণ হিসেবে জরিপটি কোনো একক ঘটনা, ব্যক্তি বা নীতিকে দায়ী করেনি। তাই সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই এ জনমতকে দেখা উচিত।
ভারতের প্রতিবেশনীতি নিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্ক আছে। অনেকের ধারণা, বড় রাষ্ট্র হিসেবে ভারত তার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয় এবং কখনো কখনো ছোট প্রতিবেশীদের উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। অন্যদিকে ভারত তার ভূমিকাকে আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতার ভাষায় ব্যাখ্যা করে। বাস্তবতা হলো, ভৌগোলিক নৈকট্য ও ক্ষমতার ব্যবধানের কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে সহযোগিতা এবং সতর্কতা- দুইটিরই প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের স্বার্থ কোনো একমুখী ভারতবিরোধিতা বা ভারতনির্ভরতার মধ্যে নয়। প্রয়োজন এমন একটি বহুমুখী, আত্মমর্যাদাশীল ও বাস্তবভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতা থাকবে; আবার পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য এবং সার্বভৌমত্বের মতো প্রশ্নে দৃঢ় ও প্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক অবস্থানও থাকবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশকে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের বিকল্প পরিসরও বাড়াতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ৭ আগস্ট ২০২৬ সালে স্বাক্ষরিত এ চুক্তিতে তিন দেশ ঘোষণা করেছে যে, কোনো সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তাদের সবার বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। চুক্তির উদ্দেশ্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা এবং নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সম্ভাবনা তৈরি করা। তবে এই চুক্তিকে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর হুবহু অনুকরণ বলা যথার্থ হবে না।
ন্যাটোর দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সমন্বিত সামরিক কমান্ড, প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং সদস্যদের ব্যাপক সামরিক আন্তঃকার্যক্ষমতা রয়েছে। মক্কা চুক্তি নতুন; এর অধীনে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত কীভাবে হবে, অর্থায়ন ও কমান্ড কাঠামো কেমন হবে, অথবা কোন পর্যায়ের সংঘাতকে যৌথ প্রতিক্রিয়ার কারণ ধরা হবে- এসবের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এটিকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটের চেয়ে একটি বিকাশমান যৌথ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা-সহযোগিতা কাঠামো হিসেবে দেখা বেশি সংগত।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, এ কাঠামো প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে গঠিত নয়। সদস্যরা সম্ভাব্য সংকটে পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে সহযোগিতার ধরন নির্ধারণ করবে। অর্থাৎ এটি কেবল যুদ্ধের সময় পারস্পরিক সামরিক প্রতিক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি নয়; বরং রাজনৈতিক সমন্বয়, প্রতিরক্ষা শিল্প, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা-সংলাপের ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ বর্তমানে এই চুক্তির সদস্য নয় এবং বাংলাদেশকে সদস্য করার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব বা আমন্ত্রণ প্রকাশ্যে জানা যায়নি। তাই এ মুহূর্তে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি বাস্তব সিদ্ধান্তের চেয়ে কৌশলগত আলোচনার বিষয়। কিন্তু ভবিষ্যতে এমন কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ এলে বাংলাদেশের জন্য কিছু সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তুরস্কের সঙ্গে ড্রোন, নৌ-প্রযুক্তি, বিমান প্রতিরক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা-শিল্প সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও অবকাঠামো সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক করা যেতে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে সীমিত প্রতিরক্ষা সংলাপ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রশিক্ষণভিত্তিক যোগাযোগের পথও খোলা থাকতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাগুলোকে নিশ্চিত প্রাপ্তি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। অস্ত্র বা প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রতিরক্ষা অর্থায়ন, যৌথ উৎপাদন এবং গোয়েন্দা সহযোগিতার জন্য পৃথক চুক্তি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক রপ্তানি-নিয়ন্ত্রণ এবং সুস্পষ্ট নিরাপত্তা মূল্যায়ন দরকার হবে।
কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিরক্ষা চুক্তির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হলেই বাংলাদেশ উন্নত অস্ত্র, প্রযুক্তি বা অর্থায়ন পাবে- এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কোনো যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যুক্ত হলে দেশের দায়বদ্ধতা কী হবে। অন্য সদস্য রাষ্ট্র সংঘাতে জড়ালে বাংলাদেশ কি কেবল রাজনৈতিক সমর্থন দেবে, নাকি গোয়েন্দা তথ্য, অর্থনৈতিক সহায়তা কিংবা সামরিক অংশগ্রহণের চাপের মুখে পড়বে? এই প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর ছাড়া কোনো সদস্যপদ বা আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। ইরান-সৌদি সম্পর্ক, ইয়েমেন সংকট, হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। মক্কা চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে নয় বলে বলা হলেও, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি এই চুক্তিকে নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করবে।
বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের জোট-রাজনীতির মধ্যে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জড়িয়ে পড়া থেকে সতর্ক থাকতে হবে। দেশের কূটনীতির কেন্দ্রে থাকা উচিত বঙ্গোপসাগরীয় নিরাপত্তা, মিয়ানমার পরিস্থিতি, রোহিঙ্গা সংকট, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ, বাণিজ্য, জ্বালানি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। ভবিষ্যতে মক্কা চুক্তি বা অনুরূপ কোনো নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হলে অন্তত কয়েকটি শর্ত সামনে রাখা জরুরি। বাংলাদেশকে স্বয়ংক্রিয় সামরিক বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকতে হবে। অন্য কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক সংঘাতে বাংলাদেশের সামরিক জড়িয়ে পড়ার বাধ্যবাধকতা থাকা চলবে না।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, শিল্প-সহযোগিতা এবং অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাস্তব ও লিখিত নিশ্চয়তা থাকতে হবে। একই সঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের সিদ্ধান্তে সংসদীয় আলোচনা, বিশেষজ্ঞ মতামত, জাতীয় নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও জনস্বার্থের স্বচ্ছতা থাকা অপরিহার্য। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার ভিত্তি কোনো একক সামরিক জোট নয়।
শক্তিশালী জাতীয় প্রতিরক্ষা, দক্ষ কূটনীতি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব- এসবের সমন্বয়েই দেশের কৌশলগত নিরাপত্তা গড়ে উঠবে। ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং বাস্তবতার কারণে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা অপরিহার্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা, পানির ন্যায্য হিস্যা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় স্পষ্ট, দৃঢ় ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক অবস্থান প্রয়োজন।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের সামনে মূলত একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে : পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় ঢাকা কীভাবে তার কৌশলগত বিকল্প বাড়াবে? এর উত্তর কোনো রাষ্ট্রকে শত্রু বানানো নয়, আবার কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও নয়। বাংলাদেশের পথ হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক বহুমুখী কূটনীতি, আধুনিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং কৌশলগত ভারসাম্যের নীতি।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/ এমএস