যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রসারিত নিষেধাজ্ঞার জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তেহরান বলেছে, ‘ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। একই সঙ্গে ইরান আশা করছে, তাদের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদাররা যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।’
সোমবার (২৪ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, “ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখা দেশগুলোকে মার্কিন ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার ঝুঁকি নিতে হতে পারে।” তবে কোন কোন দেশকে লক্ষ্য করে এই পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিংবা কখন থেকে তা কার্যকর হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি। বরং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে নতুন নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সময় দেওয়া হবে বলে জানান বেসেন্ট।
এদিকে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। তবে ইরানের তেল বাণিজ্যে সহায়তা করার অভিযোগ থাকা চীনের কোনো বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নতুন তালিকায় রাখা হয়নি।
নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগে ইরান সতর্ক করে বলেছিল, নতুন মার্কিন অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে সামরিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি আরও কমিয়ে দিতে পারে তেহরান।
নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ বলেন, “মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জন্য আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত।” রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “শত্রুরা ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক হামলা চালাতে চায়। তবে তেহরানের নিজস্ব পাল্টা ব্যবস্থা রয়েছে এবং তারা পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল জানে।”
তিনি আরও বলেন, “চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ মেনে নেয়নি। অন্যান্য দেশও মার্কিন চাপ প্রতিহত করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।”
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেবি হুঁশিয়ার করে বলেছেন, “ইরানের অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ও জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে বড় ধরনের আঘাত হানা হবে।”
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নিরসনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা অব্যাহত রয়েছে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তেহরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় সংঘাতের আরও বিস্তার ঠেকানো এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ‘ইরানের প্রেসিডেন্ট তার সরকারের অবস্থান খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছেন এবং আলোচনায় সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে গঠনমূলক মতবিনিময় হয়েছে।’
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের ওপর আরও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশলের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে কয়েক দশক ধরে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরান এর আগেও কঠিন অর্থনৈতিক চাপ সামলে নিজেদের নীতি অব্যাহত রেখেছে।
গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বড় ধরনের হামলা না হলেও সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরে ইরানের জাহাজবিরোধী হামলা বন্ধে নতুন উপায় খুঁজছে। একই সঙ্গে মিত্রদের মাধ্যমে লোহিত সাগরেও ইরানের হামলা বন্ধের চেষ্টা চালাচ্ছে।
প্রায় ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক। হামলায় ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত এবং দেশটির অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হলেও ইরানের হাতে এখনও উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজকে হুমকির মুখে ফেলার মতো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই কর্মসূচি ধ্বংসের লক্ষ্য নিয়ে এগোলেও এর প্রকৃত সক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরও বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ ডলারের বেশি কমেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ