মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
১০ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলে দ্রুত নীতিমালা করবে সরকার’      আট মাসে ৯৫ কারখানা বন্ধ, বেকার ৬২ হাজার শ্রমিক      রাজনৈতিক বিরোধীদের বিচারের পূর্বে অনির্দিষ্টকাল আটকের অবসান চায় এইচআরডব্লিউ      সংসদে মন্ত্রীদের দায়িত্ব বণ্টন, প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে দায়িত্বে ৩ মন্ত্রী      মন্ত্রিসভায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনের খসড়া অনুমোদন      শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় মঙ্গলবার      ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৯৯৪, মৃত্যু তিনজনের      
দেশজুড়ে
ফটিকছড়িতে ছাগল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, নথিতে জাল স্বাক্ষর
ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ৩:১৭ পিএম আপডেট: ২৫.০৮.২০২৬ ৩:২২ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নেওয়া সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পে ছাগল ও বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নথিতে ২০০ উপকারভোগীর মধ্যে ৪০০টি ছাগলসহ বিভিন্ন উপকরণ বিতরণের তথ্য থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর সঙ্গে অসংগতি পাওয়া গেছে। এমনকি কয়েকজন উপকারভোগীর নামে থাকা মাস্টাররোলে স্বাক্ষর থাকলেও তারা ওই স্বাক্ষর করেননি বলে জানিয়েছেন।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের মাস্টাররোল অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পর্যায়ে ১০০ জন উপকারভোগীর প্রত্যেককে দুটি করে ছাগল, ২৫ কেজি খাদ্য, পাঁচটি ফ্লোর ম্যাট ও ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ১০০ জনকে দুটি ছাগল, ৫০ কেজি খাদ্য, পাঁচটি ফ্লোর ম্যাট, দুটি সিআই শিট ও চারটি কংক্রিট পিলার দেওয়ার তথ্য রয়েছে।

প্রথম পর্যায়ের বিতরণের নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। মাস্টাররোলে উপকারভোগীদের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও স্বাক্ষর সংযুক্ত রয়েছে।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে গত ২২ থেকে ২৪ আগস্ট দাঁতমারা ইউনিয়নের সোনারখীল ও পেলারখীল, নারায়ণহাটের নেপচুন এবং বাগানবাজারের রামগড় চা-বাগান এলাকায় সরেজমিনে কয়েকজন উপকারভোগীর সঙ্গে কথা বলা হয়।

এ সময় মায়ালক্ষ্মী ত্রিপুরা, ললিন্দ্র ত্রিপুরা, কাঞ্চন কুমার ত্রিপুরা, মজিব ত্রিপুরা, সশিন্দ্র ত্রিপুরা, মাধুরী ত্রিপুরা, কাঞ্চন মালা ত্রিপুরা, নিরেন্দ্র ত্রিপুরা, সোনালক্ষ্মী ত্রিপুরা, সংগ্রাম ত্রিপুরা, শিবু কুমার ত্রিপুরা, মনিবালা ত্রিপুরা ও চাকষী ত্রিপুরা দাবি করেন, মাস্টাররোলে থাকা স্বাক্ষর তাদের নয়। তবে নথিতে থাকা নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর সঠিক বলে তারা নিশ্চিত করেন।

স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই ছাগল বিতরণের অভিযোগ

প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, উপকারভোগীদের মধ্যে ছাগল দেওয়ার আগে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আসা ছাগলগুলো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পিপিআর টিকা দেওয়ার কথা। এরপর সুস্থ ও সংক্রমণমুক্ত ছাগল বিতরণের বিধান রয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, এসব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই ছাগল বিতরণ করা হয়েছে। বিতরণের আগে প্রকল্পের বিতরণ কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এমনকি প্রকল্প পরিচালকের স্বাক্ষর করা কার্যাদেশের কপি হাতে পাওয়ার আগেই ছাগল বিতরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে তড়িঘড়ি করে ছাগল বিতরণ করা হয়ে থাকতে পারে।

ছাগল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, সরবরাহসংক্রান্ত নথি, স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ এবং টিকাদানের পৃথক রেকর্ডও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

নগদ সহায়তা নিয়েও প্রশ্ন

প্রথম পর্যায়ের ১০০ উপকারভোগীর প্রত্যেককে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল। তবে মাঠপর্যায়ে এ অর্থ বিতরণের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ সংক্রান্ত পৃথক রসিদ, ভাউচার কিংবা ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেনের নথিও পাওয়া যায়নি।

প্রকল্পের মাঠ সহকারী (ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর) থোয়াইংনিং মারমা বলেন, “২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তার বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। ফলে অর্থ বিতরণ করা হয়নি।”

তবে তার বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল মমিন। তিনি বলেন, “প্রকল্পের সব উপকরণ ও অর্থ উপকারভোগীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে, প্রকল্পটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে।”

দুই কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে নগদ সহায়তার অর্থ ছাড় ও বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

উপকরণ বিতরণেও অসংগতি

প্রথম পর্যায়ে প্রত্যেক উপকারভোগীকে পাঁচটি করে ফ্লোর ম্যাট দেওয়ার কথা থাকলেও সরেজমিনে কথা বলা অধিকাংশ উপকারভোগী তা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে ২৫ কেজি করে দানাদার খাদ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা।

দ্বিতীয় পর্যায়েও খাদ্য বিতরণের পরিমাণ নিয়ে অসংগতি পাওয়া গেছে। সরকারি নথিতে ৫০ কেজি করে খাদ্য দেওয়ার কথা থাকলেও একাধিক উপকারভোগী জানিয়েছেন, তারা এর অর্ধেক পরিমাণ খাদ্য পেয়েছেন।

এ পর্যায়ে প্রত্যেক উপকারভোগীকে দুটি সিআই শিট ও চারটি কংক্রিট পিলার দেওয়ার কথা ছিল। সে হিসাবে ১০০ জনের মধ্যে ২০০টি সিআই শিট ও ৪০০টি কংক্রিট পিলার বিতরণের তথ্য রয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে যাচাই করা উপকারভোগীদের বাড়িতে এসব উপকরণ দিয়ে ঘর নির্মাণের চিত্র পাওয়া যায়নি। ফলে নথিতে উল্লেখ করা এসব উপকরণ বাস্তবে বিতরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

৩০ ছাগলের ২৭টিই মারা গেছে

প্রকল্পের আওতায় দেওয়া ছাগলের মৃত্যুর ঘটনাও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে যাচাই করা ১৫ জন উপকারভোগীর মধ্যে ১২ জনের দুটি করে এবং তিনজনের একটি করে ছাগল মারা গেছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই ১৫ জনকে দেওয়া মোট ৩০টি ছাগলের মধ্যে ২৭টিই মারা গেছে।

দাঁতমারা ইউনিয়নের পেলারখীল ত্রিপুরাপাড়ার কয়েকজন উপকারভোগী জানান, ছাগলগুলো পাওয়ার সময়ই দুর্বল ছিল। কারও কারও ছাগল বিতরণের এক সপ্তাহের মধ্যেই মারা যায়।

নারায়ণহাট ইউনিয়নের নেপচুন চা-বাগানের শ্রমিক সংগ্রাম ত্রিপুরা এবং রামগড় চা-বাগানের শিবু কুমার ত্রিপুরা ও মনিবালা ত্রিপুরাও একই অভিযোগ করেন। তাদের দাবি, ছাগলগুলো পাওয়ার সময় দুর্বল ছিল এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই মারা যায়। বিষয়টি তদারকি কর্মকর্তাকে জানানোর পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তবে মৃত ছাগলের ছবি, ভিডিও বা চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি না থাকায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কয়েকজন উপকারভোগী ছাগলের ওজন কম ছিল বলেও অভিযোগ করেছেন। বিতরণের সময় ছাগলের ওজন যাচাইয়ের পৃথক রেকর্ড, স্বাস্থ্য সনদ বা টিকাদানের নথিও সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে পাওয়া যায়নি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল মমিন বলেন, বিতরণের সময় ছাগলগুলো সুস্থ-সবল ছিল। পরে উপকারভোগীদের পরিচর্যার ঘাটতি ও পরিবেশগত সমস্যার কারণে ছাগল মারা যেতে পারে। বিভিন্ন এলাকায় ছাগল মারা যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রকল্পটিকে ‘লস প্রজেক্ট’ বলেও মন্তব্য করেন।

ইউএনওকে জানানো হয়নি

অফিস আদেশে ছাগল বিতরণের আগে প্রকল্পের বিতরণ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জরুরি ভিত্তিতে অবহিত করার কথা বলা থাকলেও ইউএনওকে বিষয়টি জানানো হয়নি বলে জানা গেছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, “ছাগল বিতরণের বিষয়টি আমাকে অবহিত করা হয়নি। বিষয়টি দুঃখজনক। সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করব।”

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, “ছাগল বিতরণ করা হয়েছে, এটি ঠিক।” তবে রোগাক্রান্ত ছাগল বিতরণের অভিযোগের বিষয়ে তিনি প্রকল্প পরিচালকের দায় রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে এর জন্য প্রকল্পের মাঠ সহকারীকে দায়ী করেন তিনি।

সরকারি অর্থায়নে অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া প্রকল্পে নথি ও মাঠপর্যায়ের তথ্যের এমন পার্থক্য এবং উপকারভোগীদের অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে।


কেকে/সাশ 


আরও সংবাদ   বিষয়:  ফটিকছড়ি   ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী   অনিয়মের অভিযোগ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close