যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পর স্থবির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুনরুজ্জীবিত করতে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) তেহরান সফর করেছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই মুহূর্তে ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসতে চায় না।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই না। তাদের সঙ্গে বৈঠক করারও কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই।” এর আগে হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, ইরান অর্থবহ আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান স্থগিত থাকলেও বৃহত্তর শান্তি চুক্তির দিকে তেমন অগ্রগতি হয়নি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়েও অচলাবস্থা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার ছয় মাস পর দেশটির সরকার অর্থনৈতিকভাবে চাপে থাকলেও এখনো ক্ষমতায় রয়েছে। তেহরানও আলোচনায় বসার বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
নভেম্বরে কংগ্রেস নির্বাচনের আগে দেশে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন ট্রাম্প। এ পরিস্থিতিতে তিনি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জোরদারে মনোযোগ দিয়েছেন। তবে নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর করতে গেলে চীন ও ভারতের মতো ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।
এদিকে তেহরানে ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফের সঙ্গে বৈঠকে কূটনীতিতে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতি তেহরান আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক বা অর্থনৈতিক হামলা চালাতে না দেয়।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই কাতারের প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, “ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ‘উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড’ চালালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে হামলা চালাবে তেহরান।”
রেজাই বলেন, “হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের শর্ত পূরণ করতে হবে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।”
তিনি বলেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করি না। তারা বারবার কূটনীতি ও আলোচনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।”
গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক হলেও হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিরোধের কারণে তা ভেঙে যায়। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ এই সরু নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে অনুমোদিত জাহাজগুলোর কাছ থেকে ফি আদায়ের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন বলছে, এটি অবশ্যই উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে বজায় রাখতে হবে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরার কথা জানান। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে প্রণালিতে সাময়িক ইরান-ওমান যৌথ নৌ করিডর প্রতিষ্ঠা এবং মাইন অপসারণে যৌথ প্রকল্প নিয়েও আলোচনা করেছেন।
তবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমঝোতার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ইরান হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য মধ্যস্থতাকারীদের কাছে নিজেদের শর্তের তালিকা প্রস্তুত করছে বলে জানিয়েছেন রেজাই। শর্ত পূরণ হলে নির্ধারিত একটি কেন্দ্রীয় নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হতে পারে বলেও জানান তিনি।
এখন কোনো আলোচনা হচ্ছে না
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বৃহস্পতিবার বলেন, ইরানের বিষয়ে ট্রাম্প “সব ধরনের বিকল্পই বিবেচনায় রেখেছেন।”
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে আমরা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চালিয়েছি। এখন তাদের অর্থনীতি ধ্বংস করতে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ চলছে।”
লেভিট আরও বলেন, “এই মুহূর্তে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট মনে করবেন, ইরান অর্থবহভাবে আলোচনার টেবিলে আসতে প্রস্তুত—ততক্ষণ পর্যন্ত এই অবস্থাই চলবে। আমরা এখনো তেমন কোনো লক্ষণ দেখিনি।”
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে ইরান। সামরিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পরও দেশটির কাছে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার মতো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালিতে ৭০টি ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ১৯ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ঠেকানো, দেশটির সরকার পতনে সহায়তা এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংসের লক্ষ্য নিয়ে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। হামলার পর থেকে প্রধানত ইরান ও লেবাননে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ