আজ ৩০ আগস্ট পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। গুম শুধু একজন ব্যক্তিকে নিখোঁজ করে না, তার পরিবারকেও দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার মধ্যে ফেলে দেয়। মৃত্যুর ক্ষেত্রে স্বজনরা অন্তত শেষকৃত্য ও শোক পালনের সুযোগ পান। কিন্তু গুমের ঘটনায় প্রিয়জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সেই উত্তরও অনেক সময় মেলে না।
এবার ‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’ প্রতিপাদ্যে দিবসটি পালিত হচ্ছে। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। গুম প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের স্মরণ, তাঁদের পরিবারের প্রতি সংহতি এবং এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করাই দিবসটির অন্যতম লক্ষ্য।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে সাত শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। তাদের কেউ ফিরে এলেও বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ অনেকে এখনো নিখোঁজ। গুমের অভিযোগের বড় অংশেই স্বজনরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর গুমের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টিকে জোরপূর্বক গুম হিসেবে শনাক্ত করার কথা বলা হয়। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত বলে ধারণা করা হয়েছে। কমিশনের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ৬ হাজারের মধ্যে হতে পারে। কারণ, অনেক ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবার কমিশনের কাছে অভিযোগ করেননি।
গুমের ঘটনায় গোপন আটককেন্দ্র বা কথিত ‘আয়নাঘর’ ব্যবহারের অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে। ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় এসব স্থানে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা, নির্যাতন এবং চরম মানসিক যন্ত্রণার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা কয়েকজন ব্যক্তি এসব কথিত গোপন বন্দিশালা থেকে মুক্তি পান।
এদিকে গুম প্রতিরোধে বর্তমান সরকার আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গুম মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং সরকার প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ বন্ধে পৃথক আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। গুমের ঘটনায় সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আর গুমের কারণে মৃত্যু, মরদেহ উদ্ধার কিংবা পাঁচ বছরেও সন্ধান না মিললে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন কর্মসূচি পালন করছে। তাদের দাবি—নিখোঁজদের সন্ধান, প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
কেকে/ এমএস