একসময় কিছু শব্দ ছিল, যা টাইপ করা যেত না, শুধু ফুটিয়ে তোলা যেত কালি আর কাগজের ছোঁয়ায়। প্রতিটি খামের ভাঁজে জমে থাকত কত শত বিনিদ্র রাত, অধীর অপেক্ষা আর না-বলা দীর্ঘশ্বাস। আজ বিশ্ব চিঠি দিবস কেবল অতীতকে আঁকড়ে ধরার দিন নয়; বরং যান্ত্রিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া বাবা, মা ও প্রিয়জনদের মনের কথা জানানোর এক অনন্য সুযোগ। চিঠি দিবসে শিক্ষার্থীদের ভাবনা তুলে ধরেছেন মো. রাজিউল ইসলাম শান্ত।
হারুন অর রশিদ
ফলিত গণিত বিভাগ
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিয় আম্মু,
আজ হঠাৎ করেই একটা চিঠি লিখতে ইচ্ছে করল। তোমাকে তো প্রতিদিন কত কথাই বলা হয়। পড়াশোনা আর নানা অজুহাতে অনেক কথাই জমে থাকে মনের এক কোণে। ব্যস্ততার ভিড়ে হয়তো সামনাসামনি সেই গভীর অনুভূতির কথাগুলো আর বলা হয়ে ওঠে না।
মনে পড়ে ছোটবেলার কথা? যখন হাত ধরে প্রথম বর্ণমালা চিনিয়েছিলে, পড়ার টেবিলে পাশে বসে পাহারা দিতে, যাতে একটুও মন না বসে থাকে। আজ বড় হয়েছি ঠিকই, কিন্তু তোমার কাছে সেই ছোট্ট শিশুই রয়ে গেছি। আমার হাজারটা ভুলের পরও তোমার ওই মায়াবী চাহনি আর আশীর্বাদের চাদরটাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। জীবনে যত বড় বাধাই আসুক না কেন, জানি, তোমার দোয়া মাথার ওপর থাকলে হেরে যাওয়ার ভয় থাকে না।
নিজের শরীরের প্রতি একটু যত্ন নিও। তোমার মতো এতটা নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মানুষ এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই।
ইতি,
তোমার ছোট ছেলে
নূপুর আক্তার
আইন বিভাগ
গণ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিয় বোন,
শুরুতেই আমার স্নেহভরা ভালোবাসা নিস। তুই আমার ছোট বোন, কিন্তু আমার কাছে তুই শুধু বোন না, তুই আমার খুব আপন একজন মানুষ। তোর সঙ্গে কাটানো হাসি-ঠাট্টা, দুষ্টুমি আর ছোট ছোট ঝগড়াগুলো সবসময় মনে থাকবে। মাঝে মাঝে তোকে বকা দিই, রাগও করি, কিন্তু বিশ্বাস কর, সবকিছুর আড়ালেই তোর জন্য অনেক ভালোবাসা আছে। তুই সবসময় ভালো থাকিস, হাসিখুশি থাকিস—এটাই আমার চাওয়া। মনে রাখিস, তোর বোন সবসময় তোর পাশে আছে।
ইতি,
তোর প্রিয় বোন
নুপুর
মাহদি মোহাম্মদ শুভ
মার্কেটিং বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিয় আম্মু,
কেমন আছো তুমি? এই প্রশ্নটা হয়তো দূরে থেকে প্রতিদিনই করি, কিন্তু এর ভেতরে তোমার প্রতি কতটা মায়া লুকিয়ে থাকে, সেটা হয়তো কখনোই আমার বলা হয়ে ওঠে না।
জীবনে যত বড় হচ্ছি, ততই বুঝতে পারছি যে আমার জন্য তোমার করা কাজগুলো আসলে আমার জীবনে কত বড় ছিল। আমার ভালো থাকা, সময়মতো খাওয়া, পড়াশোনা, কোথায় যাচ্ছি কিংবা কেমন আছি—সবকিছুর ভেতরেই তোমার চিন্তা মিশে থাকে। তখন হয়তো বিরক্ত হতাম, কিন্তু পরে বুঝতে শিখেছি, পৃথিবীতে এমন করে ভাবার মানুষ আর বেশি কেউ নেই।
তোমাকে হয়তো সবসময় বলা হয় না, কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিই তুমি, যার গর্ভে আমার হৃদয়টি আকার পেয়েছে। যত দূরেই যাই, যত ব্যস্তই থাকি, দিন শেষে মনে হয় ঠিক আমার সঙ্গেই আম্মু আছে। সবকিছু যখন এলোমেলো লাগে, তোমার কথা ভেবে মনে হয় সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে।
আমার জন্য দোয়া করো। আমি হয়তো সবসময় তোমার প্রত্যাশামতো হতে পারিনি, কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি চাই এই পৃথিবীর গর্বিত পাহাড়চূড়ায় আমার মা থাকুক। ভালো থেকো আম্মু।
ইতি,
তোমার প্রিয় মাহদি
আবিবা রহমান সুপ্তি
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি
প্রিয় আব্বু-আম্মু,
তোমরা কেমন আছো? কখনো হয়তো জানতে চাওয়া হয়নি—তোমরা কেমন আছো। অথচ তোমরা সারাদিন শুধু ভাবো, আমি কেমন আছি, কীভাবে তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমাকে সবটুকু দিয়ে ভালো রাখা যায়। তোমরা কখনো নিজের দিকে তাকানোর সময়টুকুও পাও না।
আমাকে নিয়ে তোমাদের অনেক স্বপ্ন। সত্যি বলতে, আমি এখনো তোমাদের জন্য তেমন বড় কিছু করতে পারিনি। কিন্তু তোমরা আমার জন্য এত কষ্ট করেছো, আর কত অপেক্ষা করে আছো। আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য অনেক কিছু করবো, ইনশাআল্লাহ। শুধু আমার জন্য দোয়া করো। আর একটু অপেক্ষা করো আমার জন্য, আমার প্রিয় আব্বু-আম্মু। একদিন তোমাদের সব স্বপ্ন পূরণ করার চেষ্টা করবো। হয়তো সেই দিন আর খুব বেশি দূরে নেই। আমি তোমাদের অনেক ভালোবাসি।
ইতি,
তোমাদের আদরের সুপ্তি।
ইয়ামিন
ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিয় নিশাত তাসনিম,
আশা করছি সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় ভালো আছো।
তুমি অবশ্যই জেনে থাকবে, কিছু অনুভূতি মুখে বলা যায় না। ডিজিটালাইজেশনের এই যুগে তোমার উদ্দেশ্যে কখনো সাদা কাগজে কলমে মনের কথাগুলো লিখে রাখা হয়নি।
জীবনের পরতে পরতে কত মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়, কথা হয়, সম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু সবাই আমাদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারে না। কিন্তু তুমি অল্প কয়েকজন মানুষের মধ্যে একজন, যাকে ভাবলে মনে হয়, কিছু মানুষের উপস্থিতি আমাদের জীবনে প্রতিনিয়ত আনন্দের সঞ্চার করে।
তোমার সঙ্গে আমার পরিচয়টা শুধু একটি পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সম্মান, বিশ্বাস, পাশে থাকার মানসিকতা। তোমার কাছে আমার কখনো কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। শুধু এইটুকু চাওয়া—তোমার শিশুসুলভ আচরণ, অন্যকে সাহায্য করার মানসিকতা, কঠিন পরিস্থিতিতে শক্ত থাকা—এইগুলো কখনো যেন পরিবর্তন না হয়।
সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা, তোমার মনের প্রতিটি স্বপ্ন ফুল হয়ে ফুটুক। প্রতিটি সকাল নিয়ে আসুক ইতিবাচক কিছু। আর কোনো এক বিকেলে যদি পুরোনো কোনো চিঠির পাতা খুলে আমার এই কথাগুলো পড়ো, মনে রেখো—এই কয়েকটি শব্দের আড়ালে ছিল একান্ত আন্তরিক কিছু অনুভূতি।
ইতি,
তোমার মঙ্গলকামী একজন।
মাহিনুর
মেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
গণ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিয় আম্মু,
তোমাকে কখনো লেখা হয় না। অথচ আমার জীবনে তুমি কী ভীষণভাবেই না জড়িয়ে আছো। মনে হচ্ছে কয়েক যুগ তোমাকে দেখি না!
বিশ্ববিদ্যালয়ের একা এই জীবন দিন দিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। কত দিন তোমার হাতের যত্নে বেড়ে দেওয়া পাঁচ পদের তরকারির সঙ্গে গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত খাই না। জানো আম্মু, আমি গত দুই মাস ধরে শুধু ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খেয়েছি। তোমার কাছে দুপুর ১২টায় ঘুম থেকে উঠেই বিছানার পাশে রেডি করা নাশতা আর গরম চা পাচ্ছি না। আমার সব ছেড়ে-ছুড়ে তোমার কাছে চলে আসতে ইচ্ছে হয়।
আগে তোমার এই যত্নগুলোকে খুব স্বাভাবিক মনে হতো। কিন্তু আজ তোমার থেকে এত দূরে এসে বুঝতে পারছি, তুমি ছাড়া জীবন কত রুক্ষ! চারদিকে তাকালে শুধু দেখি, সবাই কিছু না কিছু একটা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। সবাই এত ব্যস্ত, এত দৌড়ঝাঁপ, এত ‘লাইফ গোলস’, এত ‘প্রোডাক্টিভিটি’র ভিড়ে আমার মাঝেমধ্যে হাঁপ ধরে যায়। মনে হয়, আমি বসে পড়ি কোনো এক পাইনগাছের নিচে। ইচ্ছে হয় জীবনানন্দের মতো বলি, ‘পৃথিবীর বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা অন্য সবাই বহন করে করুক, আমি প্রয়োজন বোধ করি না।’
কবে তোমায় দেখবো?
ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল।
ইতি তোমার
মাহিনূর।
কেকে/ এমএস