দীর্ঘ ১৭ বছর মামলা-হামলা, কারাবরণ ও নির্যাতনের মধ্যেও রাজপথে সক্রিয় থেকে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন যারা, দল ক্ষমতায় আসার পর তাদের অনেকেই এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রত্যাশা অনুযায়ী তাদের মূল্যায়ন হয়নি। উল্টো দলে নতুন করে যুক্ত হওয়া ‘হাইব্রিড’ ও সুবিধাবাদী হিসেবে পরিচিত নেতাকর্মীদের আনাগোনা বেড়েছে।
তৃণমূলের নেতাদের অভিযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে অনেকে নিজেদের স্বার্থে এসব অনুপ্রবেশকারীকে পুনর্বাসন করছেন। তাদের প্রভাবেই দুঃসময়ের ত্যাগীরা কমিটি, পদ-পদবি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কাক্সিক্ষত জায়গা পাচ্ছেন না। গত দেড় বছরে দেশের একাধিক জেলা ও মহানগরে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ্যে এসেছে। এমনকি দলের শীর্ষ নেতৃত্বও বিভিন্ন সময় হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে সতর্ক করেছে।
বিএনপি সরকার গঠনের পর দলের দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ও পরীক্ষিত নেতা এখনো মন্ত্রিসভা কিংবা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে জায়গা পাননি। নির্বাচনের আগে যাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা ছিল, তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাননি। এ নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে নানা আলোচনা চলছে।
আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন— বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, দলের ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে শামসুজ্জামান দুদু, বরকত উল্লাহ বুলু, জয়নুল আবেদীন ও আসাদুজ্জামান রিপন মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। একইভাবে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের আমানউল্লাহ আমান, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মজিবুর রহমান সরোয়ার, মাহবুবউদ্দিন খোকন এবং ফজলুর রহমানও মন্ত্রিসভার বাইরে রয়েছেন।
এ তালিকায় রয়েছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলও। নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় দুজনকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হতে পারে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ছিল। শেষ পর্যন্ত প্রথম দফার মন্ত্রিসভায় তাদের জায়গা হয়নি। তবে রুহুল কবীর রিজভীকে পরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে হাবিব উন নবী খান সোহেল, শামসুজ্জামান দুদু, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ‘মূল্যায়নবঞ্চিত’ নেতা হিসেবে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের ভূমিকা এবং বিভিন্ন সময় হামলা-মামলা ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলার বিষয়টি সামনে এনে দলের নেতাকর্মীদের একটি অংশ তাদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়ে আসছেন। সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন নিয়েও তাদের কয়েকজনের নাম আলোচনায় ছিল।
এ ছাড়া জয়নুল আবদিন ফারুক ও কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণসহ দলের আরও কয়েকজন পরীক্ষিত নেতাও এখন পর্যন্ত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেননি।
বিএনপির মন্ত্রিসভা গঠনে জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত তরুণ ও নতুন মুখকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও রাজনৈতিক মহলে আলোচনায় রয়েছে। ফলে মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়া অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাকে ভবিষ্যতে দলীয় পুনর্গঠন, সাংগঠনিক দায়িত্ব কিংবা সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে মূল্যায়ন করা হতে পারে বলে আলোচনা চলছে।
সম্প্রতি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে পৌর ও উপজেলা বিএনপি আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের কোনোভাবেই বঞ্চিত করা হবে না। তিনি জানান, বিভিন্ন স্তরের মানুষের মতামত নিয়ে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমেই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে; কোনো একক ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না।
স্থানীয় পর্যায়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর তৃণমূলের ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলা-হামলা ও নির্যাতনের মধ্যেও যারা দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন, তাদের কয়েকজন নতুন কমিটি থেকে বাদ পড়েন। বিপরীতে আন্দোলনের মাঠে তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় ছিলেন এমন কয়েকজন নতুন মুখ কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
বাদ পড়া নেতাদের মধ্যে ছিলেন সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল মান্নান, শামসুল আলম, হাজী মোহাম্মদ আলী, চান্দগাঁও ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মাহবুব আলম, মোহরা ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নাজিম উদ্দিন আহমেদ ও শোলকবহর ওয়ার্ডের আশরাফ চৌধুরী।
অন্যদিকে নতুন কমিটিতে জায়গা পাওয়া কয়েকজনের মধ্যে ছিলেন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী এম এ হান্নান, সৈয়দ সিহাব উদ্দিন আলম ও মোহাম্মদ ইউছুফ। তৃণমূলের নেতারা তাদের ‘টাকাওয়ালা হাইব্রিড’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তৃণমূলেও একই অভিযোগ
শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তৃণমূল নেতাদের মধ্যেও একই ধরনের ক্ষোভ রয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির বিএনপির বর্ধিত সভা ঘিরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা ত্যাগীরা নব্য হাইব্রিড ও সুবিধাবাদীদের ভিড়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন।
চাঁদপুরের হাবিবুল্লাহ হাবিব, নীলফামারীর আল মাসুদ চৌধুরী, রংপুরের ওহেদুজ্জামান মাহবুব ও নরসিংদীর সাইফুল ইসলাম পলাশসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা তৃণমূলের এই অসন্তোষের কথা তুলে ধরেন। তাদের অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল দীর্ঘদিন দলের সঙ্গে থাকা নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুনদের দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠা।
তৃণমূলের নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, ৫ আগস্টের পর যারা দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তাদের একটি অংশ এখন বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাংগঠনিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ক্ষমতায় আসার পর ‘হাইব্রিড’ আতঙ্ক
বিএনপি সরকার গঠনের পর বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। ক্ষমতার ছয় মাসের মধ্যেই বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে নবাগত ও ‘হাইব্রিড’ নেতাকর্মীদের আনাগোনা নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ বাড়ছে। দলীয় সূত্র বলছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে বিভিন্ন দলের অন্তত অর্ধলক্ষাধিক নেতাকর্মী বিএনপিতে ভিড়েছেন বলে আলোচনা রয়েছে।
দলে যোগদান নিয়ে বিএনপির পুরোনো নেতারা বলছেন, যারা দীর্ঘদিন দলের সঙ্গে ছিলেন না, তারা কীভাবে দ্রুত সাংগঠনিক প্রভাব তৈরি করছেন। তাদের আশঙ্কা, অনুপ্রবেশকারীরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলে দীর্ঘদিনের ত্যাগীরা আরও পিছিয়ে পড়বেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ দুটি। একদিকে দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক অবদান ও প্রত্যাশার যথাযথ মূল্যায়ন করা, অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংগঠনকে বিস্তৃত করা। এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বাড়তে পারে।
তাদের মতে, কোনো নেতাকে শুধু নতুন হওয়ায় ‘হাইব্রিড’ এবং কোনো পুরোনো নেতাকে শুধু দীর্ঘদিনের কর্মী হওয়ার কারণে ‘ত্যাগী’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা ও দলীয় শৃঙ্খলা মেনে চলার রেকর্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে যারা দলকে ধরে রেখেছেন, তাদের মধ্যে যদি অবমূল্যায়নের অনুভূতি বাড়তে থাকে, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ফেনী প্রতিনিধি মো. আব্দুর রহিম জানান, আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে থাকা বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীরা খোলা কাগজকে জানান, সরকার গঠনের পর সোনাগাজীতে বিএনপির বিভিন্ন স্তরে বর্তমানে ‘হাইব্রিডরা’ এগিয়ে থাকায় পরীক্ষিত ও ত্যাগীরা পিছিয়ে পড়েছেন। যার কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ও অস্বস্তি জোরালো হচ্ছে।
গত ১৭ বছর বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা অনেক নেতাকর্মীর অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সোনাগাজীতে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে এমন কিছু ব্যক্তি প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন, যারা দুর্দিনে মাঠে না থেকে গোপনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে কোটি কোটি টাকার পাহাড় বানিয়েছেন, তারাই আজ বিএনপির কর্ণধার হয়ে উঠেছেন। এরা বিএনপির এ সুসময়ে এসে সক্রিয় হয়ে সাংগঠনিক পদ, টেন্ডারবাজি সর্বক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রবিন্দুতে জায়গা করে নিয়েছেন। ফলে ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের বড় একটি অংশকে কোণঠাসা করে রেখেছেন এই সুবিধাবাদীরা।
দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বলেন, দীর্ঘসময় ধরে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে থাকা কর্মীদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়িত করা হচ্ছে না। বরং একেরপর এক ষড়যন্ত্র করে ত্যাগীদের বহিষ্কার করা হচ্ছে।
দীর্ঘ তিন দশক ধরে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে বহিষ্কার হয়েছেন সোনাগাজী উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব ইমাম হোসেন প্রবীর। তিনি সোনাগাজী উপজেলা জিয়া পরিষদের সভাপতি এবং সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আওয়ামী শাসনামলে বহু হামলা, মামলার স্বীকার হয়েছেন, রাজনীতি করতে গিয়ে হারিয়েছেন আপন ভাইকে। আওয়ামী লীগের শাসনামল থেকে শুরু করে ওয়ান ইলেভেনের সময় পযন্ত তাকে ৫২টি মিথ্যা মামলার আসামি করে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘসময় কারাবন্দি হয়ে থাকতে হয়েছে এমনটাই দাবি করেছেন তিনি।
সোনাগাজী পৌরসভার সাবেক মেয়র প্রবীণ নেতা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জামাল উদ্দিন সেন্টু জানান, দলের কঠিন সময়ে যারা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, আজ তাদেরই নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। এ অবমূল্যায়ন মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে, যা আগামী দিনের যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যারা অনেক মামলা-হামলার শিকার হয়েছে দলের দুঃসময়ে যারা পাশে ছিলো না, সেসব সুবিধাবাদী এখন বিএনপিতে ভালো জায়গায় আছে।
ফেনী সদর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক নিজাম উদ্দিন মাস্টার বলেন, যারা গত ১৭ বছর আন্দোলনে ছিল না, তারা এখন আমাদের ঘরে ঢুকে ঐক্য বিনষ্ট করতে চাইছে। তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বিএনপি আরও শক্তিশালী হবে। আন্দোলনে যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, তারাই এখন প্রভাবশালী,আর যারা জীবন বাজি রেখে রাজপথে ছিলেন, তারা অবহেলিত এবং বহিষ্কৃত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, আমরা দলীয় সোর্সের মাধ্যমে তথ্য পেয়ে তাকে বহিষ্কার করেছি, আমাদের সোর্সের দেওয়া ভুল তথ্যে কেউ বহিষ্কার হলে কেন্দ্র বিষয়টি পুনরায় বিবেচনায় নেবে।
কেকে/ এমএস