জামায়াতকে উদ্দেশ্য করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, “তারাই আওয়ামী লীগের পক্ষে থাকে।” তিনি বলেন, ‘বিএনপির ইতিহাস ন্যায়ের পক্ষে, অঙ্গীকার রক্ষার পক্ষে এবং সব ধরনের মুনাফেকির বিরুদ্ধে।’
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বাতিসা ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে দুর্বৃত্তদের অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য নবনির্মিত ঘরের চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াতের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, “কয়েক দিন আগে তারা বলেছেন, গুলশানে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের দোসরদের মিছিল বিএনপির আশকারায় হয়েছে। বিএনপির ইতিহাস হচ্ছে ন্যায়ের পক্ষে, অঙ্গীকার রক্ষার পক্ষে, সকল মুনাফেকির বিরুদ্ধে।”
তিনি বলেন, “বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এরশাদ একটি অবৈধ সরকার, তার অধীনে নির্বাচন হবে না। তিনি সেই অবস্থানে অটল থেকেছেন এবং এরশাদের পতন হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও জামায়াত একসঙ্গে এরশাদের অধীনে নির্বাচন করেছে। তাহলে আওয়ামী লীগের পক্ষে কারা থাকে? তারাই থাকে।”
রিজভী আরও বলেন, “৫ আগস্টের পর, জুলাইয়ের যে রক্তগঙ্গা বয়ে গিয়েছিল সেই বাংলাদেশে যারা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে গুলি করে মেরেছিল, যারা পুলিশকে লেলিয়ে দিয়েছিল, র্যাবকে লেলিয়ে দিয়েছিল, হেলিকপ্টার থেকে ছাত্রদের মিছিলে গুলি করেছিল—সেই বর্বরদের বিরুদ্ধে গোটা জাতি যখন বিক্ষুব্ধ, ৫ আগস্টের পর সেই রাজনৈতিক দলটি বলল, আমরা আওয়ামী লীগের সব মাফ করে দেব।”
তার দাবি, “তাহলে তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস হচ্ছে বর্বরদের সঙ্গে, নিষ্ঠুরদের সঙ্গে, গণতন্ত্র বিনাশকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা।”
দেশে গণতন্ত্রের পরিবেশ ফিরে এসেছে দাবি করে রিজভী বলেন, এখন বিএনপির বিরুদ্ধে কিংবা বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করলেও কেউ গ্রেপ্তার হয় না, কেউ গুম হয় না, কারও লাশ খালের পাড়ে বা নদীর পাড়ে পড়ে থাকে না।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৭ বছর নেতাকর্মীদের নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন করেছেন। গণতন্ত্র ফেরাতে তিনি নিজের জীবন বিপন্ন করেছেন। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়ে প্রতিশোধ বা জিঘাংসার রাজনীতি করেননি। বরং তার বিরুদ্ধে সংসদের ভেতরে-বাইরে যারা কথা বলছেন, তাদের কারও বিরুদ্ধে তিনি প্রতিশোধ নেননি। এটাই গণতন্ত্রের নমুনা এবং গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরাকাষ্ঠা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াতের বিরুদ্ধে জনগণের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ তুলে রিজভী বলেন, “আপনারা শুনেছেন, কীভাবে একটি দল ধর্মের নামে রাজনীতি করে, জান্নাতের টিকিট বিক্রি করে। অথচ এলাকায়, মানুষের মনে ও সমাজে নরকের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।”
তিনি বলেন, ইসলামের মূল উদ্দেশ্য মানবতার সেবা ও অসহায়-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু জামায়াত সেই আদর্শ নিয়ে নেই; তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও রাজনৈতিক লাভের জন্য কাজ করছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে তারা নানাভাবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রিজভী আরও বলেন, “এখন ত্রাস ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।”
তিনি বলেন, “যেখানে মানবতা, মানবকল্যাণ, সামাজিক সেবা, সামাজিক সুরক্ষা এবং মানুষকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার প্রচেষ্টা—সেখানেই বিএনপি, সেখানেই তারেক রহমান। বিএনপি বিরোধী দলে থেকেও জনগণের পাশে থেকেছে, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।”
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ পরিবার পেল নতুন ঘর
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বাতিসা ইউনিয়নের সোনাপুর ও পাশের কনকাপৈত ইউনিয়নের মাসকরা গ্রামের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে মাসকরার কাছাকাছি সোনাপুরে মনোয়ারা বেগম, তার ছেলে মিলন ও মেয়ে হাসিনার ঘরসহ কয়েকটি বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে তিনটি বসতঘর, দুটি গোয়ালঘর ও দুটি রান্নাঘরসহ আসবাবপত্র পুড়ে যায়। আগুনে পাঁচটি পরিবার ঘরহারা হয়ে পড়ে।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নজরে আসে। পরে তিনি ‘আমরা বিএনপি পরিবার’কে ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজখবর নেওয়া ও পুনর্বাসনের নির্দেশ দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনটির উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য নতুন ঘর নির্মাণ করা হয়।
রোববার অনুষ্ঠানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের হাতে নবনির্মিত ঘরের চাবি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেন রুহুল কবির রিজভী।
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. কামরুল হুদার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল, ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্যসচিব কৃষিবিদ মোকছেদুল মোমিন মিথুন, সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হিরা, কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সভাপতি উদবাতুল বারী আবু, কুমিল্লা ওয়াসার চেয়ারম্যান আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম, চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার শাহ আলম, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া চৌধুরী যুবরাজ, সাংগঠনিক সম্পাদক গিয়াস উদ্দিনসহ জেলা ও উপজেলা বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
কেকে/সাশ