ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেললেন ঢাবির প্রাক্তন শিক্ষার্থী
ক্যাম্পাস প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৪০ পিএম
সংগৃহীত ছবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় রাখা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলেছেন আবু তৈয়ব হাবিলদার নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর আড়াইটার দিকে তিনি ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর প্রদর্শিত ছবি দুইটি ছিড়ে ফেলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং সবশেষ ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
ছবি ছিঁড়ার সময় আবু তৈয়ব হাবিলদার বলেন, ‘কার্জন হলে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে, বাংলা হবে না বলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূত্রটা জিন্নাহ তৈরি করে দিয়েছিলেন। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র তখন প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, জিন্নাহ সাহেব, আপনার এই সিদ্ধান্ত আমরা মানি না।’
আবু তৈয়ব হাবিলদার
তিনি বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের মূল নায়ক হিসেবে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ১১ মার্চ ১৯৪৮ শুরু করেছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বে হরতাল পালন হয়েছিল। সেখানে অনেক ছাত্র গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, দুই হাজারের ওপরে। সেই জিন্নাহ ডাকসুতে স্থান পেতে পারে না।’
জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা প্রসঙ্গে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এসএম ফরহাদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা জিন্নাহকে দায়মুক্তি দেইনি। জিন্নাহ যে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল আমরা সেটাই তুলে ধরেছি। বরং যারা জিন্নাহর ছবি ছিঁড়েছে তারাই মূলত জিন্নাহ প্রেম দেখাচ্ছে।’
আবার ছবি লাগানো হবে কিনা সে ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এর পূর্বে ডাকসুর সংগ্রহশালায় মোহাম্মদ আলী জিন্নার ছবি টাঙানোর প্রতিবাদ জানায় ঢাবি ছাত্রদল। ঢাবির উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলামের কাছে ছবিটি অপসারণে ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে সংগঠনটি।
উপাচার্যের সাথে সাক্ষাৎ শেষে ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিতর্কিত ডাকসু থেকে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের অধিকাংশ ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে জড়িত। সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দগজন বিতর্কিত ব্যক্তির ছবি তারা টাঙিয়েছে। আমরা এটা সহ্য করতে পারি না। এটা অপসারণ করা না হলে ছাত্রদলে ঢাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অফিস এবং ডাকসু সংগ্রহশালায় কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভ্যুত্থানকে স্মরণ করতে একটি স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তি প্রস্তর ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উদ্বোধন করেছে। কিন্তু তার আগেই বিতর্কিত ডাকসু রাতের অন্ধকারে ডাকসু ও মধুর ক্যান্টিনের সামনে একটি স্তম্ভ করেছে।কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে আরেকটি করতে চাচ্ছে। এভাবে জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিকে কেউ যদি রাজনৈতিকভাবে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা করে, তা আমরা মানব না।’
ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রসঙ্গে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (একাংশ) ঢাবি সংসদের সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, ‘১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা জিন্নাহর ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতা আমাদের রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলন, যা উনসত্তরের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি গড়ে দেয়। ডাকসু এই ভাষা আন্দোলনসহ স্বাধিকার আন্দোলনে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখে।’
‘ডাকসুর সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন করা ভাষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহ্যের প্রতি স্পষ্ট অবমাননা। চাওয়া ছিল– মহান মুক্তিযু্দ্ধকে আওয়ামী দখলদারিত্ব এবং হেয় করা– এই দ্বিমুখী অপতৎপরতার বিপরীতে ডাকসু এদেশের মানুষের প্রকৃত লড়াইয়ের ইতিহাস ছাত্র-জনতার কাছে তুলে ধরবে। ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদর্শ চর্চার স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হবে না, ডাকসু হবে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর। কিন্তু ডাকসু এদেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে সামনে আনার পরিবর্তে মুছে দেওয়ার অপতৎপরতা চালাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ, যা এদেশের মানুষের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অর্জন। এটা কোনো একক দলের সম্পত্তি নয়। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের অসংখ্য কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ফসল। এদেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ডাকসুর ঐতিহাসিক অবদান আছে। ডাকসুর বর্তমান নেতৃবৃন্দ লড়াইয়ের এই জন-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেনি। বরং বিকৃতি ও দলীয়করণের অপচেষ্টা করছে। ডাকসুকে সুনির্দিষ্ট দলীয় ও আদর্শিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত করার অপচেষ্টা করা হয়েছে।’
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি সংসদের আহ্বায়ক সৈকত আরিফ বলেন, ‘ডাকসু লজ্জাজনকভাবে ইতিহাসকে বিকৃতি করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলনের প্রথম পর্যায় ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিলো তা জিন্নার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়াতেই তৈরী হয়েছিলো। রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্থানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’’ সেখানে ডাকসু জিন্নাহকে হিরো হিসেবে উত্থাপন করেছে তা ইতিহাস বিকৃতি। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। একইসাথে ডাকসু সংগ্রহশালায় ইতিহাসকে যেভাবে উত্থাপন করা হয়েছে তা ইতিহাসের বিকৃতি। এই ঘটনায় ডাকসুর নেতৃবৃন্দের জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।’
এর পূর্বে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা ডাকসু ভবনের নিচতলায় সংস্কার করা এ সংগ্রহশালার উদ্বোধন করেন। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এসএম ফরহাদসহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি দেখা যায় সংগ্রহশালায়। এর মধ্যে একটি ছবি ১৯৪৮ সালে ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক অনুষ্ঠানের, যেখানে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। আরেকটি১৯৪০ সালের মার্চ মাসে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি গ্রুপ ছবিতেও জিন্নাহ রয়েছেন। ওই সম্মেলনেই ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসকারী মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবি সংবলিত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছিল। অপর ছবিটি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে জিন্নাহর ছবি সংবলিত পাকিস্তানের ডন পত্রিকার প্রতিবেদনের পেপার কাটিং।