একসময় গ্রামীণ জনপদের ঘরে ঘরে ছিল বেতের তৈরি সামগ্রীর ব্যবহার। বেতের মোড়া, চেয়ার, টেবিল, ঝুড়ি, কুলা, ডালা, চালুনি ও ধামাসহ নানা পণ্য ছিল মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজনের অংশ। সময়ের পরিবর্তনে সেই জায়গা দখল করেছে প্লাস্টিক ও আধুনিক উপকরণে তৈরি সামগ্রী। ফলে দেশের অন্যান্য এলাকার মতো ফরিদপুরেও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়াই নয়—ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবর্তন, কাঁচামালের সংকট, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়াসহ নানা কারণে বেতশিল্প এখন সংকটের মুখে। এর সঙ্গে যুক্ত অনেকেই জীবিকার তাগিদে পেশা পরিবর্তন করছেন। নতুন প্রজন্মও আগ্রহ হারাচ্ছে এ পেশায়।
একসময় ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকায় বেতের কাজের সঙ্গে বহু পরিবার সরাসরি যুক্ত ছিল। পরিবারের সদস্যরা মিলে বেত সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী তৈরি করতেন। এসব পণ্য স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করে চলত সংসার। কিন্তু বর্তমানে বেতের তৈরি পণ্যের তুলনায় প্লাস্টিকের পণ্য সহজলভ্য ও তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহও কমেছে।
বেতশিল্পের সঙ্গে জড়িত নিমাই বিশ্বাস বলেন, “একসময় বেতের কাজ করেই আমাদের সংসার চলত। বেত দিয়ে তৈরি জিনিসের কদরও ছিল অনেক। এখন মানুষের চাহিদা বদলে গেছে। বাজারে প্লাস্টিকের পণ্য সহজে পাওয়া যায় এবং দামও কম। ফলে বেতের জিনিস বিক্রি কমে গেছে। কাঁচামাল সংগ্রহ করাও আগের মতো সহজ নয়। এ কারণে এই পেশায় থেকে সংসার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই বেতের কাজটা টিকে থাকুক। কিন্তু শুধু চাইলেই তো হবে না, বাজার তৈরি করতে হবে, কাঁচামালের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার যদি প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করে, তাহলে এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।”
বেতশিল্পের সঙ্গে জড়িত সঞ্চিত বলেন, “বেতের কাজ আমাদের কাছে শুধু জীবিকা নয়, এটি আমাদের বাপ-দাদার পেশা ও ঐতিহ্য। আগে মানুষ বেতের তৈরি সামগ্রী ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত। এখন প্লাস্টিকের কারণে সেই জায়গাটা প্রায় হারিয়ে গেছে। কাজের তুলনায় আয় কম হওয়ায় অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।”
বেতশিল্পের সাথে জড়িত অসীম বিশ্বাস বলেন , “সবচেয়ে বড় ভয় হলো নতুন প্রজন্ম এই কাজ শিখতে চাইছে না। আমরা যদি এখনই বেতশিল্পকে বাঁচানোর উদ্যোগ না নিই, তাহলে কয়েক বছর পর হয়তো ফরিদপুরে এই পেশার মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।”
এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার ময়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কালীপদ চক্রবর্তী বলেন, “বেতশিল্প আমাদের গ্রামীণ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। একসময় বেতের তৈরি সামগ্রী মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবর্তন, কাঁচামালের সংকট, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের পাশাপাশি প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার এই শিল্পকে বড় ধরনের সংকটের মধ্যে ফেলেছে।”
তিনি আরও বলেন, “একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি পেশার বিলুপ্তি নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি অঞ্চলের সংস্কৃতি, কারিগরি জ্ঞান ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা জীবনধারা। বেতশিল্পের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। নতুন প্রজন্মকে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে হলে প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা, কাঁচামালের নিশ্চয়তা এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার সৃষ্টি করতে হবে।’
কালিপদ চক্রবর্তী বলেন, “আজকের প্লাস্টিকনির্ভর সমাজে বেতের তৈরি পণ্য পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এটিকে শুধু পুরোনো একটি শিল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে বেতশিল্পকে আধুনিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে একদিকে যেমন ঐতিহ্য রক্ষা হবে, অন্যদিকে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।”
কালিপদ চক্রবর্ত্তী আক্ষেপ করে বলেন, ‘ফরিদপুরের বেতশিল্প এখন তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে। সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া না হলে একদিন হয়তো এই শিল্পের কারিগর, তাঁদের হাতের নিপুণতা এবং বেতের তৈরি ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী—সবই হারিয়ে যাবে স্মৃতির পাতায়।’
এক প্রশ্নের জবাবে কালিপদ চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘ফরিদপুরের বেতশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রথমে বেতের কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কারিগরদের প্রশিক্ষণ, স্বল্প সুদে ঋণ, আধুনিক নকশায় পণ্য তৈরির সুযোগ এবং স্থানীয় ও অনলাইন বাজারে এসব পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এছাড়া প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেতের তৈরি ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে আধুনিক নকশা ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে শিল্পটির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।’
কেকে/এমএ