কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান, ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নির্মম হত্যাকাণ্ড গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। একটি শিশু, যে সবেমাত্র কৈশোরে পা রেখেছিল, তাকে যারা হত্যা করেছে তারাও বয়সে কিশোর কিংবা সদ্য তরুণ। এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়— এটি একটি সামাজিক ব্যাধির লক্ষণ, যার নাম কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী অভিযুক্তদের সঙ্গে নিহত কিশোরের বন্ধুত্ব ও ওঠাবসা ছিল এবং তাদের বয়স নিহতের চেয়ে মাত্র পাঁচ থেকে ১০ বছর বেশি। এই তথ্যই বলে দেয়, বিপদ ঘরের বাইরের কোনো অচেনা শত্রু নয়— বিপদ আমাদেরই চেনাজানা পরিবেশের ভেতরেই বেড়ে ওঠছে।
পুলিশের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী- সারা দেশে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা প্রায় চারশর কাছাকাছি, যাদের সদস্য সংখ্যা চার হাজারের বেশি। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, পল্লবী কিংবা খিলগাঁওয়ের মতো এলাকায় এসব দল প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করছে, চাঁদাবাজি করছে, মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে, এমনকি প্রতিপক্ষকে কুপিয়ে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। এই চিত্র শুধু আইনশৃঙ্খলার ভয়াবহ দিকটিই তুলে ধরে না, একইসঙ্গে এটি আমাদের পারিবারিক তত্ত্বাবধান, শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির সামগ্রিক ব্যর্থতাকে সামনে নিয়ে আসে।
এখানে একটি প্রশ্ন অনিবার্যভাবে উঠে আসে— এই কিশোররা রাতারাতি অপরাধী হয়ে উঠেছে? ছোট অপরাধের শাস্তি না হওয়াই বড় অপরাধের বীজ বোনে। কুমিল্লার ঘটনায় আটক অন্যতম অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অতীতে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের অভিযোগ থাকলেও প্রভাবশালী মহলের চাপে তা সাধারণ ডায়েরিতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তবে তা শুধু এই ঘটনাটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখাটা ঠিক হবে না। এটি আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। যখন আইন প্রভাবশালীদের ভয়ে প্রভাবিত হয় তখন অপরাধীরা এই বার্তাই পায় যে, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিই কিশোর অপরাধকে ক্রমশ ভয়ংকর রূপ দিচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশের দ্রুত তদন্ত ও গ্রেপ্তারের প্রশংসা করেছেন, যা প্রাপ্য। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর দ্রুত গ্রেপ্তার যথেষ্ট হতে পারে ভেবে পাই না। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো- অপরাধ ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা। একটি গ্যাং ভেঙে দিলেই সমস্যা মেটে না, কারণ যে সামাজিক-অর্থনৈতিক শূন্যতা এসব দলের জন্ম দেয়, তা অটুট থাকলে নতুন দল ঠিকই গড়ে ওঠে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা যেমন বলছেন, অভিভাবকদের উদাসীনতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সুস্থ বিনোদনের অভাব, মাদকের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বীরত্ব’ জাহিরের প্রবণতা— এসব একসঙ্গে মিলে কিশোরদের অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখানে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার— তিন পক্ষেরই দায় সমানভাবে বর্তায়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব আইনের প্রয়োগে কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী হস্তক্ষেপ না ঘটতে দেওয়া, প্রতিটি অভিযোগ— তা যত ছোটই হোক না কেন— গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা এবং কিশোর সংশোধনাগারব্যবস্থাকে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর করে তোলা। বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে তা সময়মতো চিহ্নিত করা এবং খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ তৈরি করা, যাতে কিশোররা সুস্থ পথে নিজেদের শক্তি প্রকাশের জায়গা পায়।
আর পরিবারের দায়িত্ব— সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, মুঠোফোনে কী করছে— সে বিষয়ে সচেতন ও সংবেদনশীল থাকা। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা আর ব্যস্ত নাগরিক জীবনে এই তত্ত্বাবধান ক্রমেই শিথিল হয়ে পড়ছে, যার মূল্য দিতে হচ্ছে আমাদের শিশুদের।
অপ্রতিম হত্যার বিচার নিশ্চয়ই দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক হোক সেটাই কাম্য কিন্তু কেবল একটি মামলার বিচারেই এই সংকটের সমাধান নেই, কিংবা কেবল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত হবে তা কাম্য নয়। সকল ধরনের খুন , ধর্ষণ, নীপিড়নের বিচার দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে। যতদিন না কিশোর গ্যাংয়ের পেছনের পৃষ্ঠপোষক, অর্থদাতা ও প্রভাবশালী মহলকে চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, ততদিন এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যাবে না।
আমরা আশা করি, অপ্রতিমের এই মৃত্যু নিছক একটি সংবাদ শিরোনাম হয়ে হারিয়ে যাবে না— বরং তা হয়ে উঠবে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সম্মিলিত আত্মজিজ্ঞাসার একটি উপলক্ষ। একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার দায়িত্ব থেকে আমরা কেউই মুক্ত নই ।
কেকে/ এমএস