‘আয় যা হয়, সবই তো খরচ হয়ে যায়— তাহলে ট্যাক্স দেব কোথা থেকে?’ এই কথার উত্তর আয়কর আইনে বেশ গুরুত্বপূর্ণভাবে দেওয়া আছে। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী আয় হলেই পুরো টাকা খরচ করা করমুক্তির কারণ নয়, আয়কর মূলত করযোগ্য আয়/মোট আয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। ব্যক্তিগত জীবনযাপনের খরচ যেমন— খাবার, বাসাভাড়া, পোশাক, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াত ইত্যাদিতে টাকা খরচ হয়ে গেলেই সেই খরচ বাদ দিয়ে করযোগ্য আয় শূন্য হয়ে যায় না। বিভিন্ন খাতের আয় যোগ করে মোট আয় নির্ধারণ করে তার ওপর প্রদেয় কর হিসাব করা হয়।
তবে আইনে খরচের বিষয়টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়নি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে, ব্যক্তিগত খরচ এবং আয় অর্জনের জন্য ব্যবসায়িক খরচ এক নহে, উদাহরণস্বরূপ : ব্যবসা থেকে মোট ২০ লাখ টাকা উক্ত ব্যবসা পরিচালনার বৈধ খরচ ৮ লাখ টাকা হলে, ব্যবসার ক্ষেত্রে করযোগ্য আয় নির্ধারণে অনুমোদিত ব্যবসায়িক খরচের প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু— আয় ২০ লাখ টাকা পরিবারের ভরণ-পোষণে খরচ ৮ লাখ টাকা, এ ক্ষেত্রে এই ৮ লাখ টাকা ব্যক্তিগত জীবনযাপনের খরচ হওয়ায় সাধারণভাবে এটিকে দেখিয়ে ২০ লাখ টাকার আয়কে ১২ লাখ টাকা করযোগ্য আয় বানানো যাবে না।
‘ট্যাক্স দেওয়ার টাকা নেই’— এটি কর অব্যাহতির কারণ নয় ধরা যাক, কারও বছরে আয় হয়েছে ১০ লাখ টাকা, তিনি পুরো ১০ লাখ টাকাই সংসারে খরচ করেছেন। ফলে বছর শেষে ব্যাংকে কিংবা হাতে কোনো টাকা নেই। তারপরও যদি আইন অনুযায়ী তার আয় করযোগ্য আয় হয়ে থাকে, শুধু ‘সব টাকা খরচ হয়ে গেছে’ বললে করের দায় শেষ হবে না। বরং আয়কর রিটার্নে আয়, সম্পদ-দায় এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান আইনে নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তির জন্য সম্পদ ও দায়ের বিবরণী দাখিলের বিধানও রয়েছে। কেউ যদি রিটার্নে কম আয় দেখান, কিন্তু তার জীবনযাত্রার ব্যয় বা সম্পদ অর্জন সেই আয়ের তুলনায় অনেক বেশি হয়, তখন প্রশ্ন উঠতে পারে— অতিরিক্ত টাকা এলো কোথা থেকে? আয়কর আইনে অপ্রকাশিত/ব্যাখ্যাহীন ব্যয়, বিনিয়োগ বা সম্পদের অর্থের উৎস সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থের উৎসের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না থাকলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেটি আয় হিসেবে গণ্য হতে পারে।
ধরা যাক একজন চাকরিজীবীর বছরে আয় ১২ লাখ টাকা। তিনি খরচ করেছেন— পরিবারের খরচ— ৫ লাখ বাসাভাড়া, ২ লাখ সন্তানের পড়াশোনা, ১.৫ লাখ চিকিৎসা, ৫০ হাজার, অন্যান্য ৩ লাখ টাকা, মোট খরচ =১২ লাখ টাকা, বছর শেষে সঞ্চয় শূন্য। এ ক্ষেত্রে এই অর্থ দাঁড়ায় না যে, তার আয়ও শূন্য বা করযোগ্য আয়ও শূন্য। আয়কর হিসাব হবে আইনের নির্ধারিত নিয়মে তার করযোগ্য আয়ের ওপর; ব্যক্তিগত খরচের পর হাতে কত টাকা অবশিষ্ট আছে— তার ওপর সরাসরি নয়।
মূল কথা ‘আয় যা হয়, সবই খরচ হয়ে যায়’ এটি বাস্তব জীবনের কথা; কিন্তু আয়কর আইনে কর নির্ধারণের একমাত্র ভিত্তি নয়। রিটার্ন আয়, জীবনযাত্রার ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে এটি মনে রাখতে হবে, যে ব্যক্তি নির্ধারিত করযোগ্য আয় করেন, তিনি আয়কর প্রদান বাধ্য, তা তিনি খরচ করুন কিংবা সঞ্চয় করুন, আইন এতে কোনো প্রকার ভেদাভেদ করে না। সকলকে মনে রাখতে হবে, আইন মেনে কর প্রদান করা প্রতিটি নাগরিকের নাগরিক দায়িত্ব।
লেখক : আয়কর আইনজীবী
কেকে/ এমএস