বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোর মূল চালিকাশক্তি আর কোটি কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার মূল কারিগর এই কৃষিজীবী সমাজ। অথচ আমাদের অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে এই কৃষকরাই আজ সবচেয়ে বেশি অবমূল্যায়িত, উপেক্ষিত ও নিপীড়িত। ফসল ফলানোর জন্য যে মেধা, শ্রম ও পুঁজি তারা বিনিয়োগ করেন, চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে বাজারব্যবস্থার নির্দয় ফাঁদে পড়ে তার ন্যূনতম ন্যায্যতা থেকেও তারা বঞ্ছিত হন। যার হাতে বোনা বীজে বেঁচে থাকে দেশের প্রায় আঠারো কোটি মানুষ, সেই অন্নদাতার থালাতেই জড়িয়ে থাকে অনিশ্চয়তা, অভাব আর ঋণের করুণ বাস্তবতা।
বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত কৃষির ইতিহাস। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই দেশকে টেনে তুলেছিল আমাদের কৃষি খাত। তৎকালীন সাত কোটি মানুষের খাদ্য জোগাতে যেখানে হিমশিম খেতে হতো, আজ সেখানে ১৬/১৭ কোটি মানুষের খাদ্য সংস্থান হচ্ছে এ দেশের উর্বর মাটি ও কৃষকের নিরলস প্রচেষ্টায়। চাল, সবজি, মাছ ও ফলমূল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। কিন্তু এই বৈপ্লবিক সাফল্যের নেপথ্যে যারা দিনরাত এক করে কাজ করে যাচ্ছেন, সেই কৃষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের কি কোনো বাস্তব উন্নতি হয়েছে? উত্তরটি অত্যন্ত হতাশাজনক। এ দেশের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সব সুফল তথাকথিত আধুনিক ও শিল্প খাত ভোগ করলেও, মাটির কারিগরেরা থেকে গেছেন সেই আগের মতোই অবহেলিত ও শোষিত।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের নানা প্রান্ত থেকে উঠে আসা সংবাদ ও আলোকচিত্র আমাদের জাতীয় বিবেককে দারুণভাবে নাড়া দেয়। সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা দেখতে পাই, সার ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণের জন্য কৃষকদের আকুল হাহাকার।
বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে, কুড়িগ্রামে সারের জন্য গোডাউন লুট হয়েছে। সারের তীব্র সংকটের মুখে বাধ্য হয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকদের সারের গোডাউন ঘেরাও করার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে। ফসল ফলানোর অতি প্রয়োজনীয় একটি প্রাথমিক উপাদানের জন্য কেন দেশের কৃষককে এভাবে রাস্তায় নামতে হবে, কেন তাকে বিক্ষোভ ও সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হবে, এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
আমাদের দেশে সরকার মূলত নিবন্ধিত ডিলারদের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে ভর্তুকি মূল্যে সার বিতরণের ব্যবস্থা পরিচালনা করে থাকে। দৃশ্যত এই পরিকল্পনাটি কৃষকবান্ধব মনে হলেও, বাস্তব ক্ষেত্রে এটি মধ্যস্বত্বভোগী ও একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর চরম মুনাফা লোটার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কৃষকদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে যে, সরকারের নির্ধারিত ডিলারদের কাছে গেলে তারা প্রায়শই প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার পান না। ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সার কালোবাজারে পাচার করে দেয় এবং কৃষকদের বাধ্য করা হয় নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ চড়া দামে সার কিনতে।
সার মৌসুমের সঠিক সময়ে যদি জমিতে প্রয়োগ করা না যায়, তবে পুরো মৌসুমের ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকি থাকে। কৃষকরা সেই ঝুঁকিমুক্ত থাকতে বাধ্য হয়ে চড়া সুদে এনজিও বা মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চড়া দামেই সার কেনেন। কিন্তু কৃষি উপকরণের এই দুর্নীতির নেপথ্যে থাকা সিন্ডিকেটের কারসাজি উদঘাটন করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো জোরালো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কৃষি এবং কৃষিসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। দেশের বিশাল এই জনগোষ্ঠী যখন নিরন্তর অবমূল্যায়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়, তখন তা কেবল তাদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সংকটেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পুরো জাতীয় অর্থনীতির ওপর মারাত্মক ঋণাত্মক প্রভাব ফেলে। কৃষক যখন মাঠে দিনের পর দিন রোদে পুড়ে ফসল ফলিয়ে বাজারে তার সঠিক ও ন্যায্য মূল্য পান না, যখন দেখা যায় কৃষক প্রতি কেজি টমেটো বা বেগুন ৫ টাকায় বিক্রি করছেন আর সেই একই পণ্য রাজধানী বা বড় শহরে এসে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তখন স্পষ্ট বোঝা যায় বাজারব্যবস্থা কতটা গলদে ভরা। মধ্যস্বত্বভোগীরা ফড়িয়া সেজে লাভের সিংহভাগ লুটে নেয় আর উৎপাদক কৃষক থাকেন কেবল লোকসানের খাতায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই পেশার প্রতি কৃষকদের এক ধরনের চরম হতাশা, ক্ষোভ ও ক্ষোভভিত্তিক উদাসীনতা তৈরি হচ্ছে।
কৃষকের এই ক্ষোভ ও হতাশা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক বিশাল বিপর্যয় ডেকে আনবে। বর্তমানে একটি আশঙ্কাজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, কৃষিতে অব্যাহত লোকসান, অনিশ্চয়তা ও সামাজিক মর্যাদার অভাবে নতুন ও তরুণ প্রজন্ম কৃষি পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বাবার কষ্টের পর কষ্ট ও ঋণগ্রস্ততা দেখে সন্তান আর মাঠে যেতে চাইছে না; তারা ভিড় করছে শহরের বস্তিতে বা কম বেতনের অনানুষ্ঠানিক কাজের সন্ধানে।
ঐতিহ্যগতভাবে বংশপরম্পরায় চলে আসা কৃষি কাজ থেকে যদি আমাদের তরুণ সমাজ এভাবে সরে দাঁড়াতে শুরু করে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কৃষি শ্রমিকের চরম সংকট দেখা দেবে। এর ফলে কৃষি জমিগুলো পতিত থাকবে কিংবা আবাসন প্রকল্পের নামে অনাবাদি হয়ে পড়বে, যার প্রত্যক্ষ পরিণতিতে দেশকে খাদ্য আমদানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হতে হবে। পরনির্ভরশীল খাদ্যব্যবস্থা যেকোনো দেশের সার্বিক সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি চরম হুমকি।
এই গভীর ও বহুমাত্রিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের নীতি-নির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন দরকার। প্রথমত, কৃষককে তার উৎপাদিত ফসলের সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ও অন্যান্য ফসল ক্রয়ের পরিধি কয়েকগুণ বাড়াতে হবে, যাতে কোনো ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগী মাঝখান থেকে কৃষকের লাভের গুড় খেয়ে ফেলতে না পারে। প্রয়োজনে প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে শস্য ক্রয় কেন্দ্র ও আধুনিক হিমাগার স্থাপন করতে হবে, যেন পচনশীল পণ্য কৃষক স্বল্প খরচে সংরক্ষণ করতে পারেন এবং বাজারে দাম স্বাভাবিক হলে বিক্রি করতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা ও সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি। সারের বিতরণ প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। প্রতিটি কৃষকের জন্য ‘কৃষি স্মার্ট কার্ড’ চালু করে অ্যাপভিত্তিক ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের হাতে ভর্তুকির সার ও বীজ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা গেলে ডিলারদের কৃত্রিম সংকট তৈরির অবৈধ সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হবে। এর পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ডিলার ও অসাধু ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
তৃতীয়ত, আমাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষি খাতকে দ্রুততম সময়ে আধুনিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক করে গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বিশ্বজুড়ে আজ কৃষিব্যবস্থায় প্রযুক্তির বৈপ্লবিক ব্যবহার ঘটছে। ইসরায়েল, চীন, নেদারল্যান্ডস কিংবা জাপানের মতো দেশগুলো সীমিত জমি ও প্রতিকূল জলবায়ু সত্ত্বেও কেবল প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে খাদ্য উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। আমাদের দেশের উর্বর মাটি ও পরিশ্রমী কৃষকদের যদি আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের ওপর উপযুক্ত ও নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে আমাদের কৃষিতে এক নতুন যুগের সূচনা হবে।
আধুনিক সেচব্যবস্থা, মাটিতে পুষ্টি উপাদান পরীক্ষার সহজ ডিজিটাল যন্ত্র, ড্রোন প্রযুক্তির সাহায্যে বালাইনাশক স্প্রে, মানসম্পন্ন উন্নত বীজ নির্বাচন এবং যান্ত্রিক কাটাই-মাড়াই প্রযুক্তির সঙ্গে আমাদের মাঠপর্যায়ের কৃষকদের নিবিড়ভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। এজন্য সরকারি উদ্যোগে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা উচিত। শুধু প্রশিক্ষণ প্রদানই নয়, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য কৃষকদের সহজ শর্তে, জামানতবিহীন ও নামমাত্র সুদে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। যখন একজন কৃষক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠবেন, তখন তার উৎপাদন খরচ অনেকাংশে কমে আসবে এবং উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে কৃষককে রক্ষা করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। অসময়ে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার একর জমিতে কৃষকের স্বপ্নের ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এই ক্ষতি মোকাবিলায় সারা দেশে ‘কৃষি বীমা’ ব্যবস্থা চালু করা অত্যন্ত আবশ্যক। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি হলে কৃষক যেন দ্রুত আর্থিক ক্ষতিপূরণ পান, সেই সুরক্ষা ছাতা সরকারকেই তৈরি করে দিতে হবে।
আমাদের অর্থনীতি, জীবনধারণ এবং অস্তিত্ব যে কৃষকের হাতের ওপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে আছে, সেই কৃষককে আর অবহেলা বা অবমূল্যায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। কৃষি কেবল একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি আমাদের জাতীয় জীবনের প্রাণশক্তি। কৃষককে অবমূল্যায়ন করে কোনো দেশ কোনোদিন উন্নত ও আত্মনির্ভরশীল হতে পারে না।
কৃষকদের সামাজিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা, ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষিত ও দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে যদি আমরা একটি কৃষকবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন করতে পারি, তবেই বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তায় চিরস্থায়ী স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে। কৃষক বাঁচলে বাঁচবে আমাদের কৃষি, আর কৃষি বাঁচলেই সুদৃঢ় থাকবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি।
লেখক : সাংবাদিক
কেকে/ এমএস