নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ে ভোক্তার অসন্তোষ নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত দেখিয়ে দিচ্ছে, সমস্যাটি এখন শুধু মৌসুমি মূল্যবৃদ্ধির নয়। ভোজ্যতেল, চাল ও রান্নার গ্যাস, এই তিন অতি প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রতিযোগিতার ধারণাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় সরকারের।
ভোজ্যতেলের চিত্রটি দিয়ে শুরু করা যায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে প্রায় ২৫ লাখ ৭ হাজার টন সয়াবিন ও পাম তেল আমদানি হয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই চারটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে।
বর্তমানে ভোজ্যতেল পরিশোধন ও বাজারজাতকরণে সক্রিয় প্রতিষ্ঠান ১১টি। এক দশক আগে যে চার প্রতিষ্ঠান চাহিদার প্রায় এক-চতুর্থাংশ জোগান দিত, তাদের বাজার অংশীদারত্ব এখন প্রায় তিন গুণ। বাজার যখন এভাবে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন দাম নির্ধারণে ক্রেতার দর-কষাকষির সুযোগ থাকে না।
চালের বাজারের চিত্র আরও বিস্ময়কর। সরকারি গুদামে চালের মজুত ১৯ লাখ টনেরও বেশি, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বোরোর ফলনও ভালো। তবু সুগন্ধি চালের কোনো কোনো জাতের দাম ২৩০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ৮১০টি বাজারভিত্তিক বিশ্লেষণ বলছে, কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চাল গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হলেও খুচরা পর্যায়ে তা বিক্রি হচ্ছে ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সায়। পাঁচ ধাপের এই শৃঙ্খলে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন মিলার পর্যায়ে, কেজিপ্রতি প্রায় ১৮ টাকা।
সিপিডির মতে, এই ব্যবধান শুধু উৎপাদন ব্যয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; এর পেছনে মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু সিন্ডিকেটের ভূমিকা আছে। এর ফল দ্বিমুখী : কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না, ভোক্তাকে গুনতে হয় বাড়তি দাম।
রান্নার গ্যাসের ঘটনাটি সম্ভবত সবচেয়ে উদ্বেগজনক। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে, আগস্টে হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানিতে ঘাটতি ছিল না। অথচ ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হলেও বাজারে তা প্রায় ২ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদনে পাঁচটি কোম্পানির নাম এসেছে, যারা আমদানি করা এলপিজির উল্লেখযোগ্য অংশ বাজারে ছাড়েনি বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এনএসআই এ-ও তদন্তের সুপারিশ করেছে, আগে মজুত রেখে দাম সমন্বয়ের পর পণ্য ছাড়া হয়েছে কি না।
এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন; অভিযুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। মিল মালিকেরা বলছেন ধানের দাম বেশি, আড়তদারেরা বলছেন মিলগেটেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মীমাংসা করতে হলে তথ্য-প্রমাণ দরকার, আর সেই প্রমাণ সংগ্রহের দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতির ভাষায়, কার্যকর কোনো মনিটরিং দেখা যাচ্ছে না। তার অভিযোগ, অনেক সময় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের বক্তব্য অনুযায়ীই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হচ্ছে।
এটি সত্য হলে দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় ভোক্তার স্বার্থ কার্যত অনুপস্থিত। সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়ানোর পর নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশিতে বিক্রি হওয়াও বলে দেয়, সরকারি মূল্যনির্ধারণ বাজারে কতটা কার্যকর।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসকদের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে, বিইআরসিও হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। কিন্তু হুঁশিয়ারি আর তদন্তের নির্দেশ দিয়ে বাজারকে শৃঙ্খলায় আনা যায় না। এখন দরকার নির্দিষ্ট, সময়বদ্ধ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ। এ লক্ষ্যে আমরা কয়েকটি প্রস্তাব দিচ্ছি।
এলপিজির মজুত নিয়ে এনএসআইয়ের সুপারিশ অনুযায়ী দ্রুত স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে এবং ফল প্রকাশ করতে হবে। দোষী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি দিতে হবে, আর নির্দোষ প্রমাণিত হলে সেটিও জানাতে হবে।
আমদানি, মজুত ও সরবরাহের তথ্য নিয়মিত ও প্রকাশ্যে জানাতে হবে। আমদানিকারক থেকে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো চেইনে নজরদারির ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রকৃত উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ের স্বাধীন হিসাব প্রকাশ করতে হবে। ক্যাবসহ ভোক্তাপ্রতিনিধিদের এ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।
বাজার ব্যবস্থা তখনই কাজ করে, যখন প্রতিযোগিতা থাকে ও তথ্য স্বচ্ছ হয়। যেখানে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ ও দামের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, সেখানে বাজারের নামে চলে সুবিধাভোগীদের আধিপত্য।
কেকে/সাশ