মৃদু বাতাসে দুলছে সারি সারি সাদা কাশফুল। ছবি : প্রতিনিধি
নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। মৃদু বাতাসে দুলছে সারি সারি সাদা কাশফুল। সবুজ ঘাসের বুক চিরে বয়ে চলেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। নদীর তীরজুড়ে শুভ্র কাশফুলের ঢেউ দেখে মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিজের হাতে এঁকেছে অপূর্ব এক ছবি। শরতের এ মায়াবী সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রতিদিনই সেখানে ছুটে আসছেন নানা বয়সী মানুষ।
কেউ আসছেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। কেউ আবার প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটাচ্ছেন কিছুটা নিরিবিলি সময়। কাশবনের শুভ্রতার সঙ্গে ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন, কেউবা হাঁটছেন কাশফুলের ভেতর দিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ সব ছবি-ভিডিওর কারণে জায়গাটি এখন স্থানীয়দের কাছে শরতের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
কাশফুলের মাঝে প্রিয়জনদের সঙ্গে নিরিবিলি সময় কাটাচ্ছেন। ছবি : প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এখন এমনই শরতের আবহ। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র নদের সেতুসংলগ্ন বিশাল কাশবনজুড়ে ফুটে আছে সাদা কাশফুল। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দর্শনার্থীদের আনাগোনা থাকলেও বিকালের শেষভাগে বাড়ে ভিড়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ চরজুড়ে বাতাসের সঙ্গে দুলছে কাশফুলের সাদা শীষ। কোথাও দলবেঁধে তরুণ-তরুণীরা ছবি তুলছেন, কোথাও পরিবারের সঙ্গে আসা শিশুরা ছুটে বেড়াচ্ছে। কারও হাতে মোবাইল ফোন, কারও হাতে ক্যামেরা। কাশফুল হাতে নিয়ে কিংবা কাশবনের ভেতরে দাঁড়িয়ে চলছে ছবি তোলার আয়োজন।
বাতাসের সঙ্গে দুলছে কাশফুলের সাদা শীষ। ছবি : প্রতিনিধি
বিকালের দিকে বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। সূর্যের নরম আলো সাদা কাশফুলে পড়লে চরাঞ্চল যেন রূপ নেয় সোনালি-সাদা এক ক্যানভাসে। একদিকে নীল আকাশ, নিচে সবুজের বিস্তার, মাঝখানে শুভ্র কাশফুল আর পাশে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্র—সব মিলিয়ে তৈরি হয় চোখজুড়ানো এক দৃশ্য।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাশফুলের মৌসুমে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে ঘুরতে আসছেন। ছুটির দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে ছুটে আসছেন।
সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দর্শনার্থীদের আনাগোনা। ছবি : প্রতিনিধি
সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের নধার গ্রাম থেকে আসা তাসলিমা খাতুন বলেন, ‘কাশফুলের সমারোহে বিকালের বাতাস যেন শীতের আগমনের বার্তা দিচ্ছে। একই সঙ্গে শৈশবের অনেক স্মৃতিও মনে পড়ে যাচ্ছে। গোধূলির সময় মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ আর সাদা কাশফুল যখন বাতাসে দুলতে থাকে, তখন মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। এ অপরূপ সৌন্দর্যের কাছে থাকতে পেরে খুবই ভালো লাগছে।’
জেলা শহরের উকিলপাড়া এলাকার বাসিন্দা রবিউল হোসেন বলেন, ‘নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলার ওড়াউড়ি আর মাঠে মাঠে কাশফুলের বাহারই শরতের অন্যতম সৌন্দর্য। শরৎ প্রকৃতিকে যে সাজে সাজায়, তা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। তাই বন্ধুদের সঙ্গে প্রকৃতির এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে এসেছি।’
কেউ আসছেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। ছবি : প্রতিনিধি
আরেক দর্শনার্থী মামুন মিয়া বলেন, ‘ঋতু পরিক্রমায় বাংলার প্রকৃতিতে এখন শরৎকাল। এ সময় রাশি রাশি কাশফুল তার অপরূপ সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতেই এখানে আসা। এখানে এসে খুব ভালো লাগছে।’
সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী মাহমুদা আক্তার বলেন, ‘মা, বোন আর ভাবি মিলে এখানে কাশফুল দেখতে এসেছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ জায়গার ছবি দেখে আগে থেকেই জানাশোনা ছিল। মা প্রথমে আসতে চাচ্ছিলেন না। কিন্তু এখানে আসার পর তিনিই সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন।’
করিমগঞ্জ উপজেলার গুজাদিয়া ইউনিয়নের টামনি ইসলামপুর থেকে আসা হাকিম বলেন, ‘সাদা কাশফুল আর সবুজের পাশ দিয়ে চলার অনুভূতিই অন্য রকম। এখানে এসে কাশফুলের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে মনটা ভরে গেছে। অনেকেই পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সঙ্গে এসে ছবি তুলছেন। প্রকৃতির এমন দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি না করে থাকা যায় না।’
আনন্দে মেতেছে শিশুরা। ছবি : প্রতিনিধি
পাকুন্দিয়া থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা রাকিব হাসান বলেন, ‘বন্ধুরা মিলে বাইক নিয়ে এখানে এসেছি। কাশফুলের শুভ্রতার ছোঁয়া পেতে আর কিছুটা প্রশান্তির খোঁজেই ঘুরতে আসা। খুব ভালো লাগছে। আগে আশপাশের অনেক জায়গাতেই কাশফুল দেখা যেত। এখন বিশেষ কিছু জায়গা ছাড়া তেমন দেখা যায় না। তাই এমন জায়গায় এসে সময় কাটাতে ভালো লাগে।’
পরিবার নিয়ে আসা গীতা রানী সাহা বলেন, ‘পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্রকৃতির এমন সুন্দর পরিবেশে সময় কাটাতে পেরে খুব ভালো লাগছে। চারপাশে সাদা কাশফুল, সবুজের সমারোহ আর পাশে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্র নদ সব মিলিয়ে জায়গাটি অসাধারণ। শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা সময় বের করে এখানে এসে মনটা সত্যিই ভালো হয়ে গেছে।’
বেলা ফুরিয়ে আসার কালে কাশফুল। ছবি : প্রতিনিধি
শুধু কাশফুল নয়, দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ ব্রহ্মপুত্র নদ। কাশবন ঘুরে অনেকেই নৌকায় চড়ে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। বিকালের মৃদু বাতাস, নদীর ঢেউ আর দুই তীরে কাশফুল—সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে ভিন্ন এক অনুভূতি।
স্থানীয়রা জানান, দর্শনার্থীদের নদীতে ঘোরানোর জন্য বর্তমানে সেখানে প্রায় ১০-১৫টি নৌকা রয়েছে। বিকালের দিকে নৌকায় ঘোরার আগ্রহ সবচেয়ে বেশি থাকে। এতে কাশফুলের মৌসুমে স্থানীয় মাঝিদেরও বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় মাঝি কামাল মিয়া বলেন, ‘কাশফুল দেখতে মানুষ আসায় আমাদের নৌকায়ও যাত্রী হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছি। জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। এ সময়টাতে আমাদের বাড়তি একটা আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
নৌকার মাঝিদের পাশাপাশি উপকৃত হচ্ছেন স্থানীয় ছোট ব্যবসায়ীরাও। কাশবনের আশপাশে অস্থায়ীভাবে বসছে খাবার ও পানীয়ের দোকান। কেউ ছবি তোলার ব্যবস্থা করছেন, কেউ করছেন ছোটখাটো ব্যবসা। ফলে শরতের কয়েক সপ্তাহের জন্য হলেও চরাঞ্চল ঘিরে তৈরি হচ্ছে স্থানীয় পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
স্থানীয় এনামুল হাসান শাহিন মিয়া বলেন, ‘প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে এখানে কাশফুল ফুটতে শুরু করে। অক্টোবর মাসে পুরো এলাকা কাশফুলে ছেয়ে যায়। নভেম্বরের শেষ দিক থেকে ফুলগুলো ধীরে ধীরে ঝরতে শুরু করে।’
তিনি বলেন, ‘সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়াও প্রায় প্রতিদিনই এখানে দর্শনার্থীর ভিড় থাকে। আশপাশের এলাকায় কাশবন থাকলেও এত বড় জায়গাজুড়ে কাশফুলের সমারোহ খুব বেশি দেখা যায় না। তার ওপর জায়গাটি শহরের কাছাকাছি এবং তুলনামূলক নিরাপদ হওয়ায় মানুষের আগ্রহও বেশি।’