সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬,
৩ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন      ● আগামী ১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু      ● ওসমানী উদ্যানে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী       ● গণবিক্ষোভে অস্থির ফ্রান্স, গ্রেপ্তার ২৪০০—ম্যাক্রোঁর কঠোর বার্তা      ● দুপুরে পদত্যাগের ঘোষণা দিচ্ছেন ইশরাক      ● আজ মহাঅষ্টমী: কুমারী পূজা ও সন্ধিপূজায় মুখর দুর্গোৎসব      ● মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      
ফিচার
‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই’
অঞ্জন আচার্য
প্রকাশ: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:২০ পিএম
আশা খাতুন

আশা খাতুন

‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি। আঁরা হডে যাইয়ুম, হডে থাইক্কুম, ক্যানে মাথা গুঁইজ্জুম, ন জানি।’ (ও বাবা, আমার ঘর আর নেই, কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। কোথায় যাব, কোথায় থাকব, মাথা গোঁজার জায়গাই বা কোথায় পাব, জানি না।) 

কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলেছিলেন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব নারী আশা খাতুন। গত ৯ জুলাই গভীর রাতে বন্যার পানি দ্রুত ঢুকে পড়ে তার ঘরে। অল্প সময়ের মধ্যেই তলিয়ে যায় পরিবারের মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয়। এক কাপড়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয় তাকে। সঙ্গে নিতে পারেননি কাপড়চোপড়, চাল কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এখন গ্রামের এক প্রতিবেশীর পাকা দালানে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।

পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছেঁড়া শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরে ছিলেন আশা খাতুন। আমাকে দেখে আঙুল তুলে দেখালেন, যেখানে একসময় তার ঘর ছিল, সেখানে এখন শুধু ঘোলা পানি। মাটির ঘরটি আর নেই। ভেসে গেছে ধানের গোলা, চাল ও হাঁস-মুরগি। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে পুকুরের মাছও।

গত ১২ জুলাই দুপুরে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে নিজের ভিটায় এসেছিলেন আশা খাতুন। হয়তো দেখতে চেয়েছিলেন, কিছু অবশিষ্ট আছে কি না। কিন্তু পানির কারণে কিছুই খুঁজে পাননি।

নিজের থেকেই তুলে ধরেন নিজের দুর্ভাগা জীবনের কথা। জানালেন, স্বামী আবদুর রাজ্জাক কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তিন মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে কোনোরকমে চলছিল তার সংসার। দুই ছেলে দিনমজুরের কাজ করেন। সারা জীবনের সঞ্চয়ে তৈরি মাটির ঘরটিই ছিল পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্বল। সেই ঘরও এখন নেই। 

নিজের ছেঁড়া শাড়ির দিকে তাকিয়ে আশা খাতুন বলেন, ‘এই এক কঅর (কাপড়) লই বাইর অই। আর কিছু আনিত ন পারি। চিড়া আর পানি খাই আছি। (এই এক কাপড় নিয়ে বের হয়েছি। আর কিছু নিতে পারিনি। চিড়া আর পানি খেয়ে আছি।)’

পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় সব কাঁচা রাস্তা পানির নিচে। মাঠ, পুকুর ও গাছপালা পানিতে একাকার। কোথাও মাটির দেয়াল ধসে পড়েছে, কোথাও ঘরের টিনের চালা পানির ওপরে দেখা যাচ্ছে। ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিসপত্র খুঁজছেন, কেউ কাদা সরাচ্ছেন। অনেকেই এখনো আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে রয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ি ঢলের পানি এত দ্রুত বেড়ে যায় যে ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি অনেকে। কেউ গবাদিপশু বাঁচাতে পারেননি, কেউ ঘরে রাখা চাল-ডাল। অনেক পুকুরের মাছও পানির সঙ্গে ভেসে গেছে।

মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত ৫ জুলাই শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে কয়েক দিনের মধ্যে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। 

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ৫ জুলাই সকাল ছয়টা থেকে ১১ জুলাই বিকাল তিনটা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১ হাজার ৩৫৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয় ১৫১ দশমিক ৭ মিলিমিটার। পরবর্তী দুই থেকে তিন দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা ছিল।

এই বৃষ্টির বড় ধাক্কা লাগে বাঁশখালীতে। ৬ জুলাই থেকে উপজেলার বাহারছড়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, খানখানাবাদ, গণ্ডামারা, কাথারিয়া, বৈলছড়ি ও ছনুয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। কোথাও কোথাও প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কয়েক দিন পর পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও ১২ জুলাইয়ের বৃষ্টিতে আবার কিছু এলাকায় পানি বাড়ছিল।

আশা খাতুনের নিজের ঘরে ফেরার সুযোগ তখনো হয়নি। সামনে কীভাবে সংসার চালাবেন, কোথায় থাকবেন, কীভাবে নতুন করে ঘর তুলবেন—এসব প্রশ্নের উত্তরও তার জানা নেই। বৃষ্টির বিরতি ও আবার পানি বাড়ার অনিশ্চয়তার মধ্যে তিনি বলেন, ‘ঝড় থামে, আবার শুরু অয়। আল্লাহ জানে, আর কত দিন এই কষ্ট থাইব।’

আশা খাতুনের অভিজ্ঞতা দেখায়, বন্যার ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়া বা সম্পদ হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ঘর হারানোর সঙ্গে হারিয়ে যায় নিরাপদে থাকার জায়গা, সঞ্চিত সম্পদ ও আগামী দিনের নিশ্চয়তা। পানি নেমে যাওয়ার পরও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ আশ্রয়, খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জীবিকা ফিরিয়ে পাওয়ার প্রশ্ন থেকে যায়। তাদের পুনরুদ্ধারের পথ কতটা সহজ হবে, তা নির্ভর করে জরুরি সহায়তা এবং পরবর্তী পুনর্বাসনের ওপরও।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  আর নাই   বন্যা   বাঁশখালী  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

ফিচার- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close