ব্রহ্মপুত্র নদের বুকের বিস্তীর্ণ বালুচর। দূর থেকে তাকালে মনে হয় সাদা ফুলের ঢেউ আছড়ে পড়ছে চরের ওপর। শরতের বাতাসে দুলছে সারি সারি কাশফুল। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের চর মনতলায় এখন এমনই দৃশ্য। মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের এ চরে যেতে হয় নৌকায়। একসময় যেখানে ছিল ধুধু বালুচর, ফসল ফলানোর সুযোগ ছিল খুবই সীমিত, সেই জমিই এখন স্থানীয় কৃষকদের জন্য বাড়তি আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
চরের কৃষকদের কাছে কাশবন এখন অনেকটা বিনা খরচের ফসল। বীজ বোনা, সার দেওয়া, কীটনাশক প্রয়োগ কিংবা নিয়মিত সেচের প্রয়োজন হয় না। নদীর বালুচরে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় কাশ। কয়েক মাস পর পরিপক্ব হলে শুধু শ্রমিক দিয়ে কেটে সংগ্রহ করতে হয়। এরপর আঁটি বেঁধে তা বিক্রি করা হয় দেশের বিভিন্ন পানচাষ এলাকায়। ফলে অনাবাদি ও চাষের অনুপযোগী চরজমি থেকেও আয় করছেন কৃষকেরা।
চরের কৃষকরা জানান, নদীভাঙন ও বন্যার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা চরবাসীর কাছে কাশ এখন শুধু শরতের সাদা ফুল নয়। একসময় যে বালুচরকে কৃষকেরা বোঝা মনে করতেন, সেই জমিই কয়েক মাসের জন্য হয়ে উঠছে আয়ের ক্ষেত্র। কোনো বীজ, সার কিংবা সেচ ছাড়াই জন্ম নেওয়া কাশ কাটার মৌসুমে চরজুড়ে তৈরি করছে কর্মসংস্থান ও বেচাকেনার ব্যস্ততা। প্রকৃতির নিজের মতো করে বেড়ে ওঠা এই উদ্ভিদই এখন অনেক চরকৃষকের সংসারে বাড়তি আয়ের ‘সাদা ফসল’ হয়ে উঠেছে।
কুড়িগ্রামে চিলমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে চর মনতলার কৃষক বেলাল হোসেন (৬৫), মোসলেম উদ্দিন (৭০), আজগর আলী (৫৫), সুরত আলী (৫০) ও মহির উদ্দিন (৬০) সবার অভিজ্ঞতাই প্রায় একই। কৃষিকাজে বন্যা, নদীভাঙন, খরা ও বাজারদরের নানা অনিশ্চয়তা থাকলেও কাশবন তাদের জন্য তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত একটি আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
বেলাল হোসেন জানান, তার চার একর জমির মধ্যে দুই একর এখন ধুধু বালুচর। সেখানে প্রাকৃতিকভাবে জন্মেছে কাশফুল।
তার ভাষায়, কাশের জন্য কোনো সার, কীটনাশক বা আলাদা পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। শুধু কাটার সময় শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়। প্রতি একরে কাশ কাটা ও সংগ্রহে খরচ হয় প্রায় ৪৫-৫০ হাজার টাকা।
তিনি জানান, গত বছর এক একর জমি থেকে প্রায় ৩০ হাজার আঁটি কাশ সংগ্রহ করেছিলেন। প্রতি আঁটি ৮-১০ টাকা দরে বিক্রি করে দুই লাখ ৬৫ হাজার টাকা পেয়েছিলেন।
বেলাল বলেন, ‘অন্য ফসল করতে গেলে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের পেছনে অনেক টাকা খরচ করতে হয়। কাশে সেই খরচ নেই তাই চরের বালু মাটিকে কাশ আমাদের জন্য আশীর্বাদ।’
সুরত আলীর চার বিঘা বালুচর জমিতেও এবার কাশের বাগান হয়েছে। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে তিনি কাশ কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা নৌকা ও ট্রাক নিয়ে চর এলাকায় আসেন। পানচাষে কাশের ব্যাপক ব্যবহার থাকায় এর চাহিদা রয়েছে। ফলে মৌসুমে ভালো দাম পাওয়া যায়।’
কুড়িগ্রামের পাশাপাশি লালমনিরহাটের ধরলা নদীর চরাঞ্চলেও কাশ এখন কৃষকদের আয়ের অন্যতম উৎস।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার চর ফলিমারীর কৃষক মেছের আলী (৬৫) জানান, গত বছর দুই বিঘা জমির কাশ বিক্রি করে তিনি এক লাখ ৪৫ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। কাশ কাটা ও সংগ্রহে শুধু খরচ হয়েছিল ৪০ হাজার টাকা। এবার তার চার বিঘা চরের জমিতে কাশ জন্মেছে। এরই মধ্যে একজন ব্যবসায়ী তাকে ৪০ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছেন।
মেছের আলী বলেন,‘আগে এ সব জমি পড়ে থাকত। এখন কাশ জন্মানোর কারণে এ সব চরের জমি থেকেই আয় হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা আগেই টাকা দিয়ে কাশ কিনে নেন। এতে আমাদের ঝুঁকিও কমে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছরই কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার ও ধরলা নদীর চরাঞ্চলে তিন শতাধিক কাশবাগান দেখা যায়। প্রতিটি বাগান ৫-২০ একর পর্যন্ত বিস্তৃত। এ সব চর থেকে প্রতিবছর আনুমানিক ৯-১০ কোটি আঁটি কাশ উৎপাদিত হয়। নভেম্বরের মাঝামাঝি কাশ কাটা শুরু হয়ে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে বিক্রি।
চরাঞ্চলে উৎপাদিত কাশ নৌকা ও ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন পানচাষ এলাকায় পাঠানো হয়। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে পান চাষ হয়, সেখানে কাশের চাহিদা বেশি। পানবরজ তৈরির পাশাপাশি বরজের কাঠামো ও ছাউনি তৈরিতে কাশ ব্যবহার করা হয়। কাশকে কেন্দ্র করে চরাঞ্চলে গড়ে উঠে মৌসুমি ব্যবসা, পরিবহন ও শ্রমের একটি আলাদা বাজার।
চিলমারীর জোড়গাছ এলাকার কাশ ব্যবসায়ী হাবিুর রহমান জানান, প্রতিবছর নভেম্বর মাসে ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার ও ধরলা নদীপাড়ে কমপক্ষে ৩০টি স্থানে কাশ বিক্রির জন্য অস্থায়ী বাজার গড়ে উঠে। ফেব্রুয়ারি মাস পযর্ন্ত কাশ কেনাবেচা হয়। নদীপাড়ে এ সব কাশের হাটে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকার কাশের ব্যবসা হয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক কৃষককে মৌসুমের শুরুতেই অগ্রিম টাকা দিই। পরে কাশ কেটে আমাদের কাছে বিক্রি করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা আমাদের কাছ থেকে কিংবা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কাশ কিনে নিয়ে যান।’
চরাঞ্চলের অর্থনীতিতে কাশের এ অবদানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু। তার মতে, কাশ এখন অনেকটা অঘোষিতভাবে চরাঞ্চলের অন্যতম অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে। কৃষি বিভাগের আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থাকলেও এর সঙ্গে বিপুল সংখ্যক কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও পরিবহন শ্রমিকের জীবিকা জড়িয়ে আছে।
তিনি বলেন, ‘একসময় কাশের তেমন বাজারমূল্য ছিল না। গত ১০-১২ বছরে পানচাষে এর ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় চাহিদাও অনেক বেড়েছে। ফলে চরাঞ্চলের অনাবাদি জমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো কাশ এখন কৃষকদের জন্য অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে।’
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু ফাত্তাহ মো. রওশান কবির বলেন, ‘অনেক চরজমি বছরের বড় একটি সময় কৃষিকাজের অনুপযোগী বা পরিত্যক্ত থাকে। এ সব জমিতে প্রাকৃতিকভাবেই কাশ জন্মে। সাধারণত জুন-জুলাইয়ের দিকে কাশের বৃদ্ধি শুরু হয় এবং নভেম্বরের মধ্যে তা পরিপক্ব হয়ে ওঠে।’
তিনি বলেন, ‘কাশফুল প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি চরাঞ্চলের মানুষের জীবনেও অর্থনৈতিক স্বস্তি নিয়ে আসছে। অনাবাদি জমি থেকে কৃষকের আয় হচ্ছে এটি চরাঞ্চলের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিক।’
কেকে/এআই