সাতক্ষীরার জলাবদ্ধ পতিত জমিতে সম্ভাবনাময় ফসলে পরিণত হচ্ছে পানি সিংড়া। বর্ষায় জলাবদ্ধতার কারণে যেসব জমিতে আমন ধানের আবাদ করা যায় না, সেসব জমিতে পানি সিংড়া চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন কৃষকেরা। গত বছর জেলায় ১৬৪ হেক্টর জমিতে এ ফলের চাষ হলেও এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫০ হেক্টরে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর প্রায় ১০০ কোটি টাকার পানি সিংড়া উৎপাদন ও বেচাকেনার আশা করছে কৃষি বিভাগ।
সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘদিন জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বিশেষ করে আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টিতে অনেক জমি পানির নিচে থাকায় সেখানে আমন ধানের চাষ সম্ভব হয় না। এসব জমি পতিত ফেলে না রেখে কয়েক বছর ধরে পানি সিংড়া চাষ করছেন কৃষকেরা। ধীরে ধীরে এ চাষ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের এলাকাতেও।
কৃষকেরা জানান, জলাবদ্ধ জমিতে ধান চাষ করা কঠিন হওয়ায় তারা বিকল্প হিসেবে পানি সিংড়া চাষ করছেন। প্রতি বিঘা জমিতে এ ফল উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৮০-৯০ হাজার টাকা। বিপরীতে ভালো ফলন ও বাজারদর পাওয়া গেলে প্রতি বিঘায় প্রায় দেড় লাখ টাকার ফল বিক্রি করা সম্ভব। শীতকালীন ফল হলেও আগাম চাষের মাধ্যমে বাজারে আগে ফল সরবরাহের চেষ্টা করছেন তারা।
বর্তমানে ক্ষেত থেকেই প্রতি মণ পানি সিংড়া ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাভজনক হওয়ায় এলাকার কৃষকদের মধ্যে এ ফল চাষের আগ্রহ বাড়ছে।
পানি সিংড়া চাষের বিস্তারে গ্রামীণ কর্মসংস্থানেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় এ ফলের জমিতে পরিচর্যা ও ফল সংগ্রহের জন্য শ্রমিকের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকেরা এ কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
ক্ষেতে কাজ করা শ্রমিকেরা জানান, সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কাজ করে তাঁরা ৪০০ টাকা মজুরি পান। এ আয় দিয়ে তাঁরা নিজেদের ও পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে সহায়তা করছেন।
এদিকে পানি সিংড়ার ব্যবসায়ীরাও এ ফলের বাণিজ্যে যুক্ত হয়েছেন। তারা ক্ষেত থেকে প্রতি মণ প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকায় কিনে বাজারে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি করছেন। পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ বাদ দিয়েও লাভ থাকায় এ ব্যবসায় তাদের আগ্রহ বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সাতক্ষীরার অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ বলেন, ‘পানি সিংড়া চাষের মাধ্যমে জলাবদ্ধ জমি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষিশ্রমিক, বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা পড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পানি সিংড়া অত্যন্ত পুষ্টিকর ফল। এটি মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণেও ভূমিকা রাখতে পারে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার পানি সিংড়া বেচাকেনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
কৃষিতে বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত সাতক্ষীরায় ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু ও লবণাক্ততার কারণে চাষাবাদে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে প্রতিকূল পরিবেশে বিকল্প ফসল চাষের মাধ্যমে কৃষকেরা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছেন। জলাবদ্ধ জমিতে পানি সিংড়ার আবাদ সেই সম্ভাবনাকে আরও প্রসারিত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
কেকে/সাশ