সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬,
৩ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন      ● আগামী ১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু      ● ওসমানী উদ্যানে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী       ● গণবিক্ষোভে অস্থির ফ্রান্স, গ্রেপ্তার ২৪০০—ম্যাক্রোঁর কঠোর বার্তা      ● দুপুরে পদত্যাগের ঘোষণা দিচ্ছেন ইশরাক      ● আজ মহাঅষ্টমী: কুমারী পূজা ও সন্ধিপূজায় মুখর দুর্গোৎসব      ● মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
দেশে কেন হাইটেক ডেটা সেন্টারে সরকারের বিনিয়োগ এখনই জরুরি!
প্রফেসর ড. শাহ জে মিয়া
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:১৪ পিএম
প্রফেসর ড. শাহ জে মিয়া

প্রফেসর ড. শাহ জে মিয়া

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে আমরা যত কথা বলি, তার প্রায় সবটাই দাঁড়িয়ে আছে এমন একটি জিনিসের ওপর, যেটি কেউ কখনো দেখে না বা বোঝা যায় না। সেটি হলো ডেটা বা তথ্য এবং যে জায়গায় ডেটা বা তথ্য সংরক্ষণ করা হয় তাকে বলা হয় ডেটা সেন্টার। আমরা যখন বলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যাপসের সাহায্যে দেশের কৃষক মোবাইলে সঠিক পরামর্শ পাবেন, কিংবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগ নির্ণয়ে মানসম্মত সহায়তা পাওয়া যাবে, কিংবা সরকারি সেবা ঘরে বসে মিলবে, তখন আমরা আসলে ধরে নিচ্ছি যে এসবের পেছনে কোথাও একটি যন্ত্রঘর আছে যেখানে তথ্য বা ডেটার হিসাবটি হচ্ছে। 

আজকের এই লেখায় আমি সেই অদৃশ্য ভিত্তিটি নিয়েই কথা বলতে চাই এবং শুরুতেই আমার সিদ্ধান্তটি বলে রাখি- বাংলাদেশে উচ্চক্ষমতার ডেটা সেন্টারে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এখন আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা হওয়া উচিৎ নয়, এটি এই মুহূর্তের একটি সঠিক সিদ্ধান্ত।

এখানে ছোট্ট করে ডেটা সেন্টার জিনিসটি কি, বলে রাখা উচিত। সহজ ভাষায় এটি একটি ভবন, যেখানে সারি সারি তাকে কম্পিউটার সাজানো থাকে, আর সেগুলো দিনরাত চলে। কিন্তু আজকের এআইয়ের জন্য যে ডেটা সেন্টার লাগে, সেটি পুরোনো ধাঁচের ডেটা যন্ত্রঘর নয়, সেটি কার্যত ভিন্ন একটি প্রাণীর মতো বলা যায়। পার্থক্যটি বিদ্যুতের ব্যাবহারে। আগের যুগের একটি তাক, যাকে বলা হয় র্যা ক, যা চলত কয়েক কিলোওয়াট বিদ্যুতে। এআইয়ের জন্য তৈরি আজকের একটি র্যাক টানে ১২০ থেকে ১৩২ কিলোওয়াট পর্যন্ত, আর আগামী বছরগুলোতে আসতে যাওয়া প্রজন্মের জন্য সংখ্যাটি আরও কয়েক গুণ বেশি হবে বলে নির্মাতারা জানিয়েছেন। যাহোক, তো এই একটি সংখ্যা বদলে যাওয়াতেই গোটা ডেটা সেন্টার স্থাপত্য বদলে যেতে বাধ্য।

কেন বদলায়, সেটি আসুন একটু বুঝে নিই। এত বিদ্যুৎ মানেই এত তাপ, আর সেই তাপ পাখা বা শীতাতপ যন্ত্র দিয়ে সরানো যায় না। বাতাস দিয়ে ঠান্ডা রাখার সীমা র্যা কপ্রতি ৪০ কিলোওয়াটের আশপাশেই শেষ হয়ে যায়। তাই আজকের ব্যবস্থায় সরাসরি ইলেকট্রনিক চিপের গায়ে তরল চালিয়ে তাপ সরানো হয়, যাকে বলে লিকুইড কুলিং বা তরল শীতলীকরণ। এর ফলও মাপা যায় একটি সহজ হিসাবে, যার নাম ‘পিইউই’। এই হিসাবে ১.০ মানে প্রতিটি ইউনিট বিদ্যুৎ সরাসরি কম্পিউটারের কাজে লাগছে, আর ১.৮ মানে প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ কেবল ঘর ঠান্ডা রাখতেই পুড়ছে। বাতাসে ঠান্ডা করা পুরোনো ব্যবস্থার পিইউই সাধারণত ১.৪ থেকে ১.৮, আর তরল শীতলীকরণে তা নেমে আসে ১.০৫ থেকে ১.১৫’-এর ঘরে। আমাদের মতো বিদ্যুৎ-সংকটের দেশে এই পার্থক্যটি নিছক কারিগরি কৌতূহল নয়, এটি সরাসরি টাকার অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব।

আসলেই দুঃখ প্রকাশ না করে পাচ্ছি না, এসব ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাপার সবার সামনে নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু বাধ্য হচ্ছি এগুলি নিয়ে আসতে। যাহোক, শীতলীকরণের পাশাপাশি তৃতীয় আরেকটি স্তরের কথা না বললে আমার কথা অসম্পূর্ণ থাকে, সেটি হলো সংযোগ। ডেটা সেন্টার যত বড় ও যত আধুনিকই হোক, তার সাথে যদি দ্রুতগতির ফাইবার (ক্যাবলে বা তার এর মাধম্যে সংযোগ) সংযোগ না থাকে, তবে সেটি কার্যত একটি তালাবন্ধ গুদাম। দেশের ভেতরে প্রতিটি বিভাগীয় শহর পর্যন্ত উচ্চক্ষমতার ফাইবার, আর দেশের বাইরে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ, এই দুটি ছাড়া কোনো ডেটা সেন্টার তার সক্ষমতার পুরোটা দিতে পারে না। আমি বিষয়টি আলাদা করে বলছি এই কারণে যে, পরে আমি যে আঞ্চলিক কাঠামোর প্রস্তাব করব আজকের এই আলোচনায়, তার গোটা ভিত্তিই এই সংযোগ। ফাইবার সংযোগ নেটওয়ার্ক এই বিনিয়োগের একেবারে ভিতরের অংশ।

এবার আসি খরচের প্রশ্নে, কারণ সিদ্ধান্ত নিতে হলে অঙ্কটি জানা চাই। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জেএলএলের ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, কেবল ভবন ও মৌলিক অবকাঠামো দাঁড় করাতে বিশ্বে গড়ে খরচ পড়ছে প্রতি মেগাওয়াটে প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ ডলার, যা ২০২০ সালে ছিল ৭৭ লাখ ডলার। খরচ দেশভেদে আলাদা: সিঙ্গাপুরে প্রতি মেগাওয়াটে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ, আর ভারতে প্রায় ৬৫ লাখ ডলার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের উপযোগী করে বানাতে গেলে এই খরচ বেড়ে প্রতি মেগাওয়াটে দেড় থেকে আড়াই কোটি ডলারে দাঁড়ায়। আর তার ভেতরে জিপিইউ নামের বিশেষ প্রসেসর ও নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি ধরলে সব মিলিয়ে হিসাব পৌঁছায় ৩ থেকে ৪ কোটি ডলারে। এখানে একটু বোঝার মতো আরেকটি ব্যাপার হলো, মোট খরচের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই চলে যায় কেবল বিদ্যুৎ-অবকাঠামোয়। অর্থাৎ ডেটা সেন্টার আসলে কম্পিউটারের প্রকল্প নয়, এটি অনেকখানি অংশে বিদ্যুতের প্রকল্প।

ডেটা সেন্টার নির্মাণে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলি কিন্তু বসে নেই। এখানেই আমি সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। মালয়েশিয়া তাদের ২০২৬ সালের বাজেটে সার্বভৌম এআই ক্লাউডের জন্য প্রায় ২০০ কোটি রিঙ্গিত বরাদ্দ রেখেছে, এবং জোহর রাজ্যের কুলাইয়ে তাদের প্রথম সার্বভৌম এআই স্থাপনাটি ২০২৫ সালের অক্টোবরেই চালু হয়ে গেছে। ভারত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ৪৫ হাজারেরও বেশি জিপিইউ গবেষক ও ডেটা সেন্টার উদ্যোক্তাদের জন্য উন্মুক্ত করেছে, আর বেসরকারি খাতে আদানি গোষ্ঠী ২০৩৫ সাল নাগাদ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎনির্ভর এআই অবকাঠামোয় ১০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়াও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই পথে হাঁটছে। এখানে ডেটা সেন্টার নির্মাণে ‘সার্বভৌম এআই’ কথাটির অর্থ সহজ: নিজের দেশের তথ্য নিজের মাটিতে রেখে, নিজের ভাষা ও প্রয়োজনের জন্য নিজের সক্ষমতা গড়ে তোলা। আমি মনে করি এটা সবাইকে বুঝানো আমার জন্য খুব দরকারি। 

গণমাধ্যম ও বাজার গবেষণায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কালিয়াকৈরে অবস্থিত আমাদের জাতীয় ডেটা সেন্টারের ক্ষমতা প্রায় ৪ মেগাওয়াট, আর গোটা দেশের স্থাপিত ক্ষমতা ২০২৫ সালে ছিল প্রায় ২৩ মেগাওয়াট। অন্যদিকে একই সময়ে কেবল আর্থিক খাতেরই প্রয়োজন দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১০০ মেগাওয়াট, অথচ তৃতীয় পক্ষের হাতে থাকা ক্ষমতা ৩০ মেগাওয়াটের মতো, অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ৭০ মেগাওয়াট। আগেই আমরা দেখেছি, আধুনিক একটি এআই ডেটা সেন্টার স্থাপনা একাই ১০০ থেকে কয়েকশ মেগাওয়াট চায়। অর্থাৎ পুরো দেশের আজকের সক্ষমতা মিলিয়েও একটি আন্তর্জাতিক মানের এআই স্থাপনার সমান হয় না। এটিই আমাদের প্রকৃত অবস্থান, এবং এটি লুকিয়ে রেখে কোনো লাভ নেই।

এবার আসুন চাহিদার দিকটিও দেখে নিই, কারণ এটি স্থির নয়, বাড়ছে। পরিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক সাংবাদিকতার একটি অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, দেশে এখনই সুপ্ত চাহিদা প্রায় ২০০ মেগাওয়াট, আর ২০৩০ সাল নাগাদ তা ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ আজ যে ঘাটতি সত্তর মেগাওয়াটের, কয়েক বছরের মধ্যেই তা কয়েক গুণ হবে। বিনিয়োগের আগ্রহও যে নেই তা নয়; গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে একটি উন্নত মানের এআই ডেটা সেন্টারে প্রায় ২০০ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।  যার প্রথম পর্যায়ে আগামী দুই বছরে ৩০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। আমি বলতে চাই, আগ্রহ আছে এবং চাহিদাও আছে; রাষ্ট্রের কাজ এখন অপেক্ষা করা নয়, বরং এই আগ্রহকে একটি জাতীয় নকশার ভেতরে বসিয়ে দেওয়া। যাতে বিনিয়োগ এলে তা বিক্ষিপ্তভাবে না এসে পরিকল্পিতভাবে আসে।

তবে কেবল ক্ষমতা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, এবং এই শিক্ষাটি আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই নেওয়া দরকার। কালিয়াকৈরের জাতীয় ডেটা সেন্টারটি ২০১৯ সালে চালু হয়েছিল এবং এটি আন্তর্জাতিক মানের সর্বোচ্চ শ্রেণির সনদও পেয়েছে। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পটির পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১,৫৯৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ১,১৯৯ কোটি টাকাই চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণ, অথচ স্থাপনাটি আশানুরূপ বাণিজ্যিক ব্যবহার কখনো পায়নি। আমি মনে করি এখান থেকে একটি স্পষ্ট শিক্ষা নেওয়ার আছে। ভবন তুললেই অবকাঠামো হয় না। সনদ অর্জন আর সেবা বিক্রি এক জিনিস নয়। আর বিদেশি ঋণে বানানো যন্ত্রঘর যদি খালি পড়ে থাকে, তবে সেটি সম্পদ নয়, দায়।

বিদ্যুতের পাশাপাশি আরেকটি খরচের কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। যেটি নিয়ে আলোচনা প্রায় হয়ই না, তা হলো পানি। বড় ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি লাগে। আর আমাদের দেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। তাই আমি মনে করি, অনুমোদনের শর্তেই পানি ব্যবহারের হিসাব ও সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত, যেমনটি বিদ্যুতের ক্ষেত্রে করা দরকার। এর সাথে যুক্ত আছে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের প্রশ্ন। দেশে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে স্থাপিত ক্ষমতা এখন প্রায় ১,৫৫০ মেগাওয়াট, যার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ প্রায় ১,২৫৬ মেগাওয়াট। সংখ্যাটি ছোট এবং সেটিই আমার যুক্তি: ডেটা সেন্টারের মতো একটি বিশাল ও নিশ্চিত ক্রেতা যদি শুরু থেকেই নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য থাকে, তাহলে সেই চাহিদাই আমাদের সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ খাতকে বড় হতে সাহায্য করবে। অর্থাৎ একটি শর্ত দুটি সমস্যার সমাধানে কাজে লাগতে পারে।

এখন আমি আমার মূল প্রস্তাবনায় আসি, কারণ সমালোচনা করা সহজ, কাঠামো দেওয়া কঠিন। আমি মনে করি বাংলাদেশের জন্য একটিমাত্র বিশাল ডেটা সেন্টার বানানোর পথ সঠিক নয়। তার বদলে দরকার প্রতিটি অঞ্চলে একটি করে অপেক্ষাকৃত ছোট কেন্দ্র, অর্থাৎ আঞ্চলিক ক্লাস্টার, আর সেগুলোকে যুক্ত করতে পারে একটি কেন্দ্রীয় ডেটা গ্রিড। এখানে গ্রিড কথাটি বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডের মতোই ভাবা যায়। আলাদা আলাদা কেন্দ্র নিজের এলাকার কাজ সামলাবে, কিন্তু প্রয়োজনে একে অন্যের সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবে। আর একটি বসে গেলে অন্যরা ভার তুলে নেবে।

এই কাঠামোর পক্ষে আমার চারটি যুক্তি আছে। প্রথমত, দূরত্ব। তথ্য যত দূর থেকে আসে, উত্তর পেতে তত দেরি হয়; রংপুরের একটি হাসপাতালের জন্য ঢাকার সার্ভার সবসময় সুবিধাজনক নয়। দ্বিতীয়ত, দুর্যোগ। আমরা বদ্বীপের দেশ, আর একটিমাত্র ভবনে সব তথ্য রাখা মানে একটিমাত্র বন্যা বা একটিমাত্র অগ্নিকাণ্ডের ওপর জাতীয় সেবা বাজি রাখা। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ। ছোট ছোট কেন্দ্র বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য উৎস কাজে লাগাতে পারে, একক বিশাল কেন্দ্র তা পারে না। চতুর্থত, উন্নয়ন। আঞ্চলিক কেন্দ্র মানে আঞ্চলিক কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক দক্ষতা, এবং রাজধানী ঢাকার ওপর চাপ কমানো।

এখন আমরা আসি সবচেয়ে ব্যবহারিক প্রশ্নে। এই ডেটা সেন্টার নির্মাণে অবকাঠামো দাঁড়ালে কারা উপকৃত হবেন। সরকার পাবে নিজের নাগরিক সেবার জন্য নির্ভরযোগ্য ভিত্তি, অর্থাৎ ভূমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার তথ্য নিজের দেশে, নিজের নিয়ন্ত্রণে। বেসরকারি খাত পাবে প্রতিযোগিতামূলক দামে গণনাশক্তি, যা ছাড়া আমাদের ব্যাংক, বিমা, ই-কমার্স ও স্টার্টআপগুলো বড় হতে পারে না। দেশে ও বিদেশে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থা পাবে এমন একটি জায়গা যেখানে তারা আইনসম্মতভাবে তথ্য রাখতে ও বিশ্লেষণ করতে পারবে, যা আজ অনেক আন্তর্জাতিক চুক্তির পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকেরা পাবেন সেই জিনিসটি যার অভাবে আজ বাংলা ভাষার এআইয়ের মডেল তৈরির কাজ এগোচ্ছে না। 

স্বাভাবিকভাবেই অনেকে প্রশ্ন করবেন, দেশে যেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার এত চাহিদা, সেখানে ডেটা সেন্টার যন্ত্রঘরের পেছনে হাজার কোটি টাকা কেন। প্রশ্নটি ন্যায্য এবং আমি একে উড়িয়ে দিতে চাই না। আমার উত্তর দুটি। প্রথমত, এটি ভোগ নয়, অবকাঠামো। সেতু বা বন্দরের মতোই এর ওপরে দাঁড়িয়ে অন্য সব খাত চলে, আর স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ডিজিটাল সেবাগুলোও এই ভিত্তি ছাড়া দাঁড়াতে পারে না। 

দ্বিতীয়ত, বিকল্পটি বিনামূল্যে নয়। আজ আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি ক্লাউড সেবার ভাড়া দিচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রায়, প্রতি মাসে, অনির্দিষ্টকাল ধরে, আর সেই সাথে আমাদের নাগরিকের তথ্য থাকছে অন্য দেশের আইনের অধীনে। অর্থাৎ প্রশ্নটি খরচ করব কি করব না তা নয়; প্রশ্নটি হলো ভাড়া দেব, নাকি নিজের সম্পদ গড়ব।

এই কাজের একটি দিক আমি বিশেষভাবে তুলে ধরতে চাই, সেটি হলো কর্মসংস্থান। একটি আধুনিক ডেটা সেন্টার কেবল কয়েকজন প্রহরী ও প্রকৌশলী চায় না। এর জন্য দরকার ডেটা সেন্টার অপারেশনস ইঞ্জিনিয়ার, কুলিং সিস্টেম টেকনিশিয়ান, নেটওয়ার্ক ও ফাইবার বিশেষজ্ঞ, সাইবার সিকিউরিটি ইঞ্জিনিয়ার, এনার্জি ম্যানেজমেন্ট অ্যানালিস্ট এবং এমএলঅপস ইঞ্জিনিয়ার। এসব পেশার নাম আজ থেকে দশ বছর আগে বাংলাদেশে কেউ উচ্চারণও করত না। যাহোক, বিএনপির ৩১ দফার ৩০তম দফায় তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান নিয়ে যে অঙ্গীকার রয়েছে, আমার বিবেচনায় এই খাতটি তার একটি সরাসরি ও পরিমাপযোগ্য প্রয়োগক্ষেত্র, কারণ এখানে কাজগুলো দেশেই থাকে, বিদেশে পাঠানো যায় না।

পুরো ডেটা সেন্টার বিষয়টিকে আমি একটি ছবির মধ্যে দাঁড় করাতে চাই। রংপুর কিংবা কক্সবাজারে একটি আঞ্চলিক কেন্দ্রে বসে একজন তরুণ প্রকৌশলী তাঁর এলাকার হাসপাতাল, ভূমি অফিস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেবা চালু রাখছেন; তার পাশের কক্ষে একজন গবেষক বাংলা ভাষার একটি মডেলকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, কারণ গণনাশক্তির জন্য তাকে আর বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে না; আর এই দুটি কাজই চলছে এমন একটি সংযোক গ্রিডের ওপর, যা দেশের আরও পাঁচটি অঞ্চলের সাথে যুক্ত। এই দৃশ্যটি কল্পনা নয়, এটি একটি সিদ্ধান্তের ফল, আর সিদ্ধান্তটি নেওয়ার সময় এখনই।

স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আশির দশকেই অনুধাবন করেছিলেন যে, বাস্তবসস্মত অবকাঠামো ছাড়া উন্নয়নের কথা বলা অর্থহীন। খাল খনন থেকে শুরু করে গ্রামীণ সড়ক ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা পর্যন্ত তিনি যে ধারা শুরু করেছিলেন, তার মূল কথাটি ছিল একটিই: মানুষের কাজের নিচে একটি শক্ত ভিত্তি দিতে হবে। একবিংশ শতাব্দীতে সেই ভিত্তির নতুন নাম গণনাশক্তি ও ডেটা সেন্টার নির্মাণে তথ্য-অবকাঠামো। দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে এগিয়ে আসা সেই ধারাবাহিকতা আজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ কর্মপরিকল্পনায় একটি সুসংহত রূপ পেয়েছে।

তাই আমি বারবার বলি, বিএনপি মানেই বাংলাদেশের মা, মাটি, মানুষের সাথে সম্পর্কিত একটি অত্যাধুনিক রাজনৈতিক সংগঠন। বিএনপি মানেই বাংলাদেশের আপামর জনগণ। ৩১ দফা কোনো অলীক স্বপ্ন নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ, আর সেই রোডম্যাপের প্রযুক্তি অধ্যায়টি বাস্তবায়নের প্রথম ইটটিই হলো এই অবকাঠামো। আমাদের লক্ষ্য একটি স্বনির্ভর, টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশ নিজের তথ্য নিজের মাটিতে রেখে, নিজের ভাষায় ও নিজের প্রয়োজনে সমাধান তৈরি করে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। পরবর্তী এই আঞ্চলিক ক্লাস্টার ও ডেটা গ্রিডের নকশা নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করব বলে আশা রাখছি। ধন্যবাদ সবাইকে।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রফেসর ড. শাহ জে মিয়া   হাইটেক ডেটা সেন্টার   সরকারের বিনিয়োগ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close