পড়ালেখা শেষ করে চাকরির পেছনে ছুটবেন, নাকি হাজারো তরুণের মতো বেকারত্বের অভিশাপ বইবেন?—এই চিন্তাকে পেছনে ফেলে নিজেদের পথ নিজেরাই বেছে নিয়েছেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার তিন তরুণ। চাকরির বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষায় দিন না গুনে, মাত্র ৫০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ২৭০ বর্গফুটের ছোট্ট ঘরে তারা শুরু করেছেন অয়েস্টার মাশরুমের চাষ।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৩ নম্বর শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের পশ্চিম ভাড়াউড়া গ্রামের তিন বন্ধু—সাখাওয়াত হোসেন (২৫), এমদাদুল হক মিলন (২৪) ও মো. তানিম মিয়া (২৪) নিজেদের শ্রম ও সীমিত পুঁজিকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছেন এই স্বপ্নের ডেরা।
জানা যায়, এমদাদুল হক মিলন মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। অন্য দুই সহযোদ্ধার মধ্যে মো. সাখাওয়াত হোসেন শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেছেন এবং মো. তানিম মিয়া অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর প্রতিকূলতার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি।
গরু-ছাগলের খামার থেকে মাশরুমের পথে :
উদ্যোক্তারা জানান, শুরুতে তাদের পরিকল্পনা ছিল একটি গবাদিপশুর খামার গড়ে তোলার। কিন্তু বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তেমন খামার করতে অন্তত ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার প্রয়োজন—যা জোগাড় করা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব ছিল।
পরবর্তী তাদের এক শিক্ষকের পরামর্শে কম খরচে ও সীমিত জায়গায় শুরু করার মতো উদ্যোগ হিসেবে তারা মাশরুম চাষ বেছে নেন। মাশরুম চাষের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকলেও তারা দমে যাননি। কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই ইউটিউব, চ্যাটজিপিটি ও গুগলে গবেষণা করে চাষাবাদের আদ্যোপান্ত শিখে নেন তারা।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন :
চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে টিনের ঘরে মাশরুম চাষ শুরু করেন তারা। শ্রীমঙ্গলের উষ্ণ আবহাওয়ায় মাশরুমের সঠিক পরিবেশ ধরে রাখা এক বড় চ্যালেঞ্জ।
স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ :
তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে ঘরে বসানো হয়েছে বায়ু নিষ্কাশন পাখা (এডজাস্ট ফ্যান) এবং স্বয়ংক্রিয় ওয়াটার স্প্রিংকলার (পানি ছিটানোর ব্যবস্থা)।
অ্যাপসের ব্যবহার : পুরো ঘরের লাইটিং, ফ্যান ও ওয়াটার স্প্রিংকলার মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
সফলতা ও বাজারজাতকরণ :
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে পশ্চিম ভাড়াউড়া গ্রামের সেই টিনের ঘরে গিয়ে দেখা যায়, দুই প্রান্তে দুই সারিতে ঝুলে রয়েছে সারি সারি মাশরুমের পলিব্যাগ। ইতোমধ্যেই প্রকল্প থেকে মাশরুম বিক্রি শুরু হয়েছে। বাজারে প্রতি কেজি মাশরুম পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা দরে এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে মিলছে ব্যাপক সাড়াও।
খামারের সার্বিক পরিকল্পনা নিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রথমে মাশরুম চাষের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ইচ্ছা ছিল গরু-ছাগলের খামার করার। কিন্তু মোটা অঙ্কের বাজেট না থাকায় সেই পথে এগোতে পারিনি। পরে এক স্যারের পরামর্শে স্বল্প বাজেটে মাশরুম চাষের কথা ভাবি। এরপর ইউটিউব, চ্যাটজিপিটি ও গুগলে অনুসন্ধান করে দেখি এটি বেশ লাভজনক এবং কম পুঁজিতেই সম্ভব। এখন পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। বাজারে চাহিদা ভালো থাকায় আমাদের মাশরুম বিক্রিও বেশ ভালো হচ্ছে। অল্প পুঁজি দিয়ে শুরু হলেও ভবিষ্যতে খামারটি বড় করে অন্যান্য বেকার তরুণদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার স্বপ্ন আছে আমাদের।’
মো. তানিম মিয়া বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমের কারণে আমাদের উৎপাদন একটু কম হচ্ছে। সরকারিভাবে যদি কুলিং সিস্টেমের সহযোগিতা পাই, তবে আমরা আরও বড় পরিসরে উৎপাদন বাড়াতে পারব এবং বেকার যুবকদের কাজের ব্যবস্থা করতে পারব।’
এলাকায় ব্যাপক সাড়া :
তিন তরুণের এই নতুন উদ্যোগ দেখতে ও চাষের পদ্ধতি জানতে প্রতিদিনই স্থানীয় বাসিন্দারা খামারে ভিড় করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা জমির আলী বলেন–চাকরির অপেক্ষায় না থেকে তরুণদের এমন প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। এরা সফল হলে এলাকার আরও অনেকে উদ্বুদ্ধ হবে। এলাকার তরুণ হাসান বলেন–আমার জীবনে প্রথমবার মাশরুম চাষ দেখলাম। খুবই ভালো লেগেছে, আমিও এমন কিছু করার চেষ্টা করব।
কৃষিবিদদের মতে, মাশরুম একটি ভোজ্য ছত্রাক যা সূর্যের আলো ছাড়াই ঘরের ভেতরের আবদ্ধ জায়গায় চাষ করা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক স্পন (বীজ), পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সঠিক নিয়ন্ত্রণ।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, ‘তরুণদের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। সঠিক কারিগরি জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ থাকলে মাশরুম চাষে ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সরকারি সহায়তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হবে।’
কেকে/এমএ