পুলিশের দায়িত্ব অপরাধ দমন, মাদক নির্মূল ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ সেই পুলিশ বাহিনীরই একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাড়িতে মাদক সেবন ও অবৈধ ডিজে পার্টি চলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকার পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১-এ অবস্থিত অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৮৪ জনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
উদ্ধার করা হয়েছে আইস, ইয়াবা, গাঁজা, কুশ, মদ, বিয়ার ও সিসাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। এ ঘটনায় ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে পুলিশ সদরদপ্তরের অন্য একটি শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাড়িতে এমন অভিযোগ ওঠায় বাহিনীর জবাবদিহি, তদারকি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা পুলিশের দায়িত্বের অংশ। ফলে যাদের দায়িত্ব সমাজকে মাদক ও অপরাধের বিস্তার থেকে রক্ষা করা, তাদেরই একজনের বাড়িতে এমন কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ডিবি সূত্রে জানা গেছে, ৩০০ ফিট এলাকার পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১-এ আবদুল্লাহ আল জহিরের একটি প্লট রয়েছে। সেখানে নির্মিত আড়াইতলা ভবনের পাঁচটি কক্ষ অনলাইন আবাসন ভাড়া দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হতো। অনলাইনে কক্ষ বুকিং করে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তরুণ-তরুণীরা সেখানে আসতেন।
পুলিশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই বাড়িতে ডিজে পার্টির আড়ালে মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছিল। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে অভিযান শুরু করে ডিবি। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুর পর্যন্ত চলা অভিযানে ৫৮ জন তরুণ ও ২৬ জন তরুণীসহ মোট ৮৪ জনকে আটক করা হয়। এ সময় বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য ও মাদক সেবনের আলামত উদ্ধার করা হয়। কয়েকটি গাড়িও জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির জানান, এয়ারবিএনবির মাধ্যমে কক্ষ ভাড়া নিয়ে সেখানে বিভিন্ন পার্টির আয়োজন করা হতো। এসব আয়োজন থেকে পাওয়া আয়ের একটি বড় অংশ বাড়ির মালিক আবদুল্লাহ আল জহির ও তার স্টাফরা পেতেন। বাড়িটির কার্যক্রম পরিচালনায় একজন হোস্ট ও একজন কো-হোস্ট যুক্ত ছিলেন। কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমকে আটক করা হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল জহির বাড়িটি ভাড়া দিয়েছিলেন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মাদক গ্রহণ ও অবৈধ ডিজে পার্টি চলার তথ্য পাওয়ায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় বিপুল পরিমাণ মদ, বিয়ার, সিসা ও সিনথেটিক মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।’
এ ঘটনার পর অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ সদরদপ্তরের অন্য একটি শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সই করা এক অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
অফিস আদেশ অনুযায়ী, সদরদপ্তরের রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখায় কর্মরত অতিরিক্ত ডিআইজি (সুপারনিউমারারি) আবদুল্লাহ আল জহিরকে সদরদপ্তর শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাড়িতে মাদক সেবন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবদুল্লাহ আল জহির। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, গত সোমবার একটি জন্মদিনের অনুষ্ঠানের জন্য বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। ভাড়া নেওয়ার সময় ভাড়াটিয়াদের বাড়ি ব্যবহারের নিয়মাবলি জানিয়ে দেওয়া হয়। নিয়ম ভঙ্গ করলে এক লাখ টাকা জরিমানার বিধানও রয়েছে। তার দাবি, বাড়িটি ভাড়া নেওয়া ব্যক্তিরা নিয়ম ভঙ্গ করেছেন। এ ঘটনায় তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৮৪ জনকে আটক ও মাদক উদ্ধারের ঘটনায় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল ডা. শফিকুর রহমান তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ থেকে করা এক পোস্টে তিনি এ ইস্যুতে সম্প্রতি এক পোস্টে লেখেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত একজন ডিআইজির মালিকানাধীন একটি বাড়ি থেকে অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকার দায়ে ৮৪ জন নারী-পুরুষকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। একই সঙ্গে বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ পণ্য (মাদক) উদ্ধার করা হয়েছে। এখান থেকেই বোঝা যায়, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটা অবনতি হয়েছে। দেশের সর্বত্র আইনশৃঙ্খলাবিরোধী ও অসামাজিক কার্যকলাপের পাশাপাশি চাঁদাবাজির মহোৎসব, ছিনতাই, লুণ্ঠন ও ডাকাতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।’
তিনি আরও লেখেন, ‘স্বয়ং পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাসায় এ ধরনের অপকর্ম সংঘটিত হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।’
কেকে/সাশ