আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সমঝোতা অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। বিষয়টি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে চলছে রাজনৈতিক বাহাস। সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে— জামায়াতে ইসলামী পতিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে। তবে এ অভিযোগের পর কড়া জবাব দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। প্রতিবাদ জানিয়েছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরেও রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জামায়াতে যুক্ত করে নেওয়ার একাধিক অভিযোগ সামনে আসার পর এ বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
সূত্রের দাবি, বিগত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়তে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাকর্মী ও প্রভাবশালীদের দলে টানার মাধ্যমে বিজয় অর্জনের চেষ্টা করছে দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন— আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা নতুন নয়। বিএনপি ও জামায়াত এক সময় আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে পাশাপাশি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্নে দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দলের অবস্থানেও দূরত্ব দেখা যাচ্ছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার রাজশাহীর জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অনুসারী ও বিরোধী দলের একটি অংশ মিলে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে। গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, দেশের বাইরে থেকে একটি রাজনৈতিক শক্তিকে অর্থ সরবরাহ করা হচ্ছে। সেই অর্থের সহায়তায় দেশের ভেতরে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কয়েকটি স্থানে কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সরকারের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ধরনের তৎপরতা সম্পর্কে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ লেবার পার্টির কার্যালয়ে দলটির ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ‘আপনার ওই সমস্ত গোয়েন্দা তথ্য ভুয়া। এর আগে আমাদের কাছে তথ্য আছে, দিল্লির সঙ্গে আপনাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।’
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনি কোন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করেন? যে গোয়েন্দা বাহিনী, যে সেটআপ আওয়ামী লীগ রেখে গিয়েছে, নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে জঙ্গি বানিয়ে যারা ক্রসফায়ারে দিয়েছে, রিমান্ডে-আয়নাঘরে নিয়েছে, সেই গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করে আপনি এখন বিরোধী দলের ওপরে দোষ চাপাবেন?’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যে গোয়েন্দা সংস্থা দেশের বিভিন্ন জেলায় দলটিকে মিছিল করতে সহায়তা করেছিল, সেই সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এখন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগ তোলা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে রাজনৈতিক ব্যর্থতা, অপরিপক্বতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাব বলেও আখ্যা দেন জামায়াতের এই নেতা।
একইদিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সমঝোতার অভিযোগ তোলেন। তার বক্তব্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায়, জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিএনপিতে পদায়নের বিষয় উঠে আসে। নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের বৈঠক এবং বিভিন্ন এলাকায় দুই দলের নেতাকর্মীদের যোগাযোগ নিয়েও অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিতর্কের মধ্যেই জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের একটি বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জামায়াতের আমিরের ‘মানুষকে জান্নাতে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেওয়া’ সংক্রান্ত বক্তব্যের সমালোচনা করেন।
রাশেদ খাঁন লেখেন, ‘আমি জানি না, জামায়াত মানুষকে কোন জান্নাতের পথ দেখাতে চায়?’ এরপর তিনি জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান, নির্বাচনের আগে বিদেশিদের সঙ্গে বৈঠক, শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন, জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি এবং ধর্মীয় বক্তব্য নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের বিচার না চেয়ে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে জামায়াত জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
অপরদিকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরদিন গতকাল বুধবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান অভিযোগের তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও শুধু জনসভায় বক্তব্য দিয়ে বা জনগণকে সতর্ক করে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা জানতে চাই, প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?’
তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তন প্রতিরোধে দুটি কাজ জরুরি ছিল। স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা এবং স্বৈরতন্ত্র রোধে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা। কিন্তু সরকার কোনোটিই করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরির অভিযোগের পরও ব্যবস্থা না নেওয়ায় জাতি উদ্বিগ্ন বলেও মন্তব্য করেন ইসলামী আন্দোলনের এ নেতা।
কেকে/ এমএস