এক দেশে এক লোক ছিলেন- খুব সাধারণ, দেখতে তেমন কিছু নয়, কাপড়-চোপড়ও ছেঁড়া। নাম তার ঈশপ।
ছোটবেলায় তিনি দাস ছিলেন। অন্যের ঘরে কাজ করতেন, ঝাড়ু দিতেন, পানি আনতেন, ছাগল চরাতেন। তবু কখনো রাগ করতেন না। সারাক্ষণ কিছু না কিছু ভাবতেন।
যখন সবাই বিশ্রাম নিচ্ছে, ঈশপ তখন একটি পিঁপড়া দেখতেন। ভাবতেন, ‘এই ছোট্ট প্রাণীটা কত পরিশ্রমী! সারাদিন খাবার জোগাড় করে, শীতে যাতে কষ্ট না হয়।’ তারপরই তার মাথায় আসে গল্প- ‘পিঁপড়া আর ফড়িং’। ফড়িং গান গায়, পিঁপড়া কাজ করে। শেষে শীত আসে, ফড়িং ঠান্ডায় কাঁপে, পিঁপড়া হাসে- ‘এখন গান গাও ভাই!’
ঈশপের গল্পগুলো সহজ হলেও গভীর বুদ্ধিতে ভরা। গল্পে মানুষ থাকত, পশুপাখিও। শিয়াল ছিল চালাক, সিংহ রাজা, গাধা বোকা, আর কাক বুদ্ধিমান কিন্তু অহংকারী।
একবার এক ছেলে ভেড়া চরাতে গিয়ে চিৎকার করল- “বাঘ! বাঘ এসেছে!” সবাই দৌড়ে গেল। পরে দেখল কোথায় বাঘ? ছেলেটা হেসে গড়াগড়ি খায়। দু’বারের মতো মিথ্যা বলার পর যখন সত্যি বাঘ আসে, তখন চিৎকার করে সাহায্য চাইলেও কেউ বিশ্বাস করে না। এই গল্প থেকে মানুষ শিখল- মিথ্যা বেশি বললে সত্যও কেউ বিশ্বাস করে না।
ঈশপ মানুষকে শেখাতেন সহজভাবে- কোনো বড় উপদেশ নয়, গল্পের মধ্যে। তার গল্প থেকে আমরা শিখি, “লোভ করলে ক্ষতি হয়”, “পরিশ্রম করলে ফল মেলে”, “চালাকি করে বেশি দূর যাওয়া যায় না।”
দেখতে ঈশপ খুব সুন্দর ছিলেন না। খাটো, কালো, কিছুটা কুঁজো। তবু বুদ্ধি তার আলো ফেলে চারদিকে। কেউ তাকে অপমান করলে তিনি রাগ করতেন না। মুচকি হেসে বলতেন, “তোমার কথাটা মনে রাখলাম, একদিন গল্পে কাজে লাগাব।” সত্যিই, পরে সেই অপমানই গল্পে ঢুকিয়ে দিতেন। আর গল্প হয়ে উঠত চিরকালীন।
বলা হয়, ঈশপ আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিসে বাস করতেন। তখন মানুষ ঘোড়ায় চড়ে, পাথরের রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করত। কিন্তু ঈশপের গল্প এখনো পৃথিবীর সব দেশে বলা হয়। বাংলাদেশেও ছোট বাচ্চারা জানে- “কাক আর হাঁড়ির গল্প”, “শেয়াল আর আঙুরের গল্প”, “সিংহ আর ইঁদুরের গল্প”। এসবই ঈশপের সৃষ্টি।
ভাবো তো, এত বছর পেরিয়ে গেছে, কত লেখক এসেছেন-গেছেন, কিন্তু ঈশপের গল্প এখনো নতুন লাগে। কারণ তার গল্পে আছে মিষ্টি রস, শিক্ষা, আর মনের খোরাক।
যদি কোনো দিন ঈশপ হঠাৎ এসে হাজির হতেন, আর আমরা জিজ্ঞেস করতাম—
“আপনি কীভাবে এমন গল্প লিখতেন?”
তিনি হেসে বলতেন :
“আমি লিখিনি, শুধু দেখেছি। গাধা যখন মাল টানে, পিঁপড়া যখন দানা নেয়, শিয়াল যখন আঙুরের দিকে তাকিয়ে বলে- ‘এটা তো টক’- আমি শুধু সেই দৃশ্যটাকে গল্পে বুনে দিয়েছি।”
এই লোকটাই ছিলেন গল্পের রাজা ঈশপ।
কেকে/সাশ