রোনাসা যদিও কোনো সাম্রাজ্যের সম্রাটের কন্যা নয়। তবু শাহাজাদীর থেকে তার জীবনযাপন কিছু কম নয়। আইসাস হলো রাজ্যের সর্বাপেক্ষা অভিজাত অঞ্চল। ধনী,বিত্তশালী বণিকদের আবাস। এই ঐশ্বর্যমণ্ডিত ছোট সাম্রাজ্যটির এক সম্রাট, জেইসা। তার পরিবার, স্ত্রী ম্যাটসি এবং কন্যা রোনাসাকে নিয়ে।
রোনাসা ছোটবেলা থেকেই তার মাকে দেখছে, তিনি সর্বদা নিজের যত্ন, সাজসজ্জা নিয়েই ব্যস্ত ও উদার। সংসারের সকল কাজ দাস-দাসীই সম্পন্ন করে। ওই একই উপায়েই শুধু পেটে রাখাটুকু ছাড়া অবশিষ্ট সকল কাজ দাসীদের সহায়তায় তিনি করিয়ে যাচ্ছেন। একমাত্র মেয়েটির ব্যাপারেও। এ কারণেই হয়তো রোনাসার মাতৃস্নেহ জন্ম নিয়েছে দাসী, জোয়ার প্রতি। জোয়ার মমতা ও তার প্রতি অপ্রচুর নয়। এখন তার বয়স ষোলো তবু জোয়া আজও সেই দু’দিনের শিশুর মতো তাকে আগলে রাখতে পারলে বাঁচে। এই স্নেহে রোনাসা ও বিরক্ত নয় বরং আগ্রহী।
দাসী জোয়ার স্বামী মারা গেছেন, যখন সন্তান মাত্র দুমাস গর্ভে। সন্তানটি পূত্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করল।তার নাম দেওয়া হলো অ্যাড্রীহাই। এ নাম বাবাই স্থির করে দিয়েছিলেন। যত বয়স বাড়তে লাগলো অ্যাড্রীহাই বাবার সদৃশ সুঠাম সুপুরুষ হয়ে উঠলো।
স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারে এতটাই দুর্দশা আবির্ভূত হলো যে সে বাধ্য হলো দরজার বাইরে পা দিতে। কয়েক বাড়ি খোঁজ নিল, কাজ আছে কিনা। অবশেষে জেইসার বাড়িতে তার কাজের ব্যবস্থা হলো। তার দায়িত্ব ছিল মালিকের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর খেয়াল রাখা।
ম্যাটসির খেয়াল তিনি, কোনো অর্থ দিয়ে ক্রয় করা সেবিকার মতো করতেন না। যেন নিজের বোনের যত্ন নিচ্ছেন, এমন ছিল তার কর্তব্য পালন। আরও অনেক মহত্ত্ব নিশ্চয়ই তার মাঝে বিদ্যমান। তাই আজ অব্দি একটানা এত বছর ওই একই বাড়িতেই তিনি কর্মরত আছেন। কখনো কারো কালো মুখ দেখতে হয় নি,তার পরম দায়িত্বশীলতার কারণে।
জোয়া একদিন সকালে এলো। আর রোনাসাকে ঘুম থেকে তুলে চুল বেধে দিল। রোনাসা আজ তাকে বেশি খুশি দেখল। জিজ্ঞেস করল, কী তোমার এত খুশির কারণ। আমায় বলো। জোয়া তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, অ্যাড্রীহাই। আমার ছেলে। তুমি কী মনে করতে পারো তাকে? রোনাসার ছোটবেলার কথা মনে পড়ল। ব্যস্ত হয়ে বলল, হ্যাঁ তো। তোমার কী মনে পড়ে, আমি ও তোমার ছেলে দু’জনে মাঠে খেলতাম, বাগানে ফুল তুলতাম, ঘাটে ছোটাছুটি করতাম। আবার ঝগড়া ও করতাম। দুজনে কি কান্নাকাটি হয়ে যেত। সে যেন সেই দিন গুলোই চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। স্বপ্নাবিষ্টের মতো প্রশ্ন করল,কত বড় হয়েছে ও? হ্যা। আমি ও তো এত বছর ধরে তাকে দেখি না। এটা ভেবে আমি ও উদগ্রীব। উৎসাহী মা উত্তর দিল। আট বছর বয়সে বিদ্যার্জন, যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষার জন্য মা তাকে দূরে বিদ্যাগারে পাঠিয়েছিল। আজ পাঠ শেষ করে সে ফিরছে, পত্র পাঠিয়েছে। তাই মায়ের এত আনন্দ।
জোয়া রোনাসাকে সঙ্গে করে বন্দরে গেল। জাহাজ একে একে থামছে। কিনারে ভিড় করছে। মানুষ নামছে।জোয়া ও রোনাসার উদগ্রীব চোখ চারিদিকে অ্যাড্রীহাইকে খুঁজছে।সে মুহূর্তে একটা ছেলে সামনে এসে দাঁড়াল। তারা তাকে চিনল না। ছেলেটি হাসি মুখে জোয়াকে মা বলে ডাকল। আমার ছেলে, বলে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে তাকে বুকে চেপে ধরলেন। সে ও মায়ের গলা ধরে ক’ফোটা চোখের পানি ফেললেন।
তুমি সুস্থ আছো, বাবা? সাবধানে আসতে পেরেছ তো? কোনো অসুবিধা হয়নি তো? ছেলের মুখে, কপালে হাত বুলিয়ে মা বললেন। না মা,আমার কোনো অসুবিধা হয়নি। তোমার শরীর সুস্থ আছে তো? মা-ছেলের এসকল আলাপচারিতা যখন শেষ হলো অ্যাড্রীহাই এর চোখ গেল পাশে দণ্ডায়মান মেয়েটির দিকে। ইনি কে মা? সে তার মায়ের কাছে রোনাসার পরিচয় জানতে চাইল। ওকে চিনতে পারছ না? সে রোনাসা। তোমার ছোটবেলার খেলার সঙ্গী।
অ্যাড্রীহাই তার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে জিজ্ঞেস করল, ওহে রোনাসা, কেমন আছো তুমি? সে ও জবাবে হাসি মুখে হাত নাড়ল। আমি ভালো আছি। তুমি? আমি ও আছি।সে জবাব দিল। তুমি অনেক বড় হয়ে গেছো। পূর্ণাঙ্গ তরুণী। তুমি ও। শুনে রোনাসা ও বলল। সে সময়ে নতুন পরিচিত একজন বন্ধু কিছু দূর থেকে অ্যাড্রীহাইকে ডাকল। সে তার ব্যাগপত্র তার কাছেই রেখে এসেছে। অ্যাড্রীহাই মা ও রোনাসাকে নিয়ে তার কাছে গেল। একে অপরের সাথে তারা পরিচিত হলো একটা গাড়ি ভাড়া করে তারা গন্তব্যের দিকে রওয়ানা হলো। জ্যোৎস্নার মতো উজ্জ্বল মহিমাদীপ্ত রোনাসার তরুণ সৌন্দর্যের দিকে মাঝে মাঝেই থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করল, অ্যাড্রীহাই এর বন্ধুটি। কিন্তু সে অ্যাড্রীহাই আর তার মায়ের আলাপের দিকেই নিজেকে খেয়ালী রাখল। রোনাসাকে তার বাড়ি নামিয়ে দিয়ে তারা চলে গেল।
রোনাসার বাবা একটি পারিবারিক উৎসব আয়োজন করল। সেখানে জোয়া ও পূত্র অ্যাড্রীহাইকেও আমন্ত্রণ করা হলো। অ্যাড্রীহাই শিক্ষিত, সুশীল তরুণ। সেভাবেই নিজেকে প্রস্তুত করল। রোনাসাকে ও দাসীরা একেকজনের হাতের একেক দক্ষতায় অসাধারণ ও সুনিপুণ করে সজ্জিত করল। তারা যখন মুখোমুখি হলো একে অপরের প্রতি মুগ্ধ হয়ে গেল। একসাথে তারা হাতে হাত রেখে নাচ করল।
হঠাৎ আলো নিভে গেলে অ্যাড্রীহাই রোনাসাকে হাত ধরে বাইরে নিয়ে গেল। রোনাসা ও কোনো প্রশ্ন না করে তার সঙ্গে চলল। তারা ফুল বাগানের পাশের দীঘির পাড়ে গেল। দুজনেই থামল। নিশ্চুপ চোখে চেয়ে অন্য হাতে অ্যাড্রীহাই তার আরেকটি হাত ধরল। রোনাসা ও স্থির চোখে চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। অ্যাড্রীহাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ও আমার রোনাসা। তুমি দিনে দিনে এক অপূর্ব যুবতী হয়ে উঠেছ। আমার দুর্ভাগ্য তাই তোমার এ সৌন্দর্যের বিকাশ স্বচক্ষে দেখার সুযোগ ঘটে নি। তবে আবার সৌভাগ্য ও বলা যায়, যাকে শুধু এত বছর মনের দর্পণে এঁকেছি, তাকে এত দীর্ঘ সময় পর দেখে মন শীতল করতে পারলাম। আমি জানি না, আমার ব্যাপারে কি তোমার ভাবনা। তবে বিশ্বাস করো, শুধু তোমার কারণে অন্য কোন সুন্দরীর প্রেমে আমি পড়তে পারিনি।
সে থামল। আমার বলা শেষ। তোমার কথা জানাও। তবে মনের কথায় বোলো। আর খুবই সামান্য সময় রোনাসা তার চোখে চোখ রাখতে পারল। তারপর চোখ নামিয়ে নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অ্যাড্রীহাই যখন বিষন্ন মনে তার হাত ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে গেলো সে তার হাত টেনে ধরে তাকে সজোরে জড়িয়ে ধরল।বলল,আমি ও তোমাকে ভালোবাসি।দুজনের চুম্বনের এক মনোরম ছায়া দীঘির জ্যোৎস্নাশোভিত পানির ওপর পড়ল। রোনাসাকে পছন্দ করে ও বিয়ে করতে চায় তার বাবার ধনকুবের বন্ধুর ছেলে, পিতাস।
কিন্তু রোনাসা তার সাথে হতেই চায় না। কখনো যদি তার সঙ্গে থেকে থাকে, মুক্তির জন্য হাসফাস করতে থাকে। অনেক সময় পিতাসকে প্রত্যাখ্যান করে অ্যাড্রীহাই এর প্রস্তাব গ্রহণ করে। এক রাতে ঘুম না আসায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে রোনাসা তারার সাথে আপন মনে কথা বলতে থাকে অ্যাড্রীহাইকে নিয়ে। তখনই দাঁতে ফুলের তোড়া কামড়ে তাকে পিলার বেয়ে ওপরে উঠে আসতে দেখল ভীষণই বিস্মিত ও প্রসন্ন হলো সে। হাত বাড়িয়ে তাকে উঠে আসতে সাহায্য করল। অ্যাড্রীহাই হাটু মুড়ে তার সামনে বসল ও ফুলের তোড়াখানা দিয়ে আবারও সেই এক কথা বলল,আমি তোমায় ভালোবাসি।
এ কথাটা এমনই যা কোটিবার শুনলেও কখনো পুরাতন হয় না। সবসময় সুখকর ও তৃপ্তকারী। সস্নেহে সেই তোড়াখানা ও তাকে রোনাসা গ্রহণ করল। রোনাসার কক্ষে তারা সারা রাত গল্প করল। শেষ প্রহরে যখন কথা বলতে বলতে ক্লান্ত রেনাসা ঘুমিয়ে গেল, অ্যাড্রীহাই তাকে ভালোভাবে শুইয়ে বিছানাটি গায়ে টেনে দিয়ে কপালে এক টুকরা যতেœর চুমু খেয়ে চলে গেল। রোনাসার বাবা জেইসা, তুখোড় বুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি মেয়ের এ প্রেমের ব্যাপারে আন্দাজ করলেন এবং প্রমাণ ও জোগাড় করলেন। রোনাসা বুঝতে পারল কিছুটা। তবে অত্যন্ত আদরের মেয়েকে বাবা কিছু বললেন না। না বলতেও সে আন্দাজ করল। তাই রোনাসা অ্যাড্রীহাই এর সাথে দেখা করল ও তাকে পালিয়ে নিয়ে বিয়ে করতে বলল। অ্যাড্রীহাই এর অসম্মতির কোনো কারণই নেই। সে ও যে তাকে ভীষণ ভালোবাসে। দুর্ভাগ্যক্রমে বাবা এ ব্যাপারেও জেনে গেল। রোনাসা নির্ধারিত দিনে সেইন্টে পৌঁছল।
যেখানে অপেক্ষার কথা অ্যাড্রীহাইকে বলেছিল, সেখানেই তার জন্য বসে রইল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেল। অ্যাড্রীহাই অনেক দেরি করল। এমন সময় একটা লোকের থেকে অ্যাড্রীহাই এর লেখা একটা চিঠি সে পেল। খুবই আগ্রহে খুলল। লেখা আছে, “তুমি আমাকে ক্ষমা কোরো রোনাসা। তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা, মিথ্যা নয়। কিন্তু আমি আমার মাকে এবং সন্তান হিসাবে তার ওপর আমার দায়িত্ব ও অস্বীকার করতে পারি না। আমার বাবার মৃত্যু থেকে তিনি আজ পর্যন্ত অনেক কষ্ট করছেন।আমার জন্য তিনি তার পুরো জীবন উৎসর্গ করেছেন। তার জন্য আমার অবশ্যই কিছু করণীয় আছে। যদি আমি আমাদের ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দিতে, আমাদের ভালো থাকার জন্য আজকের সিদ্ধান্তটা সফল করি তাহলে আমার মা বাকি জীবনটাতে ভালো থাকবেন না। তুমি ও সেটা চাইবে না।
তাই আমি আসতে পারব না।তুমি তোমার শ্রেণির উচ্চ কোনো পরিবারে বিয়ে করে ভালো থাকো। বাবা-মা, পরিবারের সন্মান টিকিয়ে রাখো। এই যে চিরায়ত শ্রণিভেদ, এরা আমাদের কখনো এক হতে দেবে না। আমায় ভুলে ভালো থেকো।” পড়া শেষ করতে করতে চিঠিখানা তার চোখের পানিতে উদ্ভাসিত হলো। চিঠিখানা ছিড়ে টুকরা করে সে নদীতে ফেলে দিল। তীরে বসে বসে ভেজা নরম বালিতে লিখল, বন্য পাখি পোষ মানে না। তার সাথে বাসা বাঁধাও হয় না। চারপাশ নির্জন, নিঝুম হয়ে গেল।
আলো কেটে আঁধার এলো। ঢেউয়ে ঢেউয়ে কোথায় যেন টুকরাগুলো ও হারিয়ে গেল। রোনাসা তেমনই নির্বাক, ভেজা চোখে বোবার মতো পানিতে দৃষ্টি ফেলে বসে রইল।
কেকে/সাশ