শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে নোটিশ, তবু অনুমোদন ছাড়াই চলছিল টুপটুপ রিসোর্ট      ● কক্সবাজারে রিসোর্টে ভয়াবহ আগুন, ১০ পর্যটকের মৃত্য      ● ধর্ম যার যার-রাষ্ট্র সবার, নিরাপত্তার অধিকার সবার : প্রধানমন্ত্রী      ● দিল্লিতে মিছিলের পূর্বেই আটক অভিজিৎ, হেফাজতে নেহা বোরা      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় চারজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১১৮১       ● হাম উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ শিশুর মৃত্যু      ● আবারও গুলি-কুপিয়ে জখম, চাঁদাবাজি-দখলবাজিতে টালমাটাল মোহাম্মদপুর      
ইচ্ছেডানা
এগারো
স্যান্ড্রা চিসনেরোসের
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:১৯ পিএম
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

বয়স বাড়ার ব্যাপারটা নিয়ে মানুষ কী যে বোঝে না, আর তারা তোমাকে যা কখনোই বলে না, তা হলো—তোমার বয়স যখন এগারো, তখন তোমার ভেতর একই সঙ্গে দশ, নয়, আট, সাত, ছয়, পাঁচ, চার, তিন, দুই এবং এক বছর বয়সও লুকিয়ে থাকে।

তোমার এগারোতম জন্মদিনের সকালে ঘুম থেকে উঠে তুমি আশা করো যে নিজেকে এগারো বছরের মতো মনে হবে, কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। তুমি চোখ খোলো আর দেখে মনে হয় সবকিছু একদম গতকালের মতোই, পার্থক্য শুধু একটাই—আজকে হলো ‘আজ’। তুমি আসলে সেই এক বছরের আড়ালেই ঢাকা পড়ে থাকো, যা তোমাকে এগারো করেছে।

যেমন, কোনো কোনো দিন তুমি হয়তো খুব বোকার মতো কোনো কথা বলে ফেললে—ওটা হলো তোমার ভেতরের ‘দশ বছর’ বয়সের অংশ। আবার কোনো দিন হয়তো ভয় পেয়ে তোমাকে মায়ের কোলে গিয়ে বসতে হলো—ওটা হলো তোমার ভেতরের ‘পাঁচ বছর’ বয়সের অংশ। আর হতে পারে একদিন, যখন তুমি অনেক বড় হয়ে যাবে, তখন তোমার হয়তো তিন বছরের শিশুর মতো কেঁদে ফেলতে ইচ্ছে করবে—আর সেটা একদম স্বাভাবিক। যখন মা মন খারাপ করে আর তার কান্নার প্রয়োজন হয়, তখন আমি তাকে এটাই বলি। হয়তো তার ভেতরেও তখন তিন বছর বয়স কাজ করছে।

কারণ মানুষের বয়স বাড়ার ধরনটা পেঁয়াজের মতো, বা গাছের গুঁড়ির ভেতরের বলয়গুলোর মতো, কিংবা আমার সেই ছোট কাঠের পুতুলগুলোর (ম্যাট্রিয়শকা) মতো— যেগুলোর একটা আরেকটার পেটের ভেতর ঢুকে থাকে, প্রতিটা বছর তার আগের বছরের ভেতর।

এগারো বছর বয়স হওয়াটা ঠিক এই রকম। তোমার হঠাৎ করে এগারো বছরের মতো অনুভূতি হবে না। অন্তত সঙ্গে সঙ্গে তো নয়ই। কেউ তোমাকে বয়স জিজ্ঞেস করলে ‘এগারো’ উত্তর দেওয়ার আগে কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে। আর প্রায় বারো বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত তোমার নিজেকে এগারো বছরের মতো চালাক বা জ্ঞানীও মনে হবে না। নিয়মটা এমনই।

শুধু আজকের দিনে আমার ইচ্ছে করছে, আমার ভেতরে যদি শুধু এগারোটি বছরই ব্য্যান্ড-এইডের টিনের বাক্সে খুচরো পয়সার মতো ঝমঝম করে না বাজত! আজকে আমার খুব ইচ্ছে করছে আমার বয়স যদি এগারোর বদলে একশ দুই হতো! কারণ আমার বয়স যদি একশ দুই হতো, তবে মিস প্রাইস যখন আমার বেঞ্চের ওপর সেই লাল সোয়েটারটা এনে রাখলেন, তখন কী বলতে হবে তা আমি জানতাম। মুখ হাঁ করে বোকার মতো বসে না থেকে আর কোনো কথা বের না হওয়ার বদলে, সোয়েটারটা যে আমার নয়—তা আমি কীভাবে তাকে বুঝিয়ে বলব সেটা আমি জানতাম।

‘এটা কার?’ মিস প্রাইস জিজ্ঞেস করলেন, এবং লাল সোয়েটারটা ক্লাসের সবার দেখার জন্য শূন্যে তুলে ধরলেন। ‘কার এটা? এক মাস ধরে কোট রুমে পড়ে আছে।’
‘আমার না,’ সবাই বলল। ‘আমারও না।’
‘এটা নিশ্চয়ই কারো না কারো হবে,’ মিস প্রাইস বলতে লাগলেন, কিন্তু কেউই মনে করতে পারল না।

ওটা একটা বিচ্ছিরি সোয়েটার, প্লাস্টিকের লাল বোতাম লাগানো, আর কলার ও হাতাগুলো টেনে লম্বা করা—যেন ওটা দিয়ে দড়ি লাফ খেলা যাবে। ওটা দেখতে হয়তো এক হাজার বছরের পুরোনো, আর ওটা যদি সত্যি সত্যি আমার হতোও, তাও আমি বলতাম না। হয়তো আমি রোগাপাতলা বলে, কিংবা সে আমাকে পছন্দ করে না বলে, সেই বোকা সিলভিয়া বলে উঠল, ‘আমার মনে হয় এটা র‌্যা চেলের।’

ঐরকম একটা বিচ্ছিরি, ছিঁড়ে যাওয়া পুরোনো সোয়েটার—অথচ মিস প্রাইস তার কথা বিশ্বাস করে ফেললেন! মিস প্রাইস সোয়েটারটা এনে ঠিক আমার বেঞ্চের ওপর রাখলেন, কিন্তু আমি যখন মুখ খুললাম, আমার মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হলো না।


‘ওটা... ওটা না, আমি... আপনি না... ওটা আমার না,’ অবশেষে একটা পুঁচকে গলায় আমি বললাম, যে গলাটা হয়তো আমার চার বছর বয়সের গলার মতো শোনালো।

‘অবশ্যই এটা তোমার,’ মিস প্রাইস বললেন, ‘আমার মনে আছে তোমাকে একদিন এটা পরতে দেখেছি।’
যেহেতু তিনি বয়সে বড় এবং তিনি শিক্ষক, তাই তিনিই ঠিক আর আমি ভুল। আমার না, আমার না, আমার না... কিন্তু মিস প্রাইস ততক্ষণে ক্লাসের বইয়ের বত্রিশ নম্বর পৃষ্ঠার চার নম্বর অংকের দিকে ফিরে গেছেন।

আমি জানি না কেন, কিন্তু হঠাৎ করেই আমার পেটের ভেতর কেমন একটা জঘন্য অনুভূতি হতে লাগল। মনে হলো আমার ভেতরের তিন বছর বয়সের অংশটা চোখ দিয়ে বের হয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু আমি শক্ত করে চোখ দুটো চেপে ধরলাম, আর দাঁতে দাঁত চেপে মনে করার চেষ্টা করলাম—আজকে আমার এগারো বছর পূর্ণ হয়েছে, এগারো। মা আজ রাতে আমার জন্য কেক বানাচ্ছেন, আর বাবা কাজ থেকে বাড়ি ফিরলে সবাই একসাথে গাইবে—’হ্যাপি বার্থডে, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ’।

কিন্তু সেই জঘন্য অনুভূতিটা একটু কমে যাওয়ার পর যখন আমি চোখ খুললাম, লাল সোয়েটারটা তখনও একটা লাল পাহাড়ের মতো আমার বেঞ্চে বসে আছে। আমি রুলার দিয়ে ঠেলে সোয়েটারটাকে আমার বেঞ্চের কোণায় সরিয়ে দিলাম। আমার পেন্সিল, বই আর রাবারকে সোয়েটারটা থেকে যত দূর সম্ভব দূরে সরিয়ে রাখলাম। এমনকি আমার চেয়ারটাও একটু ডান দিকে সরিয়ে নিলাম। আমার না, আমার না, আমার না।

আমার মাথার ভেতর ঘুরছিল—দুপুরের খাওয়ার বিরতি হতে আর কত দেরি, আর কতক্ষণ পর আমি লাল সোয়েটারটা নিয়ে স্কুলের সীমানা প্রাচীরের ওপারে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারব, কিংবা কোনো পার্কিং মিটারে ঝুলিয়ে রেখে আসতে পারব, অথবা দুমড়ে-মুচড়ে এক দলা বানিয়ে পেছনের গলিতে ফেলে দিতে পারব!

কিন্তু অংকের ক্লাস শেষ হতেই মিস প্রাইস সবার সামনে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, ‘এখন র্যা চেল, অনেক হয়েছে!’ কারণ তিনি দেখলেন আমি সোয়েটারটাকে ঠেলতে ঠেলতে বেঞ্চের একবারে কোণায় নিয়ে গেছি আর ওটা ঝরনার মতো ঝুলে আছে—তবে আমার তাতে কিছুই যায় আসে না।

‘র‌্যা চেল,’ মিস প্রাইস বললেন। তিনি এমনভাবে বললেন যেন তিনি রেগে যাচ্ছেন। ‘এখনই সোয়েটারটা গায়ে দাও, আর কোনো বাহানা চলবে না।’
‘কিন্তু এটা তো আমার—’
‘এখনই!’ মিস প্রাইস ধমকে উঠলেন।

ঠিক এই মুহূর্তেই আমার মনে হলো ইস, আমার বয়স যদি এগারো না হতো! কারণ আমার ভেতরের সমস্ত বছরগুলো—দশ, নয়, আট, সাত, ছয়, পাঁচ, চার, তিন, দুই, এক—সবকটি বছর আমার চোখের পেছনটায় চাপ দিতে লাগল। আমি যখন সেই পনিরের মতো গন্ধ পাওয়া সোয়েটারটার এক হাতায় একটা হাত আর অন্য হাতায় অন্য হাত ঢুকিয়ে দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম—যেন সোয়েটারটা আমাকে কষ্ট দিচ্ছে... আর সত্যিই ওটা কষ্ট দিচ্ছিল, ভীষণ চুলকানি আর জীবাণুতে ভরা, যেগুলো মোটেও আমার নয়।

আজ সকাল থেকে যা কিছু ধরে রেখেছিলাম—মিস প্রাইস যখন থেকে সোয়েটারটা আমার ডেস্কে রেখেছিলেন তখন থেকে—সবকিছু বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো। আর হঠাৎ করেই আমি সবার সামনে হু হু করে কেঁদে ফেললাম।

আমি চেয়েছিলাম যদি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারতাম! কিন্তু আমি তা হতে পারলাম না। আমার বয়স এগারো, আজ আমার জন্মদিন, আর আমি সবার সামনে একটা তিন বছরের বাচ্চার মতো কাঁদছি। আমি ডেস্কে মাথা নিচু করে সেই বোকা ভাঁড়-সোয়েটারটার হাতার ভেতর মুখ গুঁজে দিলাম। আমার মুখ একদম গরম হয়ে গেছে আর মুখ থেকে লালা গড়িয়ে পড়ছে, কারণ আমার ভেতর থেকে আসা পশুর মতো গোঙানির শব্দগুলো আমি থামাতে পারছিলাম না। যতক্ষণ না আমার চোখে আর কোনো জল অবশিষ্ট রইল, আর পুরো শরীরটা হিক্কা তোলার মতো কাঁপতে লাগল, আর বেশি, দ্রুত দুধ খেলে যেমন মাথা ধরে—তেমনি মাথা ব্যথা করতে লাগল।

কিন্তু সবচেয়ে বাজে ব্যাপারটা ঘটল দুপুরের বিরতির ঠিক আগের মুহূর্তে! সেই বোকা ফিলিস লোপেজ—যে কি না সিলভিয়া সালদিভারের চেয়েও বোকা—সে হঠাৎ বলল যে তার মনে পড়েছে লাল সোয়েটারটা আসলে তার!
আমি সাথে সাথে সোয়েটারটা খুলে তাকে দিয়ে দিলাম, কিন্তু মিস প্রাইস এমন ভান করলেন যেন কিছুই হয়নি।

আজকে আমি এগারো বছরের হলাম। আজকে রাতের জন্য মা একটা কেক বানাচ্ছেন, আর বাবা কাজ থেকে ঘরে ফিরলে আমরা সেটা খাব। সেখানে মোমবাতি থাকবে, উপহার থাকবে আর সবাই মিলে গাইবে—’হ্যাপি বার্থডে, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, র্যা চেল’। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

আজ আমার বয়স এগারো। আমি এখন এগারো, দশ, নয়, আট, সাত, ছয়, পাঁচ, চার, তিন, দুই এবং এক—কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমার বয়স যদি একশ দুই হতো! আমার মনে হচ্ছে এগারো ছাড়া অন্য যেকোনো বয়স হলেই বোধহয় ভালো হতো, কারণ আমি চাই আজকের এই দিনটা যেন অনেক দূরে চলে যায়... পলায়নরত কোনো বেলুনের মতো বহুদূরে, আকাশের বুকে ছোট একটা ‘ড়’-এর মতো ভেসে থাকা বিন্দুর মতো এত ছোট, যা দেখতে চোখ বন্ধ করতে হয়।

অনুবাদ সম্পাদনা— ফরহাদ নাইয়া


কেকে/সাশ 




মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close