শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬,
১৫ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● এইচএসসিতে পাসের হারে শীর্ষে ঢাকা, তলানিতে বরিশাল      ● এইচএসসি পরীক্ষা : ২৯৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাস করেননি কোনো শিক্ষার্থী      ● পাসের হারে এগিয়ে মেয়েরা, জিপিএ-৫ বেশি ছেলেদের      ● মিরপুর-১০-এ ফের পোশাকশ্রমিকদের সড়ক অবরোধ      ● এক-দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা এক মাসের মধ্যে: শিক্ষামন্ত্রী       ● এইচএসসির ফল প্রকাশ, পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ      ● সৌদিতে আগুনে নিহত ৭ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পৌঁছেছে      
ইচ্ছেডানা
মানুষে মানুষে ব্যবধান
জোবায়ের রাজু
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ২:২৯ পিএম
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

ফিমাদের আগের বাসাটা ছেড়ে নতুন একটি ভাড়া বাসায় উঠেছে তার পরিবার। নতুন বাসাটা বেশ সুন্দর। বাড়ির সামনে ছোট্ট বাগান, আর ছাদটাও বেশ খোলামেলা। ফিমার সবচেয়ে ভালো লাগে ছাদে যেতে। বিকেল হলেই সে ছাদে গিয়ে আকাশ দেখে, পাখির ওড়াউড়ি উপভোগ করে। কখনো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দূরের গাছপালা দেখে, আবার কখনো নিজের মনে গান গায়। তবে আগের বাসাটার কথা মনে পড়লে ফিমার মনটা খারাপ হয়ে যায়। সেই বাসা নিয়ে তার একটাই অভিযোগ ছিল, বাড়িওয়ালার মেয়ে নামিরা ভীষণ হিংসুটে আর অহংকারী।

নামিরা ছাদে অনেক ফুলের গাছ লাগিয়েছিল। গোলাপ, গাঁদা, জবা, বেলি, কত রকমের ফুল যে ছিল তার বাগানে! ফিমার ফুলের বাগান দেখতে খুব ভালো লাগত। তাই সে প্রায়ই ছাদে যেত। কিন্তু নামিরা সেটা একেবারেই পছন্দ করত না। একদিন ফিমা ছাদে গিয়ে বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে ফুল দেখছিল। এমন সময় নামিরা এসে বিরক্ত মুখে বলল, ‘তুমি আবার ছাদে এসেছ কেন?’ ফিমা অবাক হয়ে বলল, ‘কেন? ছাদে আসতে কি কোনো নিষেধ আছে?’ নামিরা বলল, ‘নিষেধ না থাকলেও বারবার আসার দরকার কী? এটা আমাদের বাড়ি। তোমরা এখানে ভাড়া থাকো। তাই বলে যখন-তখন ছাদে চলে আসবে?’

নামিরার কথা শুনে ফিমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। তবু সে শান্তভাবে বলল, ‘আমি তো শুধু ফুলগুলো দেখছিলাম। কোনো গাছের ফুল ছিঁড়িনি।’ নামিরা চোখ কুঁচকে বলল, ‘সেটা এখন বলছ! আমার বাগানের ফুল চুরি করে নিয়ে গেলে তখন কী হবে? তোমাদের মতো ভাড়াটিয়াদের বিশ্বাস করা যায় না।’ 

কথাটা শুনে ফিমার খুব অপমান বোধ হলো। সে কোনো দিন কারও গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে নেয়নি। অন্যের জিনিস অনুমতি ছাড়া নেওয়া যে অন্যায়, তা সে ভালো করেই জানে। অথচ কোনো অপরাধ না করেও তাকে এমন অপমান সহ্য করতে হলো।
সেদিন মন খারাপ করে নিচে নেমে এসেছিল ফিমা। এরপরও মাঝেমধ্যে ছাদে গেলে নামিরার কটু কথা শুনতে হতো তাকে। শেষ পর্যন্ত ছাদে যাওয়ার আনন্দটাই যেন হারিয়ে ফেলেছিল সে।

নতুন বাসায় ওঠার পর ফিমা শুনেছে, এই বাড়ির মালিকেরও তার বয়সি একটি মেয়ে আছে। মেয়েটির নাম দিশা। সেও নাকি ছাদে ফুলের বাগান করেছে। কথাটা শুনে ফিমার মনে একটু ভয়ই হলো। মনে মনে ভাবল, ‘দিশাও যদি নামিরার মতো হয়? ছাদে গেলেই যদি রাগ করে? যদি ভাবে, আমি তার ফুল চুরি করতে এসেছি?’

তবু এক বিকেলে সাহস করে ছাদে গেল ফিমা। ছাদে গিয়ে দেখল, দিশা গাছের গোড়ায় পানি দিচ্ছে। গাছগুলো বেশ সুন্দর করে সাজানো। কোথাও গোলাপ ফুটেছে, কোথাও জবা, আবার কোথাও ছোট ছোট বেলি ফুলের কুঁড়ি। ফিমাকে দেখে দিশা মিষ্টি হেসে বলল, ‘তুমি কি এই বাড়িতে নতুন এসেছ?’ ফিমা একটু ইতস্তত করে বলল, ‘হ্যাঁ। আমার নাম ফিমা।’ দিশা বলল, ‘বাহ, সুন্দর নাম তো! আমি দিশা। তুমি কি ফুল ভালোবাসো?’ ফিমা উৎফুল্ল হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, খুব ভালোবাসি।’ দিশা সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘তাহলে তো ভালোই হলো! আমার সঙ্গে ছাদে আসবে। দুজনে মিলে গাছের যতœ নেব। ফুল ফুটলে দেখতে আরও ভালো লাগবে।’

দিশার কথা শুনে ফিমা যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। যে ছাদে যাওয়ার জন্য তাকে আগের বাসায় অপমানিত হতে হতো, সেই ছাদেই আজ একজন তাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে! ফিমা একটু সাহস পেয়ে বলল, ‘তোমার গাছের ফুল কেউ ছিঁড়ে নিলে তোমার খারাপ লাগবে না?’ দিশা হেসে বলল, ‘অবশ্যই খারাপ লাগবে। তবে কেউ ফুল ছিঁড়তে চাইলে তাকে বুঝিয়ে বলব। আর তুমি তো আমার অনুমতি নিয়ে ফুল নিতেই পারো। ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্যই তো গাছ লাগিয়েছি। ফুল শুধু আমার একার আনন্দের জন্য নয়।’

দিশার কথা শুনে ফিমার মনটা আনন্দে ভরে গেল। সে ভাবল, মানুষ কত সুন্দর করেও তো কথা বলতে পারে! কাউকে ছোট না করেও নিজের কথা বোঝানো যায়। এরপর থেকে ফিমা প্রায় প্রতিদিনই ছাদে যেত। দিশার সঙ্গে তার বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল। দুজনে মিলে গাছে পানি দিত, শুকনো পাতা পরিষ্কার করত, ফুলের গাছের যতœ নিত। কখনো পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করত, কখনো গল্পের বই নিয়ে কথা বলত। দিশা কোনো দিন ফিমাকে বুঝতে দেয়নি যে সে বাড়িওয়ালার মেয়ে আর ফিমা একজন ভাড়াটিয়ার সন্তান।

একদিন গোলাপগাছে নতুন একটি ফুল ফুটেছে দেখে ফিমা খুব খুশি হলো। সে দিশাকে বলল, ‘দেখো, কী সুন্দর গোলাপ ফুটেছে!’ দিশা হেসে বলল, ‘সত্যিই তো! তুমি চাইলে এই ফুলটা তোমাকে দিতে পারি।’ ফিমা মৃদু হেসে বলল, ‘না, গাছেই থাকুক। গাছে থাকলেই ফুলটাকে বেশি সুন্দর লাগে।’ দিশা মুগ্ধ হয়ে বলল, ‘তুমি খুব সুন্দর করে ভাবতে পারো।’

সেদিন বাসায় ফিরে ফিমা অনেকক্ষণ আগের বাসার কথা ভাবল। নামিরাও তো বাড়িওয়ালার মেয়ে ছিল, দিশাও বাড়িওয়ালার মেয়ে। দুজনেরই আর্থিক অবস্থা ভালো, দুজনেরই সুন্দর বাড়ি, দুজনেরই ছাদে ফুলের বাগান। অথচ একজনের ব্যবহারে ছিল অহংকার, অবিশ্বাস আর অন্যকে ছোট করার প্রবণতা। অন্যজনের ব্যবহারে ছিল আন্তরিকতা, সৌজন্য আর ভালোবাসা। ফিমা বুঝতে পারল, মানুষের পরিচয় শুধু তার বাড়ি, টাকা-পয়সা কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে হয় না। মানুষের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে তার আচরণে। ধনসম্পদ মানুষকে বড় বাড়ির মালিক করতে পারে, কিন্তু বড় মনের মানুষ বানাতে পারে না। অন্যকে সম্মান করতে হলে, সুন্দরভাবে কথা বলতে হলে, সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হলে প্রয়োজন একটি সুন্দর মন।

নামিরার অনেক ফুলের গাছ ছিল, কিন্তু তার আচরণে ভালোবাসার সৌরভ ছিল না। আর দিশার বাগানের ফুলের মতোই তার মনটাও ছিল সুন্দর, কোমল ও সুবাসিত।

ফিমা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি। মনে মনে সে বলল, ‘মানুষে মানুষে ব্যবধান গায়ের পোশাকে, বাড়ির আকারে কিংবা টাকার অঙ্কে নয়, আসল ব্যবধানটা মানুষের মনে। যার মন সুন্দর, সে-ই প্রকৃত অর্থে সুন্দর মানুষ।’


কেকে/সাশ 



মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close