বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী বরাবরই ভারতবিরোধী হিসেবে পরিচিত। তাদের রাজনীতির অন্যতম ট্রাম্পকার্ড এ ভারত বিরোধিতা। তবে সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, তারা গোপনে পার্শ্ববর্তী দেশটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তবে ভারতের অনুরোধেই বিষয়টি এতদিন গোপন রেখেছেন।
এর আগেও গত বছরের নভেম্বরে আন্দবাজার পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দলটির আমির দাবি করেছিলেন, তারা ভারতবিরোধী নন। তারা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে চান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াত সবসময় একটি কৌশলী দল। তারা দলীয় স্বার্থ বিবেচনা করে নীতি নির্ধারণ করে। তবে তাদের বেশিরভাগ নীতিই প্রকাশ্যে আসে না। তারা প্রকাশ্যে যা বলে, অনেক সময় তার বিপরীত কর্মকাণ্ড করে। ভারতের সঙ্গে দলটির যোগাযোগ আছে এবং সেটি করছে গোপনে। এটি দলটির দ্বিচারিতা ছাড়া কিছু নয়।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডা. শফিকুর রহমান ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করার কথা জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ভারতের ওই কূটনীতিক তাকে বৈঠকটি গোপন রাখতে বলেছেন। এজন্য এটি গোপন রাখা হয়েছে। এছাড়া জামায়াতে ইসলামী আগামী নির্বাচনে ঐক্য সরকার গঠনের কথা চিন্তা করছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান তুলে ধরেন শফিকুর রহমান। শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান করাটা সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। তিনি নিশ্চিত করেন যে, চলতি বছরের শুরুতে একজন ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছে। তবে অন্য দেশের কূটনীতিকরা প্রকাশ্যে দেখা করলেও ভারতীয় প্রতিনিধি বৈঠকটি গোপনীয় রাখার অনুরোধ করেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সবার জন্য উন্মুক্ত হতে হবে। পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।’
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য না করলেও ভারতীয় সরকারের একটি সূত্র রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে যে, তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, জামায়াত কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকে থাকতে আগ্রহী নয় বরং সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চায়।
ঢাকার একটি আবাসিক এলাকায় নিজ কার্যালয়ে বসে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হলে এককভাবে নয়, বরং বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে একটি ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ গঠনের ব্যাপারে আগ্রহী জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘ ১৭ বছর পর মূলধারার রাজনীতিতে ফেরা দলটি এরই মধ্যে বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনাও শুরু করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা অন্তত পাঁচ বছরের জন্য একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র দেখতে চাই। দলগুলো যদি একমত হয়, তবে আমরা সবাই মিলে সরকার পরিচালনা করব।’
সাক্ষাৎকারে ডা. শফিকুর রহমান দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি জানান, যে কোনো জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের অভিন্ন লক্ষ্য হতে হবে দুর্নীতি প্রতিরোধ। নির্বাচনে নেতৃত্বের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যে দল সবচেয়ে বেশি আসনে জয়ী হবে, প্রধানমন্ত্রী সেই দল থেকেই হওয়া উচিত।’ তবে জামায়াত এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তিনি নিজে দলের প্রার্থী হবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত দলই নেবে বলে জানান তিনি।
এর আগে গত বছর ২২ নভেম্বর ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি সাক্ষাৎকার দেন শফিকুর রহমান। সেখানে তিনি ভারতবিরোধিতার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর ভারত বিরোধিতার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিশানা করে এ ধারণা ছড়ানো হয়েছে। আমরা চাই ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহাবস্থানের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখতে।
সাক্ষাৎকারে জামায়াতে ইসলামীর চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছেন, জামায়াত একটি আধুনিক, উদার ও গণতান্ত্রিক দল, যার ভিত্তি ইসলামি আদর্শ। আমাদের রাজনৈতিক নীতিগুলো যুক্তিগ্রাহ্য ও মধ্যপন্থি। আমরা কোনো আন্তর্জাতিক সংগঠনের অংশ নই।
সরকারে এলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কেমন হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই, তবে তা হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে। বাস্তবোচিত ও কার্যকর সম্পর্ক উভয় দেশের জন্যই লাভজনক।’
কেকে/এমএ