বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গত হয়েছেন ৪৪ বছরের বেশি। ছোটভাই আরাফাত রহমান কোকো মারা গেছেন প্রায় ১২ বছর। গত ৩০ ডিসেম্বর চলে গেলেন মমতাময়ী মা বেগম খালেদা জিয়া। সে অর্থে স্ত্রী এবং কন্যা ছাড়া আর কোনো স্বজন অবশিষ্ট থাকল না তারেক রহমানের। বাবা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর থেকে মাথার ওপর ছায়া হয়ে ছিলেন মা দেশনেত্রী খালেদা জিয়া। তার মৃত্যুর পর এখন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপির এই শীর্ষ নেতার রাজনীতির হাতেখড়ি মা খালেদা জিয়ার কাছে। তিনি হাতে ধরে শিখিয়েছেন রাজনৈতিক শিষ্টাচার, শিখিয়েছেন প্রতিবাদের ভাষা। চিনিয়েছেন রাজনীতির অলিগলি; শিক্ষা দিয়েছেন চরম সংকটকালে মাথা ঠান্ডা রেখে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। স্বভাবতই সেই মাকে হারিয়ে শূন্যতা অনুভব করছেন তারেক রহমান।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তিনি এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘আমি আমার প্রিয় মা, জীবনের প্রথম শিক্ষক, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আমার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করেছি। তার অনুপস্থিতির শূন্যতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অভিভাবকহীন তারেক রহমানের জন্য এখন সামনের দিনগুলো চ্যালেঞ্জের হবে। বিশেষ করে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের বৈতরণী সফলভাবে পার হতে হবে। লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কারিশমা দলটিকে উজ্জীবিত ও ঐক্যবদ্ধ রাখতে বড় ভূমিকা পালন করত। সেই ছন্দে এখন বিঘ্ন ঘটবে। তারেক রহমানকে এখন একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজের নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে। তার নেতৃত্ব এখনো পরীক্ষিত নয়।’
তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘খালেদা জিয়া নিজেও একসময় রাজনীতিতে অপরীক্ষিত ছিলেন। আশির দশকে সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের সময় তিনি জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তেমনিভাবে তারেক রহমানের জন্য ভাগ্যনির্ধারক হতে পারে : সাফল্য তার নেতৃত্বকে বৈধতা দেবে, আর ব্যর্থতা তার নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, সে লক্ষে দলের অভ্যন্তরে ঐক্য ধরে রাখতে পরিণত সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারেক রহমানকে। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের যথাযথ সম্মানের সহিত কাজে নামাতে হবে। তারা আরও বলছেন, ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মাধ্যমে শোনা যাচ্ছে তারেক রহমানের আশপাশে আবারও সেই পুরোনো বলয় সক্রিয় হচ্ছে। যেটা দলের জন্য মাথা ব্যথার কারণ হবে। বিএনপির বিগত শাসনামলে এ সিন্ডিকেটই বিএনপিকে বিতর্কিত করতে ভূমিকা রেখেছিল।
গত ৩১ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার জানাজায় সারা দেশ থেকে বিএনপির লাখো সমর্থক ও সাধারণ মানুষ সমবেত হন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতি প্রমাণ করে, খালেদা জিয়া শুধু বাংলাদেশের সীমানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যু একটি সংকটময় মুহূর্তে বিএনপির জন্য বড় ধরনের বার্তা ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত রয়েছে। বছরের পর বছর অসুস্থতা ও রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার মধ্যেও যিনি দলের ঐক্যের চূড়ান্ত প্রতীক ছিলেন; সেই নেত্রীকে ছাড়াই এখন নির্বাচনি লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে দলটিকে।
কয়েক দশক ধরে খালেদা জিয়ার প্রাসঙ্গিকতা কেবল আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজনীতির সম্মুখভাগে অনুপস্থিত থাকার সময়েও তিনি ছিলেন দলের নৈতিক ভারকেন্দ্র এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা। তার উপস্থিতির কারণেই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দিতে পারেনি এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে কারও মনে সংশয় ছিল না।
তারেক রহমানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ একজন ‘প্রকৃত অভিভাবক’ হারিয়েছে। তিনি খালেদা জিয়াকে সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের এক ঐক্যবদ্ধ প্রতীক হিসাবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিএনপি নির্বাচিত হলে খালেদা জিয়ার নীতি ও সুশাসনের অগ্রাধিকারগুলোকেই এগিয়ে নিয়ে যাবে। তার রাজনীতির বৈশিষ্ট্য ছিল শক্তিশালী সংসদীয় গণতন্ত্রÑ আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। তিনি আরও দাবি করেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে যেসব প্রতিষ্ঠান ও অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে, বিএনপি সেগুলো পুনরুদ্ধার করতে চায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী খালেদা জিয়া ও তার স্বামী জিয়াউর রহমান উভয়কেই কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া শুধু দলের জন্য নন, বরং দেশের জন্য একজন ‘অভিভাবক’ ছিলেন। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন জ্যেষ্ঠ স্থিতিশীল ব্যক্তিত্বের অভাব তৈরি করল।’
তারেক রহমান ২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো শেষ হওয়ার পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। দিলারা চৌধুরী মনে করেন, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন দলের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির আশঙ্কা কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা, স্বৈরতন্ত্র বর্জন এবং ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দেওয়া তার সাম্প্রতিক ভাষণগুলো সমর্থকদের আশ্বস্ত করেছে।
বিএনপি নেতারা স্বীকার করছেন, শুধু উত্তরাধিকার দিয়ে দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না। কিছু দলীয় কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠছে, যাকে উপদেষ্টা মাহদী আমিন ‘অতিরঞ্জিত’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি জানান, কঠোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দল এটি মোকাবিলা করবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা তারেক রহমানের কর্তৃত্ব নিয়ে কোনো সংশয় দেখছেন না। স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘তারেক রহমানের নেতৃত্ব ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। তার নেতৃত্ব প্রমাণিত। তিনি কার্যকরভাবে দলকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।’ তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দলের শৃঙ্খলা রক্ষা, সংস্কারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে অবদান রাখাই হবে তারেক রহমানের নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা।
কেকে/এজে