সড়ক দুর্ঘটনা সারা দেশে একটি নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, যা ক্রমেই উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চালকের অসতর্কতা, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, সড়কচিহ্ন ও সংকেত অমান্য করা, কিংবা প্রশিক্ষণ ছাড়া গাড়ি চালানোই সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
তবে বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীতকালে সড়ক দুর্ঘটনার হার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। ঘন কুয়াশা ও সড়কে অতিরিক্ত গতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন ট্রাফিক পুলিশ ও সড়কে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা।
তারা বলেন, শীতকালে কুয়াশা অতিমাত্রায় ঘন হলে আশপাশের দৃশ্য অস্পষ্ট হয়ে যায়, এমনকি কাছের জিনিসও স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। এতে দৃশ্যমানতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলে চালকরা দূরের পথ দেখতে পান না, সড়কচিহ্ন বা সংকেত বুঝতে ব্যর্থ হন এবং বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের গতি ও দিক নির্ণয় করতে পারেন না। এর ফলে শেষ মুহূর্তে হঠাৎ কোনো স্থির বা ধীরগতির যানবাহন সামনে পড়ে গেলে সংঘর্ষের আশঙ্কা বহুগুণে বেড়ে যায়।
এ ছাড়া শীতের কারণে অনেক সময় যানবাহনের ব্যাটারির কার্যকারিতা হ্রাস পায় এবং হেডলাইট ও হর্ন দুর্বল হয়ে পড়ে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
এদিকে ঘন কুয়াশায় সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়াতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল। তারা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনা এড়াতে চালকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। ঘন কুয়াশার সময় গাড়ির গতি কম রাখা, লো-বিম ও ফগ লাইট ব্যবহার করতে হবে এবং সর্বদা সচেতন থাকতে হবে। ওই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে মহাসড়কে যথাযথ সাইনবোর্ড ও সংকেত স্থাপন নিশ্চিত করার জন্য সড়ক কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।
সড়ক দুর্ঘটনার ফলে অসংখ্য পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়ে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে শুক্রবার সারা দেশে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন অন্তত শতাধিক।
প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে জানা যায়, রাজধানীর উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় অজ্ঞাত এক যুবক নিহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে উত্তরা পূর্ব থানাধীন হাউস বিল্ডিং এলাকার মেইন রাস্তায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ সূত্রে জানায়, রাত ১টার দিকে হাউজ বিল্ডিং এলাকার মূল সড়কের ওপর গুরুতর আহত অবস্থায় এক যুবক পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। খবর পেয়ে উত্তরা পূর্ব থানার টহল পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত যুবককে উদ্ধার করে। রাত ২টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার সকালে হেমায়েতপুর-সিংগাইর-মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের গেড়াদিয়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- সাভার উপজেলার পাথালিয়া ইউনিয়নের সন্দ্বীপ এলাকার বিল্লাল হোসেনের ছেলে মোহাম্মদ ইউসুফ (১৫) ও মো. জাফর মিয়ার ছেলে মাহমুদুল হাসান মিরাজ (১৯)।
নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন, সন্দীপ এলাকা থেকে মোটরসাইকেল করে ১২ থেকে ১৩ জনের একটি দল মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় খেজুরের রস খেতে যান। সেখান থেকে ফেরার পথে হেমায়েতপুর-সিংগাইর-মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের গেড়াদিয়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
গাইবান্ধায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ জন নিহত
শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে পলাশবাড়ীর ঠুটিয়াপুকুর এলাকায় ঘন কুয়াশার মধ্যে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা গাইবান্ধাগামী কাজী লাইন পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস সিমেন্ট বোঝাই একটি ট্রাককে ওভারটেক করার সময় ধাক্কা খায়। এতে বাস চালকের সহকারী মুসা আকন্দ (২৫) ও যাত্রী জামিল হোসেন (২০) নিহত হন এবং কমপক্ষে ৭ জন আহত হন। আহতদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ফাঁসিতলা এলাকায় একটি দ্রতগতির ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী আব্দুল জলিল রনি (৪২) ও সিদ্দিকুর রহমান (৪৫) নিহত হন। একই ঘটনায় আরও একজন মোটরসাইকেল আরোহী আহত হন এবং গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
এ ছাড়া যশোর চুকনগর সড়কে দুর্ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছেন। জানা গেছে, শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে যশোর চুকনগর সড়কের আমতলা নামস্থানে মোটরচালিত ভ্যান ও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে। তাদের উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে ভ্যানচালক মধ্যকুল গ্রামের কোবাদ আলীর (৫০) মৃত্যু হয়। কিছুক্ষণ পর মোটরসাইকেল চালক মধ্যকুল গ্রামের অয়েচকুরুনীর (৪৮) মৃত্যু হয়।
এদিকে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় পৃথক দুই সড়ক দুর্ঘটনায় একজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছে। ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন জানান, শুক্রবার সকালে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে মুনসুরাবাদ বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন খাপুরা এলাকায় ঘন কুয়াশায় কারণে একটি প্রাইভেট কার ও লড়ি ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। এতে ট্রাকটি সড়কের উপর উল্টে যায় ও প্রাইভেট কারের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। দুর্ঘটনায় প্রাইভেটকারের চালকসহ ৪ জন গুরুতর আহত হয়। অপরদিকে শিবচর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম জানান, ঢাকা ভাঙ্গা হাইওয়ে এক্সপ্রেসের ভাঙ্গা উপজেলার সলিলদিয়া বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে গাড়ির চাপায় পিষ্ট হয়ে অজ্ঞাত এক বৃদ্ধ (৬০) নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়াও দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা ও চিরিরবন্দরের নতুন ভুষিবন্দর এলাকায় পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় এক বৃদ্ধ ও এক শিশু নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী এক দম্পতিসহ অন্তত ১৭ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে খানসামা উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের আদিবাসী পাড়া এলাকায় চৌরঙ্গী-নীলফামারীগামী পাকা সড়কে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় আব্দুল ছাত্তার ওরফে দিলীপ (৬০) গুরুতর আহত হন। পরে নীলফামারী সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে, একই রাতে দিনাজপুরের দশমাইল হাইওয়ে মহাসড়কের নতুন ভুষিবন্দর তেল পাম্পের সামনে পঞ্চগড় থেকে রংপুরগামী একটি যাত্রীবাহী বাস দুর্ঘটনায় পড়ে তিন বছরের শিশু তাইফ নিহত হয়। এ ঘটনায় বাসের অন্তত ১৫ জন যাত্রী আহত হন।
এ ছাড়া শরীয়তপুরের নড়িয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে এরশাদ খান (৩৫) নামে এক ফল ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় ঘাতক ট্রাকসহ চালককে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল নড়িয়া-শরীয়তপুর সড়কের নড়িয়া প্রাণিসম্পদ অফিসের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত এরশাদ খান নড়িয়া পৌরসভার দক্ষিণ নড়িয়া গ্রামের মেছের খাঁর ছেলে এবং নড়িয়া বাজারের একজন ফল ব্যবসায়ী।
তাছাড়া নাটোরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা লেগে করিম বেপারী (৪০) নামে এক মোটরসাইকেল চালক নিহত হয়েছেন। শুক্রবার দুপুর পৌঁনে ১টার দিকে সদর উপজেলার শঙ্করভাগ এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত করিম বেপারী সদর উপজেলার উপজেলার ইব্রাহিমপুর গ্রামের মনছের সরকারের ছেলে। তিনি সংকরভাগ এলাকার পেঁয়াজ রসুন ব্যবসায়ী ছিলেন।
ফেনীর সোনাগাজীতে সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সকালে উপজেলার ফেনী-সোনাগাজী আঞ্চলিক সড়কের ডাকবাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত যুবকের নাম মুহাম্মদ ফয়সাল বাদশা। তিনি উপজেলার সদর ইউনিয়নের ছাড়াইতকান্দি গ্রামের আবদুল মোতালেব শাহাবুদ্দিনের ছেলে।
এদিকে পটুয়াখালীর দশমিনায় ঘন কুয়াশার কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও তিনজন আহত হয়েছেন। শুক্রবার সকাল ৭টায় দশমিনা উপজেলার সদর ইউনিয়নের আরজবেগী সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত পলাশ (৪৫) উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের গছানী গ্রামের নিজাম ফকিরের ছেলে।
ঘন কুয়াশায় এক্সপ্রেসওয়ের চার স্থানে দুর্ঘটনা, আহত ৩০
ঘন কুয়াশায় ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের চারটি স্থানে পৃথক দুর্ঘটনায় অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর ও লৌহজং এবং মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে আজ শুক্রবার সকালে এসব দুর্ঘটনা ঘটে।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যার পর থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে ঘন কুয়াশা দেখা দেয়। রাতে ঢাকা থেকে সাদ আবদুল্লাহ পরিবহনের একটি বাস পদ্মা সেতুর দিকে যাচ্ছিলে। একই লেনে যাচ্ছিল গোল্ডেন লাইন পরিবহনের একটি বাস। গোল্ডেন লাইন পরিবহনের বাসটি রাত পৌনে ৯টার দিকে শ্রীনগরের বেজগাঁও বাসস্ট্যান্ডে এলাকায় পৌঁছালে পেছন থেকে সাদ আবদুল্লাহ পরিবহনের বাসটি সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে দুটি বাসের অন্তত ৯ জন যাত্রী আহত হন। দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে এক্সপ্রেসওয়ের ছনবাড়ী এলাকায় দুটি ট্রাক ও একটি বাসের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়।
শ্রীনগর ফায়ার সার্ভিস জানায়, মামুন পরিবহনের একটি বাস ছনবাড়ী সেতুর ওপর উঠছিল। কুয়াশার কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একই লেনে একটি মালবাহী ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দেয়। এ সময় পেছন থেকে আসা দ্রুতগতির একটি ট্রাকা বাসটির পেছনে ধাক্কা দেয়। এতে বাসটির সামনের ও পেছনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে গিয়ে অন্তত ১০ জন যাত্রী আহত হন।
এ ছাড়া গতকাল ভোর সোয়া পাঁচটার সময় লৌহজং উপজেলায় এক্সপ্রেসওয়ের দোগাগাছি এলাকায় মাওয়ামুখী একটি ট্রাকের পেছনে কাভার্ডভ্যান ধাক্কা দেয়। এতে ট্রাকে থাকা এক ব্যক্তি আহত হন। মুন্সিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, ঘন কুয়াশা ও সড়কে অতিরিক্ত গতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে এক্সপ্রেসওয়ের শিবচরের বন্দরখোলা এলাকায় আজ সকাল সাড়ে ৮টার দিকে যাত্রীবাহী বাস, পিকআপ ভ্যান ও কাভার্ড ভ্যানের ত্রিমুখী সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। খবর পেয়ে শিবচর হাইওয়ে থানার পুলিশ গাড়ি ৩টিকে সড়ক থেকে সরিয়ে নেয়। পরে যানবাহান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
শিবচর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, তিনটি গাড়ির সংঘর্ষের ঘটনায় কয়েকজন যাত্রী সামান্য আহত হয়েছেন। তাদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি তিনটিকে থানায় আনা হয়েছে।
কেকে/ এমএস