দেশজুড়ে বাড়ছে শীতের তীব্রতা। ঘন কুয়াশা আর কনকনে ঠান্ডা বাতাসের কারণে সারা দেশে জেঁকে বসেছে হাড় কাঁপানো শীত। গত কয়েক দিনের তীব্র শৈত্যপ্রবাহের কারণে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে ঠান্ডাজনিত নানা রোগ। জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অ্যাজমাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ছুটছেন। এতে করে সারা দেশেই হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু ও বয়স্করা। রীতিমতো ভয় ধরাচ্ছে হাসপাতালগুলোতে শীতজনিত রোগীর চাপ।
চিকিৎসকরা বলছে, চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের সংখ্যাই বেশি। শীতজনিত জটিলতায় তাদের শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। এদিকে অতিরিক্ত রোগীর চাপের বিপরীতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কম থাকায় সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেক হাসপাতালে এমন অভিযোগও কম নয়।
রাজধানীর মুগদা হাসপাতাল, শ্যামলী বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া এবং নানা জটিলতা নিয়ে প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা।
চিকিৎসকদের মতে, তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তনে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠায় এসব জটিলতা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শীতজনিত রোগী মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সতর্কতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। বিশেষ করে সর্দি-কাশি না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করার পরামর্শ দেন তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) শাখার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে গত শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) পর্যন্ত সারা দেশে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৯ হাজার ৪২৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভর্তি রোগীর মধ্যে ৫৫ হাজার ৬৮৩ জন ডায়রিয়া নিয়ে হাসপাতালে আসেন। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ২৩ হাজার ৭৪৬ জন।
অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও চাঁদপুর এই ছয় জেলায় ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, শীত মৌসুমে শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি যত্ন নেওয়া জরুরি। ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া, শ্বাসজনিত ও বাতজনিত রোগের প্রকোপ এ সময় বেড়ে যায়। প্রয়োজন ছাড়া শিশু-বয়স্কদের বাইরে না বের হওয়াই ভালো। বাইরে গেলে অবশ্যই গরম কাপড় পরতে হবে এবং কান, নাক ও মুখ ঢেকে রাখতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ সেবন, হালকা গরম খাবার খাওয়া এবং সুযোগ পেলে রোদে বসতে হবে।
একইভাবে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য শীতকালীন সুরক্ষা আরও জরুরি। কারণ এ সময় তাদের শীতজনিত জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে। যাদের আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস বা শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য রোগ রয়েছে, তাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কাশি বা জ্বর চার-পাঁচ দিনের বেশি স্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। নিজের ইচ্ছায় কোনো অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়।
শৈত্যপ্রবাহের কবলে ৭ জেলা : দেশের সাত জেলায় আজ শুক্রবার বয়ে যাচ্ছে শৈত্যপ্রবাহ। গত বৃহস্পতিবার অবশ্য ১৬ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ ছিল। সে তুলনায় গতকাল শৈত্যপ্রবাহের এলাকা কমেছে।
আবহাওয়া অফিস বলছে, গতকাল দেশের তাপমাত্রা খানিকটা বাড়তে পারে। তাতে শীত একটু কমে আসতে পারে। তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আগামী রোববার থেকে তাপমাত্রা আবার কমা শুরু করতে পারে। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় যশোরে, ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
যখন কোনো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ১ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে, তখন তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলে। তাপমাত্রা ৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তাকে বলা হয় মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। তাপমাত্রা ৪ দশমিক ১ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলে গণ্য হয়। আর তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে গেলে তাকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।
গতকাল দেশের সাত জেলায় বয়ে যাচ্ছে শৈত্যপ্রবাহ। জেলাগুলো হলো গোপালগঞ্জ, যশোর, রাজশাহী, পাবনা, পঞ্চগড়, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা।
এসব জেলার মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যে যশোরে, সেখানে জনজীবন অনেকটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গতকাল বেলা ১১টার দিকে শহরের জামরুলতলা মোড়ে গিয়ে দেখা গেল মোটরসাইকেলে যাত্রী বহনকারী কয়েকজনকে। তাদের একজন সদর উপজেলার শেখহাটি এলাকার জাহিদ হাসান। তিনি ২৫ বছর ধরে মোটরসাইকেলে যাত্রী বহন করে সংসার চালান। শেখহাটি জামরুলতলা মোড়ে তিনি প্রতিদিন ভোর থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে যাত্রীর আশায় বসে থাকেন। প্রতিদিন ৪০০-৫০০ টাকা তার রোজগার হয়। কিন্তু টানা এক সপ্তাহের শৈত্যপ্রবাহ ও ঠান্ডায় তার রোজগার অর্ধেক নেমেছে।
শুধু জাহিদ হাসান নন, এই মোড়ের মোটরসাইকেলে যাত্রী বহনকারীর অন্তত ১০ জন একই দশা। গতকাল ভোর থেকেই রাজশাহীতে সূর্যের দেখা মিলেছে। তবে সকাল ১০টা পর্যন্ত রোদ থাকলেও শীতের দাপট কমেনি। নগরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, লোকজন প্রয়োজনের তাগিদে বাইরে বের হলেও মোটা শীতের পোশাক পরে চলাচল করছেন।
অন্যদিকে আগামী পাঁচ দিন দেশের আবহাওয়ায় কুয়াশা ও শীতের প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারাদেশের অনেক জায়গায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এতে সড়ক, নৌ ও আকাশপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই সঙ্গে কয়েকটি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং আগামী দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা আরও কমার আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
নগরের জাদুঘর মোড়ে কথা হয় রিকশাচালক রমজান আলীর সঙ্গে। সকাল ১০টার পরও তার গায়ে ছিল মোটা জ্যাকেটের ওপর চাদর। তিনি বলেন, ‘রোদ উঠছে, কিন্তু শীত কমতেছে না। বাতাস খুব বেশি। রোদ গায়ে ঠিকমতো লাগতেছে না।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শাহানাজ সুলতানা বলেন, শৈত্যপ্রবাহের বিস্তৃতি কমেছে। আগামীকালও (আজ) এ ধারা থাকতে পারে। তবে রোববার থেকে তাপমাত্রা আবার কমতে পারে।
কেকে/ এমএস