ভারতের ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের নির্দেশে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে ছেড়ে দিয়েছে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে বলিউড কিংবদন্তি শাহরুখ খানের মালিকানাধীন দলটি জানায়, বাংলাদেশ পেসার মোস্তাফিজকে দলে থেকে ছেড়ে দিয়েছে তারা। এর আগে গুয়াহাটিতে বিসিসিআইয়ের সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া ভারতের বার্তা সংস্থা এএনআইকে মোস্তাফিজকে কলকাতার ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
বিবৃতিতে কলকাতা জানিয়েছে, মোস্তাফিজকে তারা এবার আইপিএলের দল বাদ দিয়েছে। বিবৃতিতে দলটি লিখেছে, ‘কলকাতা নাইট রাইডার্স নিশ্চিত করেছে যে, আইপিএলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিসিসিআই/আইপিএল আসন্ন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) মৌসুমের আগে দল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া ও পরামর্শ অনুসরণ করে, বিসিসিআই নির্দেশে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।’
তবে এভাবে মেস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ায় দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিসিসিআইয়ের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন ভারতের বিশ্বকাপজীয় অলরাউন্ডার মদন লাল। সমালোচনার করেছেন ভারতের কংগ্রেস দলীয় এমপি শশী থারুরও। মদন লাল বিজেপি সরকারের দিকে ইঙ্গিত করে অভিযোগ করেছেন, ওপরের নির্দেশেই মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে শশী থারুর প্রশ্ন তুলেছেন, ‘খেলাধুলাকে এভাবে নির্বিচার রাজনৈতিক রঙে রাঙানো আমাদের শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাবে?’
এবারকার আইপিএলের মিনি নিলামে মোস্তাফিজকে নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি লেগে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে তাকে দলে ভেড়ায় শাহরুখ খানের কলকাতা। মোস্তাফিজ আদৌ এবারের আইপিএলে খেলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে গত কিছুদিন নানা রকম খবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করা হচ্ছে দাবি করে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু অংশ, ধর্মীয় কিছু সংগঠন ও ধর্মীয় গুরুদের কয়েকজন মোস্তাফিজকে কলকাতা দলে নেওয়ার সমালোচনা করেছিলেন কড়া ভাষায়। কিছু সংগঠন ও নেতাদের কেউ কেউ মোস্তাফিজকে কলকাতা দল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন। মোস্তাফিজকে দলে নেওয়ায় কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিক শাহরুখ খানকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা সঙ্গীত সোম। ‘অল ইন্ডিয়া ইমাম অর্গানাইজেশন’-এর প্রধান ইমাম উমর আহমেদ ইলিয়াসি মোস্তাফিজকে কেনার জন্য শাহরুখ খানের সমালোচনা করেন। শাহরুখকে ক্ষমা চাইতেও বলেন তিনি। শিবসেনার নেতা সঞ্জয় নিরুপমও নাইটদের স্কোয়াড থেকে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার দাবি তোলেন।
আমরা আসলে কাকে শাস্তি দিচ্ছি : মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ায় বিসিসিআইয়ের কড়া সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস নেতা শশী থারুর। ভারতীয় এ রাজনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিক এই প্রশ্নও তুলেছেন, ‘আমরা আসলে কাকে শাস্তি দিচ্ছি- একটি দেশকে, একজন ব্যক্তিকে নাকি তার ধর্মকে।’ তিনি বলেন, ‘আমি সত্যিই মনে করি না যে, ক্রিকেটকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ভার বহন করতে দেওয়া উচিত। আমার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট- আমাদের উচিত কিছু ক্ষেত্রকে অন্য ক্ষেত্র থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা করা।’ থারুর আরও বলেন, ‘মোস্তাফিজুর রহমান একজন ক্রিকেটার, যার এসব ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ঘৃণাসূচক কথা, হামলা বা এমন কর্মকাণ্ডকে সমর্থন কিংবা ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য কখনো অভিযুক্ত হননি। তিনি একজন ক্রীড়াবিদ আর এ দুটি বিষয়কে মিশিয়ে ফেলাটা অনুচিত।’ থারুর ভবিষ্যতের কথাও ভেবেছেন। তার মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোকে খেলাধুলায় বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলাদা করে ফেলাটা ভারতের জন্য কখনোই গঠনমূলক ফল বয়ে আনবে না। তিনি বলেন, ‘যদি ভারত এমন দেশ হয়ে যায় যে তার সব প্রতিবেশী দেশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং বলে যে কারও সঙ্গেই তাদের খেলা উচিত নয়, তাতে কোনো উপকার হবে না। এ বিষয়ে আমাদের বড় মন ও হৃদয় থাকতে হবে।’
ওপর মহল থেকে চাপ ছিল : ওপর মহলের চাপে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন ভারতের হয়ে ১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী সাবেক অলরাউন্ডার মদন লাল। তিনি বলেন, বিসিসিআই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারণ, তাদের চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা কারও নেই। এমনকি শাহরুখ খানেরও না; কিন্তু খেলাধুলায় কেন এত রাজনীতি ঢুকছে? আমি জানি না ক্রিকেট কোন দিকে যাচ্ছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’র সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মদন লাল ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, খেলাধুলার ভেতরে রাজনীতির এ অনধিকার প্রবেশ মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। তার মতে, পরিস্থিতির চাপে বিসিসিআই অনেকটা একতরফাভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিসিসিআইয়ের অনুরোধেই ছাড়পত্র দিয়েছিল বিসিবি : নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের জন্য ৮ দিন বাদে আইপিএলে বাকি সময়ের জন্য মোস্তাফিজকে খেলার ছাড়পত্র দিয়েছিল বিসিবি। আইপিএলে মোস্তাফিজের খেলার ছাড়পত্র (এনওসি) বিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকেই অনুরোধ এসেছিল বলে জানান বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীন।
বিসিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, বিসিসিআই আনুষ্ঠানিকভাবে বিসিবিকে জানালেও খুব বেশি কিছু করার থাকবে না। বিসিবি বড়জোর অনুরোধ করতে পারে বিসিসিআইয়ের কাছে। কিন্তু আইপিএলে কে খেলবেন, সেটি ঠিক করবে বিসিসিআই ও ভারত সরকারই।
বন্ধ হতে পারে দ্বিপাক্ষিক সিরিজও : আনন্দবাজার পত্রিকা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে যেভাবে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বন্ধ করে দিয়েছে ভারত, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই একই অবস্থান নিতে চলেছে তারা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবিষ্যতে শুধু নিরপেক্ষ দেশে আইসিসি প্রতিযোগিতা ছাড়া আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত খেলবে না বলেই জানা গেছে। শিগগির এ সিদ্ধান্তের কথা বিসিবিকে জানিয়ে দেবে বিসিসিআই।
দ্বিপাক্ষিক সিরিজ নিয়ে অনিশ্চয়তার জেরে পাকিস্তান কঠোর অবস্থান নিয়েছে ভারতের বিরুদ্ধে। আইসিসি প্রতিযোগিতায়ও দুই দেশের ম্যাচ হচ্ছে নিরপেক্ষ দেশে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশও একই রকম অবস্থান নেয় কি না সে দিকে তাকিয়ে রয়েছেন অনেকেই।
এটি ভারতের হিন্দুদের জয় : বাংলাদেশের মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বিজেপির নেতা ও ধর্মীয় গুরুরা। বিজেপি নেতা সংগীত সোম বলেছেন, এটি পুরো ভারতের হিন্দুদের জয়। মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিজেপি নেতা সংগীত সোম বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেন, ‘১০০ কোটি সনাতনী ভারতীয়দের প্রতি লক্ষ রেখে বিসিসিআইয়ের এ সিদ্ধান্তের জন্য ধন্যবাদ। আমরা গতকাল বলেছিলাম, এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে, কারণ ১০০ কোটি মানুষের আবেগ-অনুভূতিকে হেলাফেলা করা যায় না। এটি গোটা দেশের হিন্দুদের জয়।’ উত্তর প্রদেশের মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা নরেন্দ্র কাশ্যপও বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন।
কেকে/ আরআই