সংকটের মুখে দেশের রপ্তানি খাত। টানা পঞ্চম মাসের মতো পতনের ধারায় রয়েছে দেশের রপ্তানি খাত। গত ডিসেম্বর মাসে দেশে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় এসেছে ৩৯৬ কোটি ৮২ লাখ মার্কিন ডলার। বছর ব্যবধানে যা কমেছে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। এ ছাড়া চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) দেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৯৯৮ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ২৪ হাজার ৫৩৩ দশমিক ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তুলনায় ২ দশমিক ১৯ শতাংশ কম।
গতকাল রোববার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে দেখা গেছে, গত ডিসেম্বর মাসে কমেছে দেশের রপ্তানি আয়। ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪৬২ কোটি ৭৪ লাখ ডলার।
গত ডিসেম্বর মাসে তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩২৩ কোটি ৪১ লাখ ডলারে। আর ২০২৪ সালের একই সময়ে এ আয় ছিল ৩৭৭ কোটি ৫ লাখ ডলার।
তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয়ের মধ্যে ১৬৩ কোটি ১৭ লাখ ডলার এসেছে নিটওয়্যার রপ্তানি থেকে, যা বছর ব্যবধানে ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ কমেছে। এ ছাড়া ১৬০ কোটি ২৩ লাখ ডলার এসেছে ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ১৪ দশমিক ৭১ শতাংশ।
ইপিবির তথ্যানুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে অন্যান্য উল্লেখযোগ্য খাতের মধ্যে কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে। ডিসেম্বর মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় হোম টেক্সটাইলের রপ্তানি আয় ৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ডলারে।
এ ছাড়া কৃষি পণ্যের রপ্তানি আয় ২৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ২৫ লাখ ডলারে। ২০২৪ সালের একই সময়ে যা ছিল ১০ কোটি ১ লাখ ডলার। আর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে ১২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি হয়েছে ৯ কোটি ৭১ লাখ ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য।
এদিকে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) তৈরি পোশাক, ওষুধ এবং চামড়াসহ ২৭ ধরনের পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি হয়েছে।
টানা পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি কমে যাওয়াকে দেশের বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকরা দুশ্চিন্তার বিষয় হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাল্টা শুল্কের কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেখানে বিক্রি কমেছে এবং প্রত্যাশিত ক্রয়াদেশও আসছে না।
অন্যদিকে, চীন ও ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপের কারণে ওই দুই দেশের উদ্যোক্তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে কম দামে পণ্য সরবরাহ করছে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তাই এই খাতের রপ্তানি কমলে সামগ্রিক রপ্তানিতেও প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, গত কয়েক মাস ধরে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক হার সারা বিশ্বের রপ্তানি বাজারকে বিশৃঙ্খল করে দিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে খোদ মার্কিন বাজারেও। বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
তিনি আরও বলেন, মার্কিন শুল্কের কারণে ভারত ও চীনসহ অন্যান্য দেশ সেখানে রপ্তানি করতে পারছে না। তাই তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছে এবং মূল্য কমিয়ে পোশাক রপ্তানির অর্ডার নিচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা একই ধরনের পণ্য দিয়ে অর্ডার নিতে পারছেন না, ফলে ইউরোপীয় বাজারেও আমাদের রপ্তানি কমছে।
হাতেম প্রশ্ন তুলেছেন, ‘তারা কীভাবে এতটা সফলভাবে অর্ডার পাচ্ছে?’ তার উত্তর হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের সরকার মার্কিন শুল্কজনিত প্রভাব কাটিয়ে উঠতে ব্যবসায়ীদের জন্য বিভিন্ন প্যাকেজ সহায়তা দিচ্ছে। সম্প্রতি তারা ৭,০০০ কোটি রুপির নতুন একটি সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদন করেছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে সরকার আইএমএফ কর্মসূচি ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের যুক্তি দেখিয়ে রপ্তানি খাতের নগদ সহায়তা ও অন্যান্য সুবিধা প্রত্যাহার করেছে। যেসব সামান্য সহায়তা ছিল, সেগুলোর মেয়াদও গত ডিসেম্বরে শেষ হয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে রপ্তানিকারকরা সরকারের কাছে এগুলো নবায়নের জন্য অনুরোধ জানাচ্ছেন। তারা বলছেন, এই সহায়তা না থাকলে রপ্তানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দেশের স্পিনিং মিলগুলোও বন্ধ হওয়ার পথে, যা রপ্তানি খাতের জন্য অশনি সংকেত।
হাতেম আরও বলেন, সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের আগে রপ্তানি আদেশ কিছুটা কমে যায়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে নির্বাচনের পর সরকার যদি শিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আগামী জুনের পর রপ্তানি আবার ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসতে পারে।
কেকে/ এমএস