মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার নীলনকশা
রোকন উদ্দিন
প্রকাশ: সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:৪৯ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতি এখন বেশ সরগরম। ইতোমধ্যে প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল ও যাচাই-বাছাই শেষ হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ভোটগ্রহণ। সে হিসেবে নির্বাচনের বাকি সময় আর মাত্র ৩৭ দিন। তবে ভোটের সময় যত এগিয়ে আসছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে তেমন কোনো দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনই অপ্রীতিকর ঘটনার খবর মিলছে। মনোনয়নপত্র বাতিলসহ নানা ইস্যুতে অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের  ‘আগামী নির্বাচন হবে ইতিহাসের সেরা নির্বাচন’ এই বক্তব্য বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হবে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে সংশয়। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও এটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি পরিকল্পনা এখন থেকেই শুরু হয়েছে। তাদের মতে, কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচনের ফল নিয়ে বিতর্ক তৈরির লক্ষ্যেই কাজ করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বলেছেন, নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন বিতর্কিত হলে দিনের শেষে প্রধান উপদেষ্টা সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হবেন। তার দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সরকারকে প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জনগণের সামনে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে না পড়ে।

সম্প্রতি নিজের ইউটিউব চ্যানেলে তিনি এসব নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাপক কারচুপির চেষ্টা হবে এমন একটি আলোচনা পরিকল্পিতভাবে সামনে আনা হচ্ছে। এ প্রচেষ্টা শুধু দেশের ভেতর থেকেই নয়, বরং দেশের বাইরের কিছু প্রভাবশালী ইনফ্লুয়েন্সারের বক্তব্যেও ধীরে ধীরে উঠে আসছে। সময় যত গড়াবে, এই আলোচনা তত জোরালো হবে এবং নির্বাচনের পর এটিকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, আসন্ন নির্বাচনকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নির্বাচন হিসেবে প্রচার করলেও আমি এটা আসলে মনে করি না। বরং কিছু এলাকায় সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে বিএনপি ও জামায়াতের শক্তির ব্যবধান কম, কিংবা যেখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকতে পারে, সেখানে সংঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, সহিংসতা বাড়ার একটি বড় কারণ হতে পারে দুর্বল ডিটারেন্ট ব্যবস্থা। 

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে যে জামায়াত আসন্ন নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্য পেতে যাচ্ছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পরিচালিত জরিপ, পোল ও প্রচারণার মাধ্যমে এ ধারণা ছড়ানো হচ্ছে। এ ধরনের হাইপ তৈরি করার দুটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে। একদিকে এটি জামায়াতের পক্ষে ভোট ও আসন বাড়াতে সহায়ক, অন্যদিকে নির্বাচনের ফল প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে সেটিকে কারচুপির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ করার পথ তৈরি করে।

বাস্তবে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা সীমিতসংখ্যক আসন পেলেও পরে দাবি করা হতে পারে তারা জয়ী হওয়ার অবস্থায় ছিল, কিন্তু প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় বিএনপির পক্ষে কারচুপি হয়েছে। তিনি বলেন, এভাবে নির্বাচনের পর অস্থিরতা তৈরির একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে এবং বিএনপির এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

এদিকে প্রশাসন বিএনপির দিকে ঝুঁকে গিয়েছে ইতোমধ্যেই এমন মন্তব্য করেছেন কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ। গতকাল শুক্রবার বিকালে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। 

নিজের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ যে আচরণ আমরা প্রত্যাশা করি, সেটা নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এখানে এসে নির্বাচনে প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ থাকবে, সেটা নিয়ে আমি শঙ্কা প্রকাশ করছি।’

এনসিপির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ জানান, বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর বিরুদ্ধে ব্যাংকের ঋণখেলাপের অভিযোগ আছে। তিনি বিগত সময়ে একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে লোন নিয়ে সেটি আর ফেরত দেননি। তিনি এসব তথ্য গোপন করেছেন, হাইকোর্টের দেওয়া স্থগিতাদেশের তথ্যও তিনি গোপন করেছেন। এটি ব্যক্তিগত তথ্য গোপনের পর্যায়ে পড়ে। নির্বাচনি আচরণবিধিমালায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো প্রার্থী যদি হলফনামায় তথ্য গোপন করেন, তাহলে তার প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রয়েছে।

এসব অভিযোগের পর্যাপ্ত যুক্তি এবং পর্যাপ্ত তথ্য তুলে ধরার পরও রিটার্নিং কর্মকর্তা এসব আমলে নেননি বলে দাবি করেন হাসনাত। প্রশাসনের নিরপেক্ষ আচরণের প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, প্রশাসন বিএনপির দিকে ঝুঁকে গিয়েছে।’ প্রশাসনের এই ‘দ্বিচারিতামূলক’ আচরণের মধ্যে নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হবে, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

এর আগে কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী হলফনামায় তথ্য গোপন করেছেন এই অভিযোগ প্রসঙ্গে বাহাসে জড়িয়ে পড়েন হাসনাত আবদুল্লাহ ও বিএনপির কর্মী সমর্থকেরা। এ সময় জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে দেখা দেয় হট্টগোল। প্রায় এক ঘণ্টা এ অবস্থা চলতে থাকে। এ সময় দুপক্ষই তাদের দাবির পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় আসন্ন ত্রায়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৩ আসনে (উলিপুর) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুল আলমের সালেহীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। গতকাল রোববার দুপুরে জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং অফিসার অন্নপূর্ণা দেবনাথের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করেন। এর আগে গত ২ জানুয়ারি কুড়িগ্রাম-৩ আসনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাই প্রক্রিয়ায় জামায়াত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়নপত্র স্থগিত করেন রিটার্নিং অফিসার।

মনোনয়ন বাতিল ঘোষণার পর প্রতিবাদে সম্মেলন কক্ষের ভেতর ও বাইরে জামায়াতের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

জামায়াত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহী জানান, ‘রিটার্নিং কর্মকর্তা কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মনোনয়ন পত্রটি বাতিল করেছেন। আমাদের কোনো কথা শোনেনি এবং আমার কোনো কাগজপত্র দেখতেও চাননি। আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।

রিটার্নিং কর্মকর্তা অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘নির্বাচনি নীতিমালা ও আইনের মধ্যে থেকে মনোনয়ন পত্র যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এখানে পক্ষপাতিত্ব কিংবা প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ নেই। সংক্ষুব্ধ পক্ষ আপিল করতে পারবেন।’

এর মধ্যেই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাছাই-বাছাইয়ে কোনো কোনো রিটার্নিং অফিসারের কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি বলছে, তথ্য প্রমাণ, কাগজপত্র দাখিল করার পরও উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রার্থিতা বাতিল করে দেয়া মোটেও সমীচীন হয়নি। অপ্রয়োজনীয় ও অহেতুক কিছু বিষয়ে যা আইনের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমন বিষয় ধরে প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। কোন একটি মহলের ইন্ধনে এসব করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মাণ হচ্ছে বলেও মনে করে জামায়াতে ইসলামী।

দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল রোববার এক বিবৃতিতে বলেন, সারা দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করার পর এমপি পদপ্রার্থীগণের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। এই যাচাই-বাছাইয়ের সময় কোনো কোনো জেলার রিটার্নিং অফিসারদের কর্মকাণ্ডে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। কোনো কোনো জেলায় তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

তিনি বলেন, রিটার্নিং অফিসারের ব্যক্তিগত এখতিয়ারে পড়ে বা তিনি ব্যক্তি বিবেচনায় ছাড় দিতে পারতেন এমন ক্ষেত্রেও কঠোর নীতি অবলম্বন করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যমূলকভাবে রিটার্নিং অফিসারদের বাড়াবাড়ি করার কারণে অনেক যোগ্য প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। প্রদত্ত তথ্য প্রমাণ, কাগজপত্র দাখিল করার পরও উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রার্থিতা বাতিল করে দেওয়া মোটেও সমীচীন হয়নি। অপ্রয়োজনীয় ও অহেতুক কিছু বিষয়ে যা আইনের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমন বিষয় ধরে প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, কোনো একটি মহলের ইন্ধনে এসব করা হচ্ছে বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মাণ হচ্ছে। এ রকম চলতে থাকলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কীভাবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হবে তা দেশবাসীর কাছে বড় প্রশ্ন। রিটার্নিং অফিসাররা যেন এ ধরনের গুরুত্বহীন তুচ্ছ ঘটনায় কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল না করেন সে ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। তুচ্ছ অজুহাতে যাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে তাদের প্রার্থিতা অবিলম্বে বৈধ ঘোষণার জন্য আমি নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সবার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে নির্বাচনের মাঠ সমতল করার জন্য আমি নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। 

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  নির্বাচন   প্রশ্নবিদ্ধ   নীলনকশা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close