চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকায় পরিবেশ ও বন আইন লঙ্ঘন করে খননযন্ত্রের সাহায্যে বিশাল পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। একই কৌশলে সড়ক নির্মাণের নামে পাশের আরও দুটি পাহাড় কর্তন করা হয়। পাহাড়গুলো চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের অধীন নারায়াণহাট রেঞ্জের ধুরুং বনবিটের সংরক্ষিত বনভূমির অন্তর্ভুক্ত।
পাহাড় কাটার মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছে পাশের উর্বর কৃষিজমি। এতে এলাকার স্বাভাবিক ভূ-প্রকৃতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনাস্থলে কোনো সরকারি অনুমোদন, প্রকল্পের নামফলক কিংবা সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। কাটা পাহাড়ের ঢালে গাছ ও বাঁশ ব্যবহার করে কয়েক কক্ষের একটি স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, যা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে চালুর প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ধর্মীয় অনুসারীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাউজান থেকে এসে হাফেজ মুহাম্মদ শাহ আলম নঈমী দীর্ঘদিন ধরে পাইন্দং এলাকায় একটি দরবারে অবস্থান করছেন। পরে ধাপে ধাপে শুরু হয় বন বিভাগের জমি দখল ও পাহাড় কর্তনের কার্যক্রম।
গত রোববার বিকেলে কাঞ্চননগর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ধুল্যাছড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে কেটে সমান করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের আলোতেই দীর্ঘ সময় ধরে পাহাড় কাটার কাজ চললেও সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরের তদারকি চোখে পড়েনি।
কর্তনকৃত পাহাড়টি দেখভালের দায়িত্বে থাকা মাস্টার হারুন বলেন, ‘জায়গাটি মূলত রিজার্ভ ফরেস্টের। আমরা গত বছর জায়গাটি দখলে নিয়েছি। এখানে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হবে। পাহাড়টি কেটে উপযোগী করতে প্রায় ১০ লাখ টাকা স্কেভেটর ভাড়া দিতে হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাহাড় কাটার বিষয়টি সবাই জানে। কেউ বাধা দেয়নি। হুজুরের দরবারে বড় বড় সাংবাদিক, নেতা ও প্রশাসনের লোকজন আসেন- আমাদের কিছু হবে না।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, হাফেজ মুহাম্মদ শাহ আলম নঈমী একজন ধর্মীয় পীর। তার প্রতিষ্ঠিত রাহমাতুল্লিল আলামীন কমপ্লেক্স ও আঞ্জুমানে নঈমীয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় ‘জালালীয়া রজবীয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়’ স্থাপনের নামে এই পাহাড় কর্তন করা হয়েছে। একইভাবে তার প্রতিষ্ঠিত জালালীয়া রজবীয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসার নির্মাণকালেও পাহাড় কাটার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পাইন্দং ইউনিয়নের আমতল রাবারবাগান এলাকায় আশরাফাবাদ দরবার শরীফের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রেও পাহাড় কাটার তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকাতেও একই কৌশলে দখলকৃত জায়গায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বারবার একই ধরনের অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে- ধর্মীয় প্রভাবের কারণে নাকি প্রশাসনিক সমঝোতায় এসব অবৈধ কার্যক্রম বছরের পর বছর চলমান রয়েছে।
কাঞ্চননগর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছে এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পাহাড় কেটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের কথা স্বীকার করে জালালাবাদ দরবার শরীফের পীর হাফেজ মুহাম্মদ শাহ আলম নঈমী বলেন, ‘আমি শাহ জালাল বাবার নামে এখানে সড়ক করেছি, মাদ্রাসা করেছি। এখন একটি স্কুল করছি।’
ধুরুং বনবিটের জায়গা দখলের বিষয়টি স্বীকার করেন বিট কর্মকর্তা অবনী কুমার ত্রিপুরা। তবে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার সঙ্গে অভিযুক্ত পক্ষের গোপন সমঝোতা রয়েছে।
নারায়াণহাট রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক খান মো. আবরারুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি তার জানা ছিল না। পরিদর্শনের পর জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুহিবুল্লাহ বলেন, ‘টিলা-পাহাড় কর্তন জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মারাত্মক হুমকি। পাহাড় ধ্বংস হলে বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে। এটি আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘পাহাড়-টিলা কর্তন পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। বন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, ‘কর্তনকৃত স্থান পরিদর্শন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কেকে/ আরআই