কক্সবাজারের টেকনাফে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের দুই নম্বর ও চার নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকটি এলাকায় প্রকাশ্যেই চলছে অবৈধ পাহাড় কাটার মহোৎসব। দিনের পর দিন পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি ও ভরাট কাজে ব্যবহার করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ নেই। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে ঝুঁকির মুখে পড়ছে পাহাড়সংলগ্ন বসতবাড়ি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী।
স্থানীয় তথ্য সূত্রে জানা যায়, টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যংয়ের আমতলী এলাকায় রাতের আঁধারে ও কখনো প্রকাশ্যেই এক্সকাভেটর (ভেকু) ও শ্রমিক দিয়ে পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব মাটি বিভিন্ন স্থানে ভরাট ও নির্মাণ কাজসহ ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কিছু সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে।
হোয়াইক্যং দুই নম্বর ওয়ার্ডে আমতলী এলাকায় পাহাড় কাটা মিশনে থাকা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। গত বছরের ২০ আগস্ট হোয়াইক্যং দুই নম্বর ওয়ার্ড আমতলী এলাকায় অবৈধভাবে পাহাড় কাটার দায়ে এক ব্যবসায়ীকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওই অভিযানে হোয়াইক্যংয়ের মোহাম্মদ আলমকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তার ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থেকে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রির প্রমাণ মেলে। অভিযানে বনবিভাগ ও টেকনাফ মডেল থানার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন টেকনাফ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাকিব হাসান চৌধুরী। পাহাড় কেটে মাটি বিক্রির অভিযোগে বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ১৫ (১) ধারায় দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এদিকে হোয়াইক্যংয়ের চার নম্বর ওয়ার্ডের দৈংগাকাটা, লাতুরীখোলা এলাকায় অবৈধভাবে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রির মিশনে থাকা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে স্থানীয়রা।
হোয়াইক্যং চার নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পরিবেশ রক্ষায় আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দিনে কিংবা রাতের আঁধারে নির্বিচারে পাহাড় কেটে ফেলা হচ্ছে। যা পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি। পাহাড় কাটার ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, নিয়মিত মাটি বহনকরা ড্রাম ট্রাক হোয়াইক্যং-শামলাপুর সড়কের পরিবেশ নষ্ট করছে। স্থানীয়রা ধুলাবালুর জন্য চলাফেরা করতে হিমশিম খাচ্ছে। পরিবেশ এর ভারসাম্য ৪নং ওয়ার্ডের প্রকৃতি রক্ষার্থে, প্রকৃতি যাতে ধ্বংস না হয়, সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। এ ছাড়া পাহাড় ধ্বংসের কারণে বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বিলুপ্ত হচ্ছে, কমে যাচ্ছে সবুজ আচ্ছাদন।
স্থানীয়রা আরও জানান, চার নম্বর ওয়ার্ডে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ইটভাটায় মাটি সরবরাহ করছে এবং নিচু জায়গা ভরাটসহ নানা ভরাট কাজে তা ব্যবহার করছে। এতে একদিকে অবৈধভাবে পাহাড় ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে ইটভাটা ও ভরাট কাজের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
এভাবে পাহাড় কাটা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। তাই পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে পাহাড় কাটা বন্ধে, উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা ভূমি, বন বিভাগের মাধ্যমে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা সভাপতি এইচএম এরশাদ জানান, ‘কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যংয়ে বিভিন্ন এলাকায় যে পাহাড় কাটা হচ্ছে সে গুলো অনেক উঁচু উঁচু পাহাড়। পাহাড় কাটা এটি পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি ও পরিবেশবিধ্বংসী অপরাধ। বিশেষ করে টেকনাফের উপকূলীয় পাহাড়ি এলাকার পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে টেকনাফ উপজেলা প্রশাসনের প্রতি হস্তক্ষেপ কামনা করছি’।
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমামুল হাফিজ নাদিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি টেকনাফে সদ্য যোগদান করেছি। পাহাড় কাটা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান করে তাকে। পাহাড় কাটার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এ বিষয়ে ভূমি অফিসের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
পাশাপাশি পাহাড় কাটা রোধে স্থানীয় জনগণকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকলে ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যাবে। বর্ষা মৌসুমে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, স্থানীয় কিছু সিন্ডিকেট ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। পাহাড় কাটা একটি গুরুতর অপরাধ এবং এতে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। এর ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয় এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। পরিবেশ অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা মহোদয়ের প্রতি অনুরোধ যারা পাহাড় কেটে সাবার করছে, পরিবেশের চরমভাবে ক্ষতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহলরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বারবার অভিযোগ দিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না। পাহাড় কাটা বন্ধ না হলে আমাদের জীবন হুমকির মুখে পড়বে। ভবিষ্যতে পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। দ্রুত অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর অভিযান, দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং পরিবেশ রক্ষায় স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাকিব হাসান চৌধুরী বলেন, ‘পাহাড় কাটার বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তর কে জানান। পাহাড় কাটা বন্ধে আমার একার পক্ষে সবকিছু সম্ভব না। বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর আছে সবার একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকতে হবে। আমি এ বিষয়ে বন বিভাগকে জানাচ্ছি। পাহাড় কাটা বন্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রেখেছি।’
কেকে/এমএ