কুড়িগ্রামের রৌমারীর বাওয়াইর গ্রামের বহুদিনের স্বপ্নের সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখনো সংযোগ সড়ক নির্মাণ হয়নি। ফলে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করতে পারছেন না এলাকাবাসী। এতে কয়েকটি গ্রামের সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পাঁচ মাস আগে সংযোগ সড়ক নির্মাণের উদ্দেশ্যে ঠিকাদার গাইডওয়ালের খুঁটি স্থাপন করেছিলেন। তবে পরে তাকে সেই খুঁটি তুলে ফেলতে বাধ্য করা হয়। সেতু নির্মাণে নিয়োজিতরা মাটি ফেলে সংযোগ সড়ক তৈরি করতে চাইলেও উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের গোলাবাড়ি এলাকার শাহাজাহান মন্ডল ও তার লোকজন এতে বাধা দিচ্ছেন।
তারা আরও জানান, সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতু দিয়ে চলাচল কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থী, রোগীসহ সাধারণ পথচারীদের যাতায়াত সহজ হবে—এমন যে আশা ছিল, তা এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে।
সেতু নির্মাণ কাজের দায়িত্বে থাকা রৌমারী উপজেলা উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর বলেন, “নির্মিত সেতু থেকে প্রায় দুই মিটার পুরাতন সড়কের পাশ দিয়ে একটি খাল রয়েছে শাহাজাহান মন্ডলের। সেই খালটি ভরাট করে চান ঠিকাদারের কাছে। এতে ঠিকাদার রাজি হন।”
তিনি বলেন, “সংযোগ সড়ক দিতে মাটি ফেলবেন ড্রেজার দিয়ে, সেই ড্রেজারের পানির সঙ্গে মাটি যাবে। এই মাটিতেও যদি সম্পূর্ণ ভরাট না হয়, পরবর্তীতে তা পূরণ করে দেওয়া হবে। তারপরও মাটি ফেলতে দিচ্ছেন না তিনি।”
উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, ২০২২–২৩ অর্থবছরে রৌমারী উপজেলার কর্তিমারী জিসি ভায়া বড়াইবাড়ি বিওপি ক্যাম্প সড়কের ২ হাজার ৮০ মিটার চেইনেজে ৬০ দশমিক ০৬ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি আরসিসি গার্ডার সেতু নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে জামালপুরের মেলানহদ এমসিই–এমবিই জেভি নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী সামসুদ্দিন হায়দার কাজটি পান।
সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৫ কোটি ৮৯ লাখ ৪৪ হাজার ৫৮০ টাকা। নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ১৭ নভেম্বর এবং শেষ করার কথা ছিল ২০২৩ সালের ১৭ মে। তবে নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই বছর পর, ২০২৫ সালের জুন মাসে সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়।
নুরুজ্জামান নামের এক অটোভ্যান চালক জানান, তিনি কর্তিমারী বাজার থেকে বাওয়াইর গ্রামে নির্মিত সেতু পর্যন্ত গাড়ী চালান। এতে জনপ্রতি ভাড়া পান ১০ টাকা, আর সেতুর সংযোগ সড়ক থাকলে চুলিয়ারচর পর্যন্ত যাওয়া যেতো। এতে ভাড়া পেতেন ২০ টাকা।
তিনি আরও জানান, যাওয়া-আসা করতে ভাড়া পেতেন ৪০ টাকা। কিন্তু সংযোগ সড়ক দিতে বাধা দেওয়ার কারনে ভাড়া কম পাচ্ছেন তিনি। একই কথা বলেন, অটোভ্যান চালক বাদশা মিয়া।
এক শিক্ষার্থী বলেন, “সেতুর সংযোগ সড়ক না থাকার কারনে সিঁড়ি বেয়ে ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। উঠা-নামা করতে কখন যেন দুর্ঘটনা ঘটে যায়!”
ঠিকাদার সামসুদ্দিন হায়দার জানান, সেতু নির্মাণ কাজ করতে গিয়ে অনেক বাধার সম্মুখে পড়তে হয়েছে। ওই জায়গায় যাদুরচর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি শাহাজাহান মন্ডলসহ কয়েকজনের জমি আছে। তাই সেতু নির্মাণের কাজ করতে বাধা দেন তারা। এ কারনে সেতু নির্মাণের জন্য শাহাজাহান মন্ডলকে দিতে হয়েছে ৪ লাখ টাকা, আবার ছক্কু নামের এক ব্যক্তিকে দিতে হয়েছে তিন লাখ টাকা আর সড়ক লাগোয়া বাড়ি থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য হাসমত আলীর আধা-পাকা ঘর করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ওই সেতু নির্মাণের কাজের মালামাল চুরি হয়ে গেছে ১০ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা।
তিনি আরও জানান, সেতু নির্মাণের কাজ শেষ করা হয়েছে ২০২৫ সালের জুন মাসে। পাঁচ-ছয় মাস আগ থেকে (অ্যাপ্রোচে) সংযোগ সড়কের জন্য মাটি ফেলতে গাইডওয়ালের খুঁটি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মাটি ফেলতে দেবেন না বলে সেই খুটিগুলো তুলে ফেলতে বাধ্য করিয়েছেন শাহাজাহান মন্ডল নামে ওই বিএনপি নেতা। সড়কের পাশ দিয়ে জমি রয়েছে বলে সংযোগ সড়ক করতে মাটি ফেলতে বাধা দিচ্ছেন বার বার। আবার আমাকে জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী দিয়ে দ্রুত কাজ করার জন্য চাপও দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে শাহাজাহান মন্ডল বলেন, “সেতুর সড়কের জায়গাটি আমাদের রেকর্ডীয় সম্পত্তি। সেতুর সংযোগ রাস্তায় আমার প্রায় এক বিঘা জমি চলে গেছে, তাহলে ওই জমির দাম দেন।”
সেতু নির্মাণের জন্য ঠিকাদারের কাছে ৪ লাখ টাকা নেওয়া বিষয়টি অস্বীকার করেছেন শাহাজাহান মন্ডল। তিনি রেগে গিয়ে বলেন, “ঠিকাদারের কাছে আমি ৩০ লাখ টাকা নিয়েছি। তাতে তোমার কি।”
রৌমারী উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মুনছুরুল হক বলেন, “দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
কেকে/ আরআই