আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়নপত্র বাছাই প্রক্রিয়া ঘিরে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ও অভিযোগ বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অভিযোগ করছেন, মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। সামান্য ত্রুটি দেখিয়ে অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হলেও একই ধরনের ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বহাল রাখা হয়েছে বলে দাবি তাদের।
মনোনয়নপত্র যাচাই শেষে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী, সারা দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এর পরপরই বিভিন্ন আসন থেকে আপিল, সংবাদ সম্মেলন ও লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা।
ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা মনোনয়নপত্র বাতিলের ঘটনায় আপত্তি জানিয়ে বলেছেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ওই আসনের মোট ভোটারের ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর নিতে হয়। এই এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের চেয়েও আমি প্রায় ২০০ বেশি স্বাক্ষর জমা দিয়েছি। সেখান থেকে নির্বাচন কমিশন ১০ জনের তথ্য যাচাই করতে গিয়েছিলেন, তার মধ্যে ৮ জনের তথ্য সঠিক পেয়েছেন, বাকি ২ জনের সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে ওই দুইজন ঢাকা-৯-এর ভোটার নন, ওই দুইজন জানতেন ঢাকা-৯-এর ভোটার তারা। তাদের ঠিকানা খিলগাঁও হলেও এলাকার কিছু অংশ ঢাকার আরেকটি আসনের সঙ্গে যুক্ত। প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করেছি, আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।’
গণসংহতি আন্দোলনের (জিএসএ) অভিযোগ, সারা দেশে বিভিন্ন তুচ্ছ ও ঠুনকো কারণ দেখিয়ে বিভিন্ন আসনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। দলটি সারা দেশে ৩৩৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের ঘটনাকে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন।
দলটির মতে, একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান ধাপ। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য এই নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তাই ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তির সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
মানিকগঞ্জ-৩ আসনে এক স্বতন্ত্র প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, তার মনোনয়নপত্র সামান্য কাগজপত্রের ত্রুটির কথা বলে বাতিল করা হয়েছে। অথচ একই ধরনের ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও দলীয় প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা স্পষ্ট বৈষম্যের উদাহরণ বলে তিনি মনে করেন।
নেত্রকোনা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. দোলোয়ার হোসেন ভুঁইয়া অভিযোগ করেন, মনোনয়নপত্র দাখিল ও যাচাইয়ের পর তার ওপর এবং তার সমর্থকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। নির্বাচনি মাঠে থাকতে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, সমর্থকরা আমার পক্ষে স্বাক্ষর করায় তাদের হামলা করে প্রাণনাশের হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছে। আমি সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছি। ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেছি।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১৬টি সংসদীয় আসনে স্বতন্ত্রসহ বিভিন্ন দলের ৪০টির বেশি মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এখানকার স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অভিযোগ, সমর্থক স্বাক্ষর যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কঠোরতা শুধু তাদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সিলেট অঞ্চলের ছয়টি আসন, সাতক্ষীরার চারটি আসন, ঢাকা জেলার একাধিক আসন এবং অন্যান্য জেলাতেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন। প্রার্থীদের দাবি, আপিল শুনানিতে যেন নিরপেক্ষভাবে বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয় এবং রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না আনা হয়।
ইসির দেওয়া তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হওয়া ৭২৩ প্রার্থীর মধ্যে ৩৬৬ জনই স্বতন্ত্র প্রার্থী, যা মোট বাতিলের ৫০ দশমিক ৬২ শতাংশ। অথচ এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ৪৭৮ জন। ফলে মোট স্বতন্ত্র প্রার্থীর ৭৬ দশমিক ৫৭ শতাংশের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র বাতিলের প্রধান কারণ ছিল নির্বাচনি এলাকার ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক সইয়ে গরমিল। এ ছাড়া ঋণখেলাপি হওয়া, হলফনামায় ভুল বা গোপন তথ্য, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ত্রুটি, মৃত ভোটারের সই, মামলা সংক্রান্ত তথ্য গোপন ও দ্বৈত নাগরিকত্বের জটিলতাও বাতিলের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন বলছে, মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নির্বাচন আইন ও বিধি অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিশনের দাবি, রাজনৈতিক দল বা স্বতন্ত্র-সব প্রার্থীর ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছে। সংক্ষুব্ধ প্রার্থীদের জন্য আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আপিলের সুযোগ রাখা হয়েছে এবং সেসব আপিল আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে। আপিল শুনানিতে যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারলে প্রার্থিতা পুনর্বহাল করা হবে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ও গণভোটে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গত তিন দিনে ২৯৫টি আপিল আবেদন জমা দিয়েছেন। প্রথম দিন ৪২টি আবেদন জমা পড়ে। দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার ১২২টি আবেদন করা হয়। সর্বশেষ তৃতীয় দিন গতকাল বুধবার আপিলের আবেদন করা হয়েছে ১৩১টি।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে নিষ্পত্তি না হলে নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে মনোনয়নপত্র পর্যায়েই সমান সুযোগ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। মনোনয়নপত্র সংক্রান্ত আপিল ও পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে নির্বাচনি পরিবেশ কতটা গ্রহণযোগ্য হবেÑ এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেকে/এমএ