আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতারা। এমনকি মিত্র প্রার্থীদের মেনে নিতে অনীহা দেখা যাচ্ছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও। যা নিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন শরিক দলের প্রার্থীরা। অধিকাংশ আসনে বিদ্রোহীদের কাছে হারার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে মিত্রদের। ফলে এ নিয়ে শরিকদের মধ্যে একধরনের ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
মিত্রদের অভিযোগ- বিএনপির আশ্বাসে তারা নির্বাচনি মাঠে নামলেও বাস্তবে দলটির পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না। উল্টো প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে দাঁড়িয়েছেন বিএনপিরই প্রভাবশালী নেতারা। এতে আসন সমঝোতা চাপের মুখে পড়েছে। অনেকেই বিষয়টি নিয়ে বিএনপির হাইকমান্ডের দ্বারস্থ হয়েছেন।
তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ডেকে সমাধানের আশ্বাস দিলেও এরই মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ৯ নেতাকে বহিষ্কার করেছে। ফলে আবার এই বহিষ্কার নিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। বিদ্রোহীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ বহিষ্কার করায় বিষয়টি ভালোভাবে নেননি অনেক নেতাকর্মী। কেউ কেউ এটিকে বিএনপির কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবেও দেখছেন। তাদের মতে, বহিষ্কারের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পথ বন্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্রোহীদের নির্বাচনে লড়ার পরোক্ষ ‘গ্রিন সিগন্যাল’ হিসেবেই কাজ করছে।
তবে বিএনপির সূত্র জানিয়েছে, দলের আগামী স্থায়ী কমিটির মিটিং বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। অতিসম্প্রতি রাজধানীর গুলশান কার্যালয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মিত্রদের ছেড়ে দেওয়া আসনের প্রার্থীরা। তারা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে তারেক রহমানকে অবহিত করেন। মিত্র দলগুলোর যারা সাক্ষাৎ করেন তাদের মধ্যে রয়েছেন- ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, ঢাকা-১২ আসনের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। এসব আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও বিদ্রোহী প্রার্থীদের ডেকে আলোচনা করে সমাধান করার বিষয়ে আশ্বাস দেন।
যেসব আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে তার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব সবচেয়ে চ্যালেঞ্জর মুখে পড়েছেন। ওই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সদ্য বহিষ্কৃত বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। স্বৈরাচার হাসিনা আমলে সংসদে ঝড় তোলা সাবেক এই এমপি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ জনপ্রিয়। সেজন্য ভোটের মাঠে তার শক্ত অবস্থান রয়েছে।
জানতে চাইলে এ বিষয়ে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, রুমিন ফারহানাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাই বহিষ্কৃত নেতার পাশে দলের কোনো নেতাকর্মী দাঁড়ায় না। তবে রুমিন ফারহানা বলেছেন, দল বহিষ্কার করলেও এলাকাবাসী তাকে বহিষ্কার করেনি। সাধারণ মানুষ তার সঙ্গে রয়েছে।
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে জোনায়েদ সাকীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। দল থেকে পলাশকে বহিষ্কার করলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সেজন্য তাকে চ্যালেঞ্জ মনে করছেন জোনায়েদ সাকী।
ঢাকা-১২ আসনে সাইফুল হকের বিপক্ষে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব। স্থানীয় হওয়ার কারণে নীরবের প্রভাব রয়েছে। সেজন্য তাকে চ্যালেঞ্জ মনে করছেন সাইফুল হক। বিষয়টি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাতে তুলে ধরেছেন তিনি।
সিলেট-৫ আসনে (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) জমিয়তের শীর্ষ নেতা মাওলানা ওবায়দুল্লা ফারুকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন সদ্য বহিষ্কৃত জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মামুনুর রশিদ (চাকসু মামুন)। সাবেক এই ছাত্রনেতা মনোনয়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করে আসছিলেন। তিনিও জোটের এই প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারেন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ওদিকে নায়ারণগঞ্জ-৪ আসনে জোটের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমির বিরুদ্ধে নির্বাচন করবেন সদ্য বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা ও সাবেক এমপি গিয়াউদ্দিন ও শাহ আলম। দুজনই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। বিএনপির এই দুই বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন জোটের এই প্রার্থী। পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার সভাপতি নুরুল হক নুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন সদ্য বহিষ্কৃত বিএনপির নির্বাহী সদস্য মো. হাসান মামুন। সাবেক এই কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতার এলাকায় শক্ত প্রভাব রয়েছে। ভোটের মাঠে হাসান মামুনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে ভিপি নূরকে। এদিকে সবচেয়ে বেকায়দায় পড়েছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। বিএনপির কাছে ছাড় পাওয়া বগুড়া-২ আসনের পাশাপাশি ঢাকা-১৮ আসনেও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন তিনি। ঢাকায় বৈধ হলেও বগুড়ায় অবৈধ হয়েছে মান্নার মনোনয়নপত্র।
এদিকে বগুড়া-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন পেয়েছেন মীর শাহে আলম। আর ঢাকা-১৮ আসনে এস এম জাহাঙ্গীর আলমকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। এই সমস্যাগুলো তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তুলে ধরেছেন মান্না। এদিকে স্বস্তিতে নেই নিজের দল বিলুপ্ত কিংবা পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর মনোনয়ন নিশ্চিত করা প্রার্থীরাও। ঝিনাইদহ-৪ আসনে গণঅধিকার থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। সাবেক এই ছাত্রনেতাও এলাকায় শক্ত অবস্থান রয়েছে।
এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে সৈয়দ এহসানুল হুদা, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে শাহাদাত হোসেন সেলিম, কুমিল্লা-৭ আসনে রেদোয়ান আহমেদও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন।
এ বিষয়ে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোটে লড়বেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বিএনপি।’
কেকে/এমএ