মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
দুই মাসের আয়ে চলে দশ মাস
মো. নেজাম উদ্দিন, কক্সবাজার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:৩০ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

১২ মাসের মধ্যে আয়-উপার্জনের সময় থাকে দুই মাস। আর এই দুই মাসের আয়-উপার্জনের টাকা দিয়ে চলতে হয় বছরের বাকি ১০ মাস। যার কারণে কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনের প্রায় ১০ হাজার মানুষ এখন অসহায়। আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত পর্যটক যাতায়াত করতে পারবেন। এরপর বন্ধ হয়ে যাবে পর্যটন চলাচল। বন্ধ হয়ে যাবে দ্বীপবাসীর উপার্জনের বড় অবলম্বন।  

প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য দেখার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটক আসেন কক্সবাজারে। তবে মনোরম এই দ্বীপটি পর্যটকদের জন্য মাত্র দুই মাস উন্মুক্ত। বছরের বাকি ১০ মাস সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং যে দুমাস পর্যটক যাবে তাতেও নির্ধারণ করা হয়েছে কতজন পর্যটক যেতে পারবে। 

এদিকে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের রাত্রীযাপন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হওয়ার কারণে দ্বীপের ১০ হাজার বাসিন্দা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। এতে দুর্বিষহ হয়ে পড়বে জীবনযাপন। এভাবে চললে একসময় জনশূন্য হয়ে যেতে পারে সেন্টমার্টিন এলাকা। এমনটাই ধারণা করছেন সাধারণ মানুষ। পর্যটন খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্টরা। 

দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান, যা কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। মনোমুগ্ধকর দ্বীপটির স্ফটিক-স্বচ্ছ নীল জলরাশি, জীবন্ত প্রবাল প্রাচীর, নারকেল গাছের সারি আর সামুদ্রিক জীবনের প্রাচুর্য পর্যটকদের সব সময় কাছে টানলেও, সেখানে ভ্রমণে বিধি-নিষেধ আরোপ করে অন্তর্বর্তী সরকার। 

বন্ধ করা হয় দ্বীপটিতে রাত্রিযাপন। দুই মাস সেখানে রাত্রিযাপনের সুযোগ মিলেছে। স্থানীয়ভাবে এটি ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামেও পরিচিত। দ্বীপটি শান্ত সৈকত এবং ডুবো জগতের সৌন্দর্য এটিকে পর্যটকদের কাছে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত করেছে, যেখানে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পর্যটকরা প্রকৃতির এই অনন্য সৃষ্টি উপভোগ করতে আসেন।

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গত ১ ডিসেম্বর থেকে চালু হয়েছে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন রুটে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল। পর্যটকদের জন্য থাকছে রাত্রিযাপনের সুযোগও। তবে সেন্টমার্টিনের পরিবেশ রক্ষায় প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটকের সীমা নির্ধারণ করেছে প্রশাসন। পালন করতে হবে ১২টি কঠোর নির্দেশনা।

কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া জেটিঘাট থেকে গত ১ ডিসেম্বর সকাল সাতটায় জাহাজ যাওয়া-আসা শুরু করে। পরের দিন বিকাল তিনটায় সেন্টমার্টিন থেকে সেই জাহাজ কক্সবাজারে ফিরে আসবে। আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা দুই মাস ভ্রমণ করতে পারবে পর্যটকরা।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সেন্টমার্টিন ভ্রমণের ব্যাপারে গত ২২ অক্টোবর ১২টি নির্দেশনাসহ এক প্রজ্ঞাপন জারি করে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সেন্টমার্টিন দ্বীপে কোনো নৌযান চলাচল করতে পারবে না। পর্যটকদের অবশ্যই ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট কিনতে হবে। সেখানে প্রতিটি টিকিটে ট্রাভেল পাস এবং কিউআর কোড সংযুক্ত থাকবে। কিউআর কোড ছাড়া টিকিট নকল হিসেবে গণ্য হবে।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. শাহিদুল আলম জানান, এমভি কর্ণফুলি এক্সপ্রেস, এমভি বারো আউলিয়া, কেয়ারি সিন্দাবাদ ও কেয়ারি ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন নামের চারটি জাহাজ কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন নৌপথে চলাচলের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে অনুমতি পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারের জারি করা ১২টি নির্দেশনা এবার কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করবে জেলা প্রশাসন।

আগে টেকনাফ থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করলেও নিরাপত্তার কারণে এখন কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে সেন্টমার্টিন যাতায়াত করবে। তার জন্য সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন জানান, পর্যটক পারাপারের সময় জাহাজগুলোকে কঠোর নজরদারিতে রাখা হবে। দুই হাজারের বেশি পর্যটক যেতে দেওয়া হবে না। এ জন্য নুনিয়ারছড়ার বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাট ও সেন্টমার্টিন জেটিঘাটে পৃথক তল্লাশির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

দ্বীপে ভ্রমণের সময়সূচি এবং পর্যটক উপস্থিতিও এবার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ঘাটে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাখা হয়েছে যেন নিয়মের বাইরে পর্যটক যেতে না পারে।। নভেম্বর মাসে পর্যটকরা শুধু দিনের বেলায় ভ্রমণ করতে পারবেন। রাত্রিযাপন করা যাবে না। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রাত্রিযাপনের অনুমতি থাকবে। ফেব্রুয়ারি মাসে দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি পর্যটক দ্বীপে ভ্রমণ করতে পারবেন না। সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন্ন রাখতে দ্বীপে রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি বা বারবিকিউ পার্টি করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।  

কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা ক্রয়-বিক্রয়, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ ছাড়া সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যে-কোনো মোটরচালিত যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।

নিষিদ্ধ পলিথিন বহন করা যাবে না এবং একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক, যেমন চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক চামচ, স্ট্র, সাবান ও শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক, ৫০০ ও ১০০০ মিলিলিটারের প্লাস্টিক বোতল ইত্যাদি বহন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। পর্যটকদের নিজস্ব পানির ফ্লাস্ক সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেন্টমার্টিন দ্বীপের নাজুক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত থাকবে। দ্বীপটি দায়িত্বশীল ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠবে বলে আশা করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
এদিকে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ও কিছু আন্তর্জাতিক মহল যুগ যুগ ধরে ষড়যন্ত্র করে আসছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। 

তাদের মতে, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে বছরে ৫ মাস (সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ) পর্যটক যাতায়াত করতে পারবে। কিন্তু এখন বছরে ২ মাস পর্যটক যাতায়াত করার অনুমতি দেওয়ার কারণে সেন্টমার্টিনের প্রায় ১০ হাজার মানুষ জীবিকা হারাবে এবং সেই সঙ্গে পর্যটন খাতে কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত হোটেল-মোটেল জোনে প্রায় ৫ লাখ লোক কর্মহীন হয়ে পড়ে। সেন্টমার্টিন এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক জানান, সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রায় ১০ হাজার লোক বাস করে। যাদের আয়ের প্রধান উৎস পর্যটন ব্যবসা। দ্বীপের বাসিন্দারা বছরের ৫ মাস ব্যবসা করতে পারবে। কিন্তু এখন বছরে ২ মাস ব্যবসা করার সুযোগ পাচ্ছে। আর বাকি ১০ মাস জীবন ঝুঁকি নিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে মোকাবিলা করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। দুই মাসের ইনকামে পুরো ১২ মাস চলতে হয় তাদের। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ ৫ মাস করা হলে সেন্টমার্টিনের ১০ হাজার মানুষসহ পর্যটন খাতে আরও কয়েক লাখ মানুষ জীবিকা হারাবে। 

গত বছরের ২ অক্টোবর সেন্টমার্টিন বিএন ইসলামিক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সেন্টমার্টিন মুজিবুর রহমান মুজিবের সভাপতিতে¦ এ নিয়ে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। দ্বীপের সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত হয়ে সেন্টমার্টিন পর্যটন সীমিতকরণ ও রাত্রীযাপন নিষিদ্ধকরণের প্রতিবাদ জানান।

পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, পরিবেশ রক্ষায় ও সেন্টমার্টিন রক্ষায় সেন্টমার্টিনে পর্যটক সীমিতকরণ করা হয়েছে। সেন্টমার্টিন রক্ষা করতে হলে মানুষের যাতায়াত কম রাখতে হবে। অন্যথায় যে কোনো সময় এই সুন্দর সেন্টমার্টিন হারিয়ে যেতে পারে। 

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  আয়   সেন্টমার্টিন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close