মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      ভূমিকম্পে কাঁপলো রাজধানী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
খালেদা জিয়া জাতির ‘ঐক্যের প্রতীক’
মিতা রহমান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ২:০০ পিএম
খালেদা জিয়া

খালেদা জিয়া

মানুষ মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু এরই মাঝে কিছু মৃত্যু পাহাড়ের চেয়ে ভারী মনে হয়। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুটা অনেকটা তাই। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আগমন, দীর্ঘ নয় বছর স্বৈরাচারী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন, আপসহীন দেশনেত্রীতে রূপান্তর, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়া, ১/১১’-এর মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সঙ্গে আপস না করে দেশের মাটিতে অবস্থান, বিগত প্রায় ১৭ বছর স্বৈরাচারী শাসকের প্রতিহিংসার শিকার হয়েও আপস না করে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জাতীয় বীরের সম্মানে ভূষিত হওয়া- সবকিছুই একটি কালের অধ্যায়। 

পৃথিবীতে খুব কম রাজনৈতিক নেতৃত্বই এ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। সব শ্রেণি, সব মতের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিই সব বলে দিয়েছে। গত বুধবার তার জানাজায় লাখো মানুষের জনস্রোত ছিল মানুষের ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। তারা এসেছিলেন নিজেদের ভেতরের এক তাগিদ থেকে, এমন একজন মানুষকে শ্রদ্ধা জানাতে, যাকে তারা নিজেদেরই প্রতিনিধি মনে করতেন। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে এ দেশের মানুষের এ বন্ধন যেন ছিল রাজনীতির ঊর্ধ্বে। তার জানাজায় আসা সবাই দলীয় নেতাকর্মী ছিলেন না। অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ মানুষ। 

কীভাবে তিনি এত এত সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিলেন, তা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। ইতিহাসের এক কালজয়ি অধ্যায়। এত সংগ্রাম ও ত্যাগের পরও জীবদ্দশায় প্রাপ্য সম্মান দেখাতে পারি নাই রাষ্ট্র ও জাতি খালেদা জিয়াকে। সাত বছরেরও বেশি সময় তাকে কারান্তরীণ ও গৃহবন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়েছে, যা ছিল আইনের অপব্যবহারের এক নগ্ন দৃষ্টান্ত। তিনবারের নির্বাচিত এ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বন্দিদশায় যে আচরণ করা হয়েছে, তা ছিল মর্যাদাহানিকর। দুবছরের বেশি সময় তাকে নির্জন কারাবাসে রাখা ছিল নিষ্ঠুর ও অমানবিক। 

একজন গৃহবধূ ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। স্বামী ও দেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর সাত মাস পর এক বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। রাজনীতিতে আসার ১০ বছরের কম সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। প্রায় ৪৩ বছর তার রাজনৈতিক জীবন ছিল ইতিহাসের বিভিন্ন বাকের সমন্বয়। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন এক দৃঢ়চেতা, সাহসী নেত্রী। তিনি বিপদে-দুর্যোগে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলেন। আর শেষ জীবনে তিনি হয়ে ওঠেন জাতির ‘ঐক্যের প্রতীক’। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক গোলাম মোস্তফা ভুইয়ার মতে, ‘মূলত সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রচণ্ড রকমের একটি শক্ত ভিত্তি ও ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। তার পরবর্তী ১/১১ প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে সময় তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে এতটাই সমর্থ হন যে তার উচ্চতা অনেককেই হার মানিয়েছে। আপসহীন রাজনৈতিক চরিত্রের কারণেই শেষ জীবনে এসে তিনি দল-মতনির্বিশেষে সবার কাছে সম্মান ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন।’ 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি একসঙ্গে একাধিক আসনে নির্বাচন করছেন, কিন্তু কখনো পরাজিত হন নাই। যখন যেখানে দাঁড়িয়েছেন, তুমুল জনপ্রিয়তায় ভর করে সেখান থেকে জয়ের মালা নিয়েই ফিরেছেন। কিন্তু, ৩০ ডিসেম্বর তাকে থামতে হলো জীবনের পথে। ৮০ বছর বয়সে এসে থেমে গেল বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নিশ্বাস। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো তার রাজনৈতিক জীবন। কিন্তু অপরাজেয়-ই থাকলেন রাজনীতির মাঠে। বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ, উত্তাল অধ্যায় স্থায়ীভাবে ইতিহাসের পাতায় স্থান নিয়েছে। 

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রাজপথের রাজনীতি হারাল তার অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বরকে, আর জাতি হারাল এমন এক নেত্রীকে যিনি দেশ ও জনগণের জন্য পুরা জীবন ব্যয় করেছেন। তার বিদায় মানে শুধু একজন রাজনীতিকের মৃত্যু নয়; এটি এক যুগের পরিসমাপ্তি। খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশ ছিল আকস্মিক। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর নেতৃত্বশূন্য বিএনপির হাল ধরেই তিনি সামনে আসেন। রাজনীতিতে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, কিন্তু সময় খুব দ্রুতই তাকে পরিণত করে দৃঢ়চেতা নেত্রীতে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশ, দেশের জনগণ, এমনকি বিশ্বের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। 

দেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সংগ্রাম, সাহস, অকৃত্রিম দেশপ্রেম, সততা ও নীতি নিষ্ঠতার এক অনন্য উদাহরণ। তাকে ছাড়া একটি বাংলাদেশ কল্পনা করা আমার জন্য বেশ কঠিন বিষয়। ১/১১’-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে খালেদা জিয়ার পরিবারের ওপর চরম নির্যাতন নেমে আসে। তার দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয় এবং খালেদা জিয়াকেও কারাবরণ করতে হয়। শত চাপের মুখেও তিনি আপস করেননি, বিদেশ যেতে রাজি হননি এবং বরং উচ্চ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশই আমার শেষ ঠিকানা।’ 

দুই ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে বাধ্য হলেও খালেদা জিয়া দেশে থেকে যান এবং চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেন। পরিস্থিরি কারণে নির্বাচনে বিএনপির ভালো ফল করার কোনো সুযোগ ছিল না। এ রকম পরিস্থিতিতেই আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পরবর্তী ১৬ বছরে দেশে এক ধরনের স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম হয়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা গুম-খুনের শিকার হন, আয়নাঘর বানানো হয়। বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মীর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয় এবং তাকে দীর্ঘ সময় পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারে বন্দি রাখা হয়। সেখানে তিনি অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়লে পরে তাকে গৃহবন্দী অবস্থায় রাখা হয়। 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈারাচারী সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়া মুক্তি পান। এটি ইতিবাচক বিষয় ছিল যে গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য অপেক্ষায় থাকা একটি দেশে তিনি মুক্তভাবে ফিরতে পেরেছিলেন। ২১ নভেম্বর ২০২৫-এ সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে তাকে শেষবারের মতো জনসমক্ষে দেখা যায়। এর দুদিন পর তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন এবং অবশেষে ৩০ ডিসেম্বর সব বন্ধন ছিন্ন করে মারা গেলেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘আপসহীন’ শব্দটি এখন আর শুধু একটি সাধারণ কোনো বিশেষণ নয়; বরং এ শব্দটি একটি নামের সমার্থক হয়ে উঠেছে- খালেদা জিয়া। একজন সাধারণ ‘অন্তর্মুখী গৃহবধূ’ থেকে সময়ের প্রয়োজনে রাজপথের অগ্নিকন্যা হয়ে ওঠা এই নারীর জীবন কাহিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষার এক জীবন্ত উপাখ্যান, আপসহীনতার অবিনশ্বর প্রতীক। যা আমাদের এ উপমহাদেশের রাজনীতিতে খুবই বিরল। 

তার রাজনীতির মূল শক্তি ছিল তার সরলতা, নম্রতা এবং অদম্য সাহসিকতা। গ্রামের সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই নারীর ছিল এক মায়াবী মিষ্টি হাসি এবং মানুষকে খুব দ্রুতই আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের কট্টর ইসলামিক গোষ্ঠী ও স্কলাররাও তার পোশাক বা ব্যক্তিত্ব নিয়ে কখনো নেতিবাচক মন্তব্য করতে পারে নাই, করেনও নাই। তিনি ভোটের জন্য কখনো লোক দেখানো ধর্মীয় পোশাকের আশ্রয় নেননি, বরং নিজের স্বকীয়তা দিয়েই জয় করেছিলেন সর্বস্তরের মানুষের মন। 

খালেদা জিয়া আজ কেবল একটি দলের নেত্রীই নন; তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক মূর্ত প্রতীক। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা, জনগণের অধিকার সুরক্ষাই ছিল তার রাজনীতির মূল মন্ত্র। যখনই বাংলাদেশের গণতন্ত্র সংকটে পড়বে, বেগম জিয়ার ‘আপসহীন’ জীবনগাথা আজকের ও আগামী প্রজন্মের জন্য দ্রুব তারার মত আলোকবর্তিকা হয়ে সামনে দাঁড়াবে।

লেখক : যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাপ ও আহ্বায়ক, জাতীয় নারী আন্দোলন

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  খালেদা জিয়া   জাতি   ঐক্যের প্রতীক  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close