রোববার, ২ আগস্ট ২০২৬,
১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: আগস্টেই যোগদানের দাবিতে শাহবাগে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কর্মসূচি      পরিস্থিতি অনুকূলে এলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন : মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত      সরবরাহ কম থাকায় সারা দেশে তীব্র গ্যাস-সংকট      মাঠে সক্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বীরা, ধীর প্রস্তুতি বিএনপির      ছয় মাসে নিখোঁজ সাড়ে তিন হাজার শিশু      গ্যাসের দাম নিয়ে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান পেট্রোবাংলার      রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীকে দিলো বিএনপির স্থায়ী কমিটি      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বাস্তবতা ও প্রত্যাশা সংকটে বাংলাদেশ রেলওয়ে
নাহিদ হাসান নাঈম
প্রকাশ: রোববার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৫ পিএম

সুদূর অতীত থেকে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আরামদায়ক ভ্রমণের কথা ভাবতেই যে, কয়েকটি যানবাহনের নাম চলে আসে তাদের মধ্যে অন্যতম ট্রেন যাত্রা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ট্রেন যাত্রা শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা তা নয়, বরং এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা তথা ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

কিন্তু বেশ কিছু সময় ধরে এ খাতে যাত্রীদের প্রত্যাশার সঙ্গে নানা গরমিল দেখা গেছে। কর্তৃপক্ষ টিকিটের দাম বারবার বৃদ্ধি করলেও, সেই অনুপাতে সেবার মানে উন্নতির ছাপ পরিলক্ষিত হয়নি। এখন তো ট্রেনে উঠলেই মনে হয়, এ যেন যাত্রা নয়, এক ধরনের যুদ্ধের ময়দানে অবস্থান করছি। যদি এই রকম অবস্থা বিরাজমান থাকে, তবে রেলওয়ে খাত যে আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হবে তা নয়, জনগণের আশা, আকাক্সক্ষা ও আস্থা হারাবে।

বাংলাদেশের রেলওয়ে খাতের সমস্যাসমূহের দিকে নজর দিলে দেখা যায়। যাত্রীদের একটা অংশ টিকিটবিহীন অবাধ চলাচলের চেষ্টা করে। অনেকে টিকেট না কেটেই ট্রেনে ওঠে পড়েন এবং গার্ড, টিটি বা রেলওয়ে কর্মীদের সঙ্গে ইঁদুর বিড়াল খেলেন। ক্ষেত্র বিশেষে সামান্য টাকার বিনিময়ে সমঝোতায় পার পেয়ে যান। যার ফলে অনেক সময় দেখা যায় যে, সব যাত্রী টিকেট কেটে উঠেছেন। তাদের আসন খুঁজে পেতে ও নিজ আসনে বসতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। এমনকি অনেক সময় দখলও হয়ে যায়। স্ট্যান্ডিং টিকেটধারী, হকার ও অপ্রয়োজনীয় লোকজনের ভিড়ে কামরা হয়ে ওঠে কোলাহল পূর্ণ ও অসহনীয়। পরিবেশের করুণ অবস্থা। কামরা নোংরা, টয়লেট ব্যবহারের অযোগ্য এবং হকারদের চিৎকারে কান ঝালাপালা। ডিজিটাল টিকেটিং ব্যবস্থায়ও আছে বেশ জটিলতা। যাত্রার আট-দশ দিন আগেই টিকেট বুক করতে হয়, কিন্তু অফলাইনে টিকেটের সংখ্যা খুবই নগণ্য। ফলে সাধারণ মানুষ নানা প্রতিকূলতা ও হয়রানির শিকার হন। মহিলা যাত্রীদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা প্রায়শই অপ্রতুল।

বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমের ফলাফল ও প্রভাব সংক্রান্ত সূচকসমূহ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, কর্মসম্পাদনের ধারাবাহিকতায় উল্লেখযোগ্য ওঠানামা রয়েছে।

টাইম সিডিউল বিচ্যুতি হ্রাসে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অর্জন স্থির ছিল ১০ শতাংশে। ২০২৪-২৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ১২ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে। পরবর্তী দুই ২০২৫-২০২৬ ও ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে যথাক্রমে ১২ ও ১১ শতাংশ।

বাণিজ্যিক যাত্রী পরিবহন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩২.৯৪ শতাংশ ইতিবাচক অর্জন। ২০২৩-২৪ ১০.৯৮ শতাংশ ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। ২০২৪-২৫ এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ৪৯.০২ শতাংশ, যা আগের বছরের তুলনায় অনেক উচ্চ। পরবর্তী ২০২৫-২০২৬ ও ২০২৬-২০২৭ প্রক্ষেপণ ৫০.৯৮ ও ৫২.৯৪ শতাংশ। যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশ ইতিবাচক ধারার ইঙ্গিত করে।

বাণিজ্যিক মালামাল পরিবহন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ২০২২-২৩ সালে ১৯ শতাংশ হ্রাস। ২০২৩-২৪ সালে এটি তীব্র হয়ে ৬৩ শতাংশ পৌঁছেছে। ২০২৪-২৫ এর লক্ষ্যমাত্রা ৪৮ শতাংশ হ্রাস এবং পরবর্তী ২০২৫-২০২৬ ও ২০২৬-২০২৭ প্রক্ষেপণ যথাক্রমে ৩৮ ও ২৭ শতাংশ হ্রাস পাবে।

রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সূচকে ২০২২-২৩ সালে ১৮ শতাংশ ইতিবাচক অর্জনের পর ২০২৩-২৪ সালে ২১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০২৪-২৫ এর লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০২৫-২০২৬ ও ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে প্রক্ষেপণ ২৪ ও ৩২ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে, যা ইতিবাচক লক্ষ্যকে তুলে ধরে।

আমরা যদি এই সমস্যাগুলোর মূলে নজর দেই, সেখানে লুকিয়ে আছে ব্যবস্থাপনার গভীর দুর্বলতা। দুর্নীতির একটি সিন্ডিকেট সোচ্চার হয়ে উঠেছে। যেখানে টিকেটের আয়ের বড় অংশই লিক হয়ে যায়। কর্মীদের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব। অদক্ষ জনবল এবং রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। টিকেটের দাম বাড়ানো হয়েছে ঘাটতি কমানোর জন্য। কিন্তু সেই অর্থ যদি যথাযথ ভাবে কাজে না লাগে, তাহলে আগামীতে সমস্যা আরও বাড়বে। হকারদের নিয়ন্ত্রণ না থাকা, ট্রেনের সময়সূচির অনিয়মিতা এবং পুরোনো কোচের কারণেও যাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

এ সমস্যাগুলোর প্রভাব যে শুধু ব্যক্তিগত জীবনে পড়ছে তা নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও এর কালো ছাপ পড়ছে। রেলওয়ের লোকসান বাড়ছে, যা সরকারি বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে, যাত্রীরা বিকল্প হিসেবে সড়কপথে ঝুঁকছেন, যা দুর্ঘটনা ও যানজট বাড়াচ্ছে।

তাই সরকারকে এ খাতের প্রতি সুদৃষ্টি দেওয়া উচিত। একটি স্বাধীন অডিট করে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করা। টিকেট ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশনকে পুরোপুরি কার্যকর করা। যাতে অনিয়মের ফাঁক না থাকে। টিটি ও গার্ডদের জন্য কঠোর নজরদারি ও পুরস্কার-শাস্তির ব্যবস্থা চালু করা। ট্রেনের কোচ আধুনিকীকরণ করা। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান করা। হকার নিয়ন্ত্রণে বিশেষ টিম গঠন করতে হবে। সেই সঙ্গে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। এ খাতকে সমৃদ্ধ করতে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে কিছু রুটে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) চালু করা যেতে পারে। এতে করে যাত্রী মহলে আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে।

শুধু কর্তৃপক্ষের দিকে আঙ্গুল তুললে চলবে না। প্রতিটি জনসাধারণের ও দায়িত্বশীল হতে হবে। যাত্রী হিসেবে আমাদেরও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। আমাদের উচিত টিকেট ছাড়া নিজেরা ট্রেনে না উঠা। টিকেট ছাড়া কেউ ট্রেনে উঠলে প্রতিবাদ করা। হকারদের অবৈধ দৌরাত্ম্যর বিরুদ্ধে সচেতন থাকা। অনলাইন টিকেট কাটার সময় সঠিক নিয়ম মেনে চলা এবং অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়িয়ে চলা। সাধারণ যাত্রীরা যদি সচেতন হয়ে প্রতিবাদ করে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিবাচক চাপ তৈরি করে, তাহলে পরিবর্তন ত্বরান্বিত হবে।

অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশ রেলওয়েকে একটি টেকসই খাতে পরিণত করা সম্ভব। এক্ষেত্রে টিকেট কালোবাজারি বন্ধ করে আয় বাড়াতে হবে। কিছু লাভজনক রুটে বিশেষ সার্ভিস চালু করে প্রিমিয়াম মূল্য নেওয়া যেতে পারে। স্টেশনগুলোতে বাণিজ্যিক ব্যবস্থা (শপিং মল, বিজ্ঞাপন) বাড়িয়ে অতিরিক্ত আয়ের উৎস তৈরি করা। পণ্য পরিবহনে রেলের ব্যবহার বৃদ্ধি- এটি একটি বড় সম্ভাবনা। আধুনিক প্রযুক্তি (রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, অ্যাপভিত্তিক সেবা) ব্যবহার করে দক্ষতা বাড়ানো। যদি এ পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে গ্রহণ করা হয়। তাহলে কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে ঘাটতি খাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।

রেলওয়ের এ সংকট শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বা বিভাগের সমস্যা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রশ্ন জড়িত। যদি যাত্রীদের প্রত্যাশা পূরণ না করতে পারি তাহলে আমরা কখনোই একটি সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব না। সর্বোপরি সংশ্লিষ্ট সকলে মিলে যদি একসঙ্গে কাজ করি, তাহলে রেলওয়ে আবারও নতুন উদ্যমে হয়ে উঠবে গর্বের প্রতীক।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close