শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬,
১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: শিগগিরই বাংলাদেশ সফর করবেন মার্কিন বিনিয়োগকারীরা      বেড়েছে ধর্ষণ ও আত্মহত্যা      রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে আজ বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক      রাজনীতিতে ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব      রক্ষকই যখন ভক্ষক      আলজেরিয়ায় বাস খাদে পড়ে নিহত ২৭      নিজে গাড়ি চালিয়ে নগর ব্যবস্থাপনার সার্বিক অবস্থা পরিদর্শন প্রধানমন্ত্রীর      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা বলে কি কিছু আছে
শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
প্রকাশ: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১০ পিএম আপডেট: ০১.০৮.২০২৬ ১২:১৩ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো ক্ষমতাবানদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ‘জোর যার, মুল্লুক তার’— প্রবাদের মতোই পরিস্থিতি। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা আছে কি না, বর্তমান কার্যক্রম দেখলে তা মনে হয় না। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ঢুকে তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় মারধর করেন রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ ছাত্রশিবিরের একাধিক নেতা। তারা ক্যাম্পাসে কতটা সক্রিয় ও বেপরোয়া, তার প্রমাণ মিলেছে ভিডিও ফুটেজে। প্রক্টর, শিক্ষক ও পুলিশের উপস্থিতিতে পাঠকক্ষে ঢুকে শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নজিরবিহীন। বিভিন্ন সময়ে ছাত্রসংগঠনের সহিংসতা, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতরে ঢুকে শিক্ষার্থীকে মারধরের নজির নেই।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে তিন শিক্ষার্থীকে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ ছাত্রশিবির নেতাদের মারধরের প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন হয়েছে। ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে ২৯ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধনে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদসহ সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের দাবি, এটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের আয়োজন; ছাত্রদল কর্মসূচিতে সমর্থন জানিয়ে অংশ নিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। তার কি কোনো নিজস্ব প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই? যদি থাকে, তাহলে কী করে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়? আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কতটা যৌক্তিক?

১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ হলো একটি রাষ্ট্রপতির আদেশ, যার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক চরিত্র প্রদান করা হয়। এ অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য হলো—
১. বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা সহজ করা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা করা।
২. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও একাডেমিক স্বাধীনতায় সরকারি হস্তক্ষেপ কমানো।
৩. সিনেট, সিন্ডিকেট এবং একাডেমিক কাউন্সিল গঠন ও তাদের ক্ষমতা নির্ধারণ।
৪. সিনেটের মনোনীত প্যানেল থেকে উপাচার্য নিয়োগের বিধান রাখা।

১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ বা আদেশ হলো বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রধান গণতান্ত্রিক আইন, যার অধীনে সিনেট গঠিত হয় এবং উপাচার্য প্যানেল মনোনীত হয়। স্বাধীনতার পর শিক্ষকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার নীতিমালা-সংবলিত একটি আদেশ প্রণয়ন করেন। ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ নং-১১-এর বলে প্রণীত অধ্যাদেশটি ১৯৭৪ সালে কার্যকর করা হয়। তখন থেকে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এ অধ্যাদেশের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে।

এ অধ্যাদেশে সিনেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণী সংস্থা। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট ও সরকারের প্রতিনিধিরা থাকেন। সিনেটের সভা থেকে তিনজন ব্যক্তির একটি প্যানেল মনোনীত করা হয় এবং রাষ্ট্রপতি (চ্যান্সেলর) তাদের মধ্য থেকে একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন। সিনেটের মেয়াদকাল হলো— ছাত্র প্রতিনিধিদের জন্য এক বছর এবং অন্যান্য সদস্যদের জন্য তিন বছর।

১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী সিনেট হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নীতিনির্ধারক ও সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ফোরাম। এ সিনেটের সদস্যরা বিভিন্ন উপায়ে নির্বাচিত বা মনোনীত হন, যার মধ্যে রয়েছে পদাধিকারবলে সদস্য, প্রত্যক্ষ নির্বাচন এবং চ্যান্সেলর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনোনয়ন।

সিনেট গঠনের প্রধান ধারা ও পদ্ধতিতে পদাধিকারবলে সদস্য যারা হন, তারা হলেন— বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, ডিন, রেজিস্ট্রার এবং নির্দিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক এবং প্রভাষকদের মধ্য থেকে নির্ধারিত নিয়মে নির্বাচন বা প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে শিক্ষক সদস্যরা সিনেটে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের মধ্য থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক সদস্য সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সিনেটে নির্বাচিত হন। অধ্যাদেশে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেও প্রতিনিধি নির্বাচনের বিধান রয়েছে, যা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু, রাকসু, চাকসু ইত্যাদি) মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। জাতীয় সংসদের সদস্য, সরকার বা চ্যান্সেলর (রাষ্ট্রপতি) কর্তৃক মনোনীত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গুণী ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট মেয়াদে সিনেট সদস্য হিসেবে স্থান পান।

দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশন হয় ১৮ মে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ সিনেট অধিবেশন হয়েছিল ২০১১ সালের জুনে।

সিনেটের সভাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নির্বাচন, বাজেট অনুমোদন, আইন সংশোধনসহ যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু গত ১৪ বছরে সিনেটের অধিবেশন হয়নি। তাহলে কর্মকাণ্ড কীভাবে পরিচালিত হলো? দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সিনেটে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট ক্যাটাগরির ২৫টি পদ এখন মেয়াদোত্তীর্ণ।

দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাহী সংস্থা সিন্ডিকেট বা রিজেন্ট বোর্ড নামেও পরিচিত। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক আইন দ্বারা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট বা রিজেন্ট বোর্ডের গঠনপ্রক্রিয়া নির্ধারিত রয়েছে। সিন্ডিকেট বোর্ডের আইন এবং ভাইস চ্যান্সেলরের ওপর অর্পিত ক্ষমতা সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যাবলি, সংস্থা ও সম্পত্তির ওপর সাধারণ ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা থাকে সিন্ডিকেট বোর্ডের। এ ছাড়া আইন, সংবিধি, বিশ্ববিদ্যালয় বিধি ও প্রবিধানের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে লক্ষ রাখাও রিজেন্ট বোর্ডের দায়িত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো অনিয়ম রোধে ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সিন্ডিকেট বা রিজেন্ট বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে বিগত কয়েক দশকে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই সিন্ডিকেট এ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই সিন্ডিকেট গঠন হয় উপাচার্যদের সুপারিশকৃত ব্যক্তিদের দ্বারা। নির্বাচিত সদস্য কম থাকেন। ফলে এসব ব্যক্তি উপাচার্যদের কার্যক্রমে বাধা দেন না।

১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে পরিচালিত চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট বোর্ডের সদস্য ১৮ জন। তাদের মধ্যে রয়েছেন পদাধিকারবলে উপাচার্য, দুজন উপ-উপাচার্য, একজন কোষাধ্যক্ষসহ মোট চারজন। শিক্ষকদের ভোটে নির্বাচিত ছয়জন শিক্ষক, একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক মনোনীত দুজন অধ্যক্ষ, সিনেট কর্তৃক মনোনীত একজন শিক্ষাবিদ, একজন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট ও সিনেটের সদস্য নন— এমন একজন বিশিষ্ট নাগরিক, চ্যান্সেলর কর্তৃক মনোনীত দুজন সদস্য এবং সরকার কর্তৃক মনোনীত একজন সচিব।

এ অধ্যাদেশ অনুযায়ী ১৮ জনের মধ্যে ১১ জনই শিক্ষকদের ভোটের মাধ্যমে কিংবা সিনেট অথবা একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক মনোনীত। তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে এ চিত্র বদলাতে শুরু করে। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই সিন্ডিকেট বা রিজেন্ট বোর্ডে নির্বাচিত প্রতিনিধির তুলনায় সরকার মনোনীত সদস্য, চ্যান্সেলর মনোনীত সদস্য এবং সংসদ নেতা মনোনীত সদস্যের সংখ্যা বাড়ানো হয়। সরকার, চ্যান্সেলর ও সংসদ নেতা কর্তৃক যেসব ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, তাদের মূলত উপাচার্যদের সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়।

১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুসারে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত না হওয়ায় দুর্নীতি ও অনিয়ম চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তিরা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে তোষণ করে চলেন। জবাবদিহিতা নেই বললেই চলে। যার কারণে শিক্ষার গুণগত মান হ্রাস পাচ্ছে, বাড়ছে ক্যাম্পাসগুলোতে অস্থিরতা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফেরাতে হলে গণতান্ত্রিকভাবে প্রশাসনিক ক্ষমতার শীর্ষ পদগুলোতে নির্বাচন করতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বিশ্ববিদ্যালয়   প্রশাসনিক ব্যবস্থা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close